॥ এম এ খালেক ॥

সম্প্রতি রাজধানীতে দু’টি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও গবেষকগণ এ মর্মে মন্তব্য করেছেন যে, চলমান ইরান-মার্কিন-ইসরাইল সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ¦ালানি তেলের সঙ্কট বেড়ে যাবে,যা সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জ¦ালানি সঙ্কটজনিত কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে সরকারের ঋণ ও ভর্তুকির বোঝা আরো বাড়বে। বাংলাদেশ প্রতি বছর যে জ¦ালানি শক্তি ব্যবহার করে থাকে তার ৬৩ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। যুদ্ধের কারণে দেশের পরিবহন, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সভায় বক্তব্য উপস্থাপনকালে পলিসি এক্সচেঞ্জ এর চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত ২০ বছর নতুন গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়নি বরং এ সময়ে পরিকল্পিতভাবে দেশকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করে তার ৬৩ শতাংশ ব্যবহৃত হয় পরিবহন সেক্টরে। মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ ৮০ শতাংশ ক্রুড ওয়েল আমদানি করে থাকে। প্রতি বছর বাংলাদেশ মোট ২০ বিলিয়ন মার্নিন ডলারের জ¦ালানি আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ জ¦ালানি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় জ¦ালানি তেলের মাধ্যমে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য ৬৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি বলেন, আগামীতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাগণ আমদানি অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থা আগামীতে আরো জটিল হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকার এক জটিল পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে দেড় বছর দেশে কোন নির্বাচিত সরকার ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে । তারও আগে প্রায় ১৬ বছর দেশ ছিল স্বৈরশাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত। সে সরকার অবকাঠামোগত খাতে যত উন্নয়ন সাধন করছে প্রোডাক্টিভ খাতের ব্যাপারে ছিল ততটাই উদাসীন। আর সরকারের উন্নয়ন নীতির মূল কথা ছিল উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপট করা। ‘অতি উন্নয়ন অতি দুর্নীতিই ছিল’ সেই অভীষ্ঠ লক্ষ্য। স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা গেলে যে মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করা যেতো তার চেয়ে অন্তত ৫ থেকে ৭গুন বেশি খরচ পড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে। কিন্তু সরকার স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ না নিয়ে বাইরের দেশ থেকে এলএনজি আমদানির জন্যই বেশি উৎগ্রিব ছিলো। কারণ এলএনজি আমদানি করা হলে সেখান থেকে কমিশন পাবার সম্ভাবনা ছিল উজ্জ্বল। বাংলাদেশ প্রকৃতিক সম্পদ গ্যাসে সমৃদ্ধ। অন্য দেশেগুলোতে যেখানে ১০ টি কুপ খনন করা হলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায় সেