একটি দেশ কেবল ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হলেই হয় না। দেশের সম্পদের ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা না হলে সে স্বাধীনতা অর্থবহ হয় না। আওয়ামী আমলে আমরা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিবেশি দেশের প্রভাব দেখেছি। তাছাড়া বহু বছর ধরেই আমাদের জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। গ্যাস তেল উত্তোলনেও আমাদের নিয়ন্ত্রণ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু একটি দেশের সম্পদের ওপর পরাশক্তিগুলোর যে শকুনের মতো লোভাতুর চাহনি এবং এ সম্পদ দখল করতে গিয়ে কত ঠুনকো অজুহাতে বানোয়াট অভিযোগে একটি দেশের সরকারকে উৎখাত করা হতে পারে বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দৃষ্টান্ত নতুন নয়। আর সম্প্রতি সে চিত্র আমরা নতুন করে দেখলাম ভেনিজুয়েলায়।
গত ৩ জানুয়ারি, শনিবার ভোরে ভেনিজুয়িলাজুড়ে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভোরের আগেই রাজধানী কারাকাস প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দী করে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে। একটি দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে বন্দী করার এ নজিরবিহীন ঘটনাটি মূলত ভেনিজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক মাসের তীব্র চাপের ফল। সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনিজুয়েলা উপকূলে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে। ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন নৌযানে একের পর এক বিমান হামলা চালায়। এ ছাড়া তারা ভেনিজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও জব্দ করে। এসব হামলায় কমপক্ষে ১১০ জন নিহত হয়- মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে অপরাধগুলোকে রীতিমতো ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছে। ভেনিজুয়েলার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত দখল করতেই যুক্তরাষ্ট্র এসব করছে।
তবে ঘটনার সূত্রপাত ৩ জানুয়ারিতেই নয় বরং আরো অনেক বছর আগে। ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চাভেজ আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। পাশাপাশি, কিউবা ও ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করায় যুক্তরাষ্ট্র চাভেজের ওপর ক্ষেপে গিয়েছিল। ২০০২ সালেই যুক্তরাষ্ট্র তাকে উৎখাত করার জন্য একটি অভ্যুত্থানের প্রয়াস চালায় যদিও তা সফল হয়নি।
মার্কিন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন। আর ভেনিজুয়েলা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দল হওয়ায় রিপাবলিকানরা বরাবরই ভেনিজুয়েলাকে নিজেদের শত্রু বলেই গণ্য করে। মাদুরো একটি সময়ে বাসচালক ছিলেন এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে এসে তিনি প্রেসিডেন্ট চাভেজের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি পান। চাভেজের শাসনামলের শেষ কয়েক বছর এবং পরবর্তীতে ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের দমনের অভিযোগ আরো তীব্র হয় এবং ফলশ্রুতিতে ভেনিজুয়েলা আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। তবে অভিযোগ আছে যে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মাদুরো স্বৈরশাসকে পরিণত হন। জাতিসংঘের মতে, তাঁর আমলে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু সেবারও ট্রাম্প সফল হতে পারেননি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেলেও মাদুরো নানা কৌশলে ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই নিকোলা মাদুরোকে তাঁর প্রধান টার্গেট হিসেবে নির্ধারন করেন। সে আলোকে গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামক একটি নীতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়Ñপশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্র অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এবং খনিজ সম্পদ আহরণে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা যাবে। একইসাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকপাচার এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী পাঠানোর মতো অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিকোলা মাদুরোকে বিশ্বের অন্যতম বড় মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে তাঁর মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন গোষ্ঠীকে (যেমন ট্রেন দে আরাগুয়া) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এবং সামুদ্রিক অভিযান শুরু করে। ট্রাম্প খোলাখুলিভাবেই ভেনিজুয়েলার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। নভেম্বরের শেষদিকে তিনি মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন এবং নিরাপদে দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মাদুরো সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি দাস হয়ে শান্তি পেতে চান না। একইসাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তেল লোভী হিসেবেও অভিযুক্ত করেন। ট্রাম্প বারবার ভেনিজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর আগমনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, ২০১৩ সাল থেকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে প্রায় ৮০ লাখ ভেনিজুয়েলাবাসী দেশ ছেড়েছেন, যাদের অধিকাংশই লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে পুনর্বাসিত হয়েছেন। ট্রাম্প অবশ্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই একাধিকবার অভিযোগ করেছেন যে, মাদুরো ‘কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে’ বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনে ‘বাধ্য’ করেছেন। তবে এ অভিযোগ কারাকাস সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ট্রাম্প মাদকের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ভেনিজুয়েলা কোকেন পাচারের একটি প্রধান ট্রানজিট রুট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্টানিল সংকটে অবদান রাখছে। তিনি ভেনিজুয়েলার দুটি অপরাধী গোষ্ঠীÑট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লোস সোলেসÑকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, শেষোক্ত গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং মাদুরো। তবে ভেনিজুয়েলা সরকার এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেলসহ অন্যান্য সম্পদ দখল করতে চায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চাপের মুখেও মাদুরো সরকারকে মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত মনে হয়েছিল। মাদুরো বারবার বলছিলেন, তিনি যুদ্ধ চান না। এমনকি বন্দী হওয়ার দুই দিন আগেও তিনি টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে ভেনিজুয়েলার তেল খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও তার শেষ রক্ষা হয়নি।
