মো. জাহিদ হাসান

দক্ষ জনশক্তি ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দক্ষ ও কর্মঠ জনশক্তির মাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত হয়। কিন্তু, আমাদের দেশে সম্ভাবনা যেন শুধু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দেশে জনশক্তির অপব্যবহার এবং অকার্যকারিতা অনেক বেড়েছে। ফলে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বেকারত্বের হার এখন ৪.৬৩ শতাংশ। আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়ছে। এর মূল কারণ হলো উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব। সুযোগের অভাবে আমাদের দেশ এখনো আইসিটি সেক্টরে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আধুনিক বিশ্বের বহু দেশে অনলাইন উপার্জন মাধ্যম এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে পৌঁছে গেছে, সেখানে আমাদের দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নই এখনো পরিকল্পনার বাইরে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের শিল্পকে সুপরিসর করতে হবে। আধুনিক কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। মৎস ও খামার প্রকল্পের প্রসার ঘটালে দেশের মানুষ কর্মঠ হয়ে উঠবে এবং গ্রামীণ নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। পোশাকশিল্পের যুগোপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে কর্মীদের স্বচ্ছলতা ফিরবে এবং বেকাররা কর্মমুখী হবে। বর্তমানে অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রসার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ব্যবসা ক্ষেত্রে নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ কুটিরশিল্প আবারও ফিরতে শুরু করেছে তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা ও বিদেশ থেকে আধুনিক উৎপাদন যন্ত্র আমদানির সুযোগ তৈরি হলে দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে।

সেসাথে দেশের লাখো বেকার তরুণদের অভাবনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কাজের সঠিক সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং সরকারি চাকরির প্রতি অধিক ঝোঁক বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। অথচ, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তরুণদের অনেক কাজেই রয়েছে সাফল্যের সম্ভাবনা। দুঃখের বিষয় হলো পরিবার ও সামাজিক অসমর্থন এবং ব্যক্তিগত স্বদিচ্ছার অভাবে আমাদের দেশে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

আমাদের দেশে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক অভাব রয়েছে। কথায় আছে, ‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পর হস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।’ শিক্ষাব্যবস্থায় নানা অসঙ্গতির কারণে দেশের অধিকাংশ তরুণরা সৃজনশীলতা ও দক্ষতার অভাবে বেকারত্বের ঘানি টানছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিবেশের অভাব প্রাথমিক পর্যায়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটছে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগাতে হবে, যাতে তাঁরা আত্নবিশ্বাসী ও মানবিক হয়ে ওঠে। এছাড়া, পরীক্ষায় নকল প্রথা দূর করতে হবে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাতায়াত ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং গবেষণাধর্মী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সেই সাথে, শিক্ষার্থীদের ধর্ম চর্চা ও নৈতিক গুণাবলি, শিল্প ও সাহিত্য চর্চা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা, দেশপ্রেম, বৈশ্বিক জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনা, জীবনমুখী শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, বিজ্ঞান চর্চা, সহ-শিক্ষা মূলক কার্যক্রম, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

কর্মক্ষেত্রে ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে দক্ষ ও যোগ্য চাকরি প্রার্থীরা সুযোগ হারাচ্ছে এবং দেশ অপচয় করছে জনশক্তি। সুশিক্ষিত ও যোগ্যদের হাত ধরেই দেশ উন্নতির শিখরে উঠবে। মেধাবীদের অবমূল্যায়ন দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলার ব্যাপক ক্ষতি করছে। বাংলাদেশে শিক্ষার বিষয় কেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতা বড় একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। ফলে দেশের চাকরিক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারিতে ভরপুর। এর কারণে দেশের শিল্পক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা কমছে। নারী শ্রমিকদের বেতন-বৈষম্য, নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি কারণেও জনশক্তি স্থবির হয়ে পড়ছে। এজন্যই দেশের পোশাকশিল্পে এক ধরণের সংকটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাল্যবিবাহ, কন্যাশিশুর প্রতি অনীহা, নারী শিক্ষার অনগ্রসরতা, শিশুশ্রম, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রভৃতি সামাজিক অপরাধগুলো এখনো আমাদের দেশে ব্যাপক হারে বিদ্যমান। এ সমস্যাগুলোর ফলে দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত অকর্মঠ হয়ে পড়ছে এবং সমাজে বোঝা স্বরুপ বসবাস করছে। এছাড়া, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নানা সংকটের কারণে দেশের মানুষ শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ছে। চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক ও সুপরিকল্পিত চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পুরনো হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ চিকিৎসক বাড়াতে হবে।

সেসাথে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার কারণে সামাজিক বিশৃঙ্খলাও জনশক্তি বৃদ্ধির অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা। সরকারি দপ্তরের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড রক্ষা করে চলতে হবে। সুশাসন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সচল রাখতে হবে। নাগরিক মূল্যবোধ তৈরিতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সভা, সেমিনার ও সংবাদমাধ্যমে জনকল্যাণমুখী বার্তা প্রেরণ করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখা জরুরি। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে এবং জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা রক্ষা করে চলতে হবে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের সুযোগ-সুবিধার অভাবও দেশের জনশক্তির একটা বিরাট অংশের ক্ষতি করছে। প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।

যাতায়াত ব্যবস্থার যুগোপযোগী উন্নয়ন, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ রোধ, বৃক্ষরোপণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রভৃতি জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ফলে দেশের মানুষের জীবনযাপন সহজ ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এবং মানুষ আরও কর্মোদ্যম হয়ে উঠবে। দেশের বেকার তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে সঠিক নীতি রক্ষা করে চলতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সকল কৌশল বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন সরকার গঠনের সুবাদে বর্তমানে দেশে নতুন করে উন্নয়ন পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে জনশক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরকারের অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আসলে, দেশের সকল কিছুই জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। জনশক্তি ও দেশের উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক। তবে রাষ্ট্র জনগণের উর্ধ্বে নয়, বরং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার ফল-ই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভর করে জনগণের শক্তি ও সামর্থ্যরে উপর। তাই, উন্নত দেশ গঠনে জনশক্তি বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।