॥ মুঃ শফিকুল ইসলাম ॥
বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি।ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক মাঠ ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে-বক্তব্যে বাড়ছে তীব্রতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে বিভাজন, আর রাজনীতির ভাষা ক্রমেই হারাচ্ছে সংযম।এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মানবিষয়ক মন্তব্যটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিমত নয়; বরং নির্বাচনকালীন রাজনীতির জন্য একটি প্রয়োজনীয় নৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “ধৈর্যের পরীক্ষাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।” নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে এই কথার তাৎপর্য বিশেষভাবে গভীর। কারণ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়-এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক আস্থার একটি বড় পরীক্ষা। এই সময়ে ধৈর্য হারানো মানেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলা।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা বেড়ে যায়। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ, উসকানিমূলক বক্তব্য, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং ফলাফল নিয়ে অনাস্থা-এসব মিলেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই প্রেক্ষাপটে “অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন”-এই আহ্বান নির্বাচনী রাজনীতিকে সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনার একটি মৌলিক শর্ত হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্রে মতভিন্নতা স্বাভাবিক, এমনকি প্রয়োজনীয়। কিন্তু নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে সেই ভিন্নতা যখন শত্রুতায় রূপ নেয়, তখন ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা নির্বাচনকে অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়। সম্মানভিত্তিক রাজনৈতিক আচরণই পারে এই সংকট ভাঙতে।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতার পারস্পরিক সম্পর্ক। জনগণের আস্থা ও সম্মান আদায় করা যায় সংযমী ভাষা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে; শক্তি প্রদর্শন বা উসকানির মাধ্যমে নয়। নির্বাচনকালে যেসব রাজনৈতিক দল ও নেতা ধৈর্য ধারণ করেন এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, দীর্ঘমেয়াদে তারাই বেশি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেন।
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আত্মসংযম। এই জায়গায় ধৈর্যকে দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণই হোক না কেন, তা যেন সংঘাত ও বিভাজনের উৎস না হয়ে ওঠে-এটাই গণতন্ত্রের মূল প্রত্যাশা। ডা. শফিকুর রহমানের ধৈর্য ও সম্মানবিষয়ক বক্তব্য নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে সেই দায়িত্ববোধের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন একটাই রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব কি এই আহ্বানকে কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি বাস্তব আচরণে তার প্রতিফলন ঘটাবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।