আগামীতে ভেনিজুয়েলা ও মাদুরো নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রথমত, তাদেরকে আমেরিকাতেই বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়া আমরা দৃশ্যমান দেখতে পাচ্ছি। একইসাথে, তিনি জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত মার্কিনীরাই দেশটি পরিচালনা করবে। বর্তমানে যারা সরকারে রয়েছে, তাদের সরিয়ে দিয়ে ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করার জন্য লোকজন মনোনীত করার কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমনকি প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ করতে পারে মর্মেও হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে মাদুরোর বিরুদ্ধে যত অভিযোগই করা হোক না কেন, সবই যে আসলে নাটক এবং মূলত ভেনিজুয়েলার তেলের দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে ট্রাম্পের এবং মাদুরো তা দিতে রাজি হননি বলেই যে তাকে সরিয়ে দেয়া হলো তা দিনকয়েকের মধ্যেই পরিস্কার হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ আছে ভেনিজুয়েলায় আর ট্রাম্পের আশংকা যে তার প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়া এ তেলের উপকারভোগী হতে যাচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে, মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরপরই ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল বিক্রি ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ কার কাছে তেল বিক্রি হবে বা কার কাছে হবে না-সে সিদ্ধান্তও নিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, তেল বিক্রি করে যে অর্থ আসবে তাও নিয়ন্ত্রণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস রাইট এরই মধ্যে এ ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতারা তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে বাজারজাত করতে রাজি হয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের এসব কথা যে অমূলক নয় এরও প্রমাণ মিলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে কারাকাস। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এ চুক্তির ফলে ভেনিজুয়েলার তেলের সরবরাহ এখন চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরবে এবং ভেনিজুয়েলা বড় ধরনের তেল উৎপাদন হ্রাস এড়াতে সক্ষম হবে।
এ চুক্তি এমন জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাম্পের দাবির প্রতি সাড়া দিচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি ছিল, হয় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য দেশটিতে ব্যবসার সুযোগ উন্মুক্ত করতে হবে, না হয় সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি নিতে হবে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ভেনিজুয়েলার লাখ লাখ ব্যারেল তেল বিভিন্ন ট্যাংকার ও স্টোরেজ ট্যাংকে আটকা পড়ে ছিল। এগুলো জাহাজীকরণ করতে পারছিল না দেশটি। কার্যত ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সরকারের ওপর মার্কিন চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই ঐ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সর্বশেষ মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ উত্তজনা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ভেনিজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁদের দেশের বিশাল তেল সম্পদ চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন।
বলা হয়ে থাকে যে, বিশ্বে এখন আর উপনিবেশ বা ঔপনিবেসিকতার স্থান নেই। কিন্তু ঔপনিবেশের চেয়েও বড়ো কিছু এখন চলছে গোটা বিশ্ব জুড়েই। উপনিবেশবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ছিল না, বরং এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল যার প্রভাব আজও আমাদের বাস্তবতায় গভীরভাবে বিদ্যমান। ইউরোপীয় শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় যে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় সম্পদ আহরণ, বাজার দখল এবং নিজস্ব সভ্যতা ও মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা। এই প্রক্রিয়ায় উপনিবেশিত সমাজের স্বকীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা হয় এবং তার স্থলে আরোপ করা হয় একধরনের পরনির্ভরশীলতা। প্রকৃতপক্ষে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে যেভাবে তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রন যুক্তরাষ্ট্র নিল তা উপনিবেশ স্থাপনের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর।
সবচেয়ে দুখজনক হলো ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয় ও নিষ্প্রভ ভূমিকা। জাতিসংঘ বলে কিছু আদৌ আছে কিনা তা নিয়েই যেন সংশয় তৈরি হয়েছে। ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসী নীতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয় ও নীরব ভূমিকা বিশ্ব বিবেকের জন্য এক গভীর লজ্জা ও উদ্বেগের বিষয়। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বহিরাগত শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী হলেও এই ইস্যুতে জাতিসংঘ কার্যত দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বিরোধী পক্ষকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি করে সেখানকার সাধারণ জনগণকে চরম মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ রোধ করা ও জনগণের মানবাধিকার সুরক্ষার দায়ভার জাতিসংঘের ওপরই ন্যস্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতিসংঘ এই পুরো প্রক্রিয়াতেই নিরব।
জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত পরাশক্তি বিশেষ করে মার্কিন স্বার্থেই সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হয় তা আরো একবার যেন প্রমাণ হয়ে গেল। ভেনিজুয়েলার পরপরই পরাশক্তির কূটকৌশলের পরবর্তী টার্গেট হয়েছে ইরান। গোটা ইরান জুড়ে পরিকল্পিত সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করার চলমান প্রয়াস সম্পর্কে আগামী সপ্তাহে আলোকপাত করবো ইনশাআল্লাহ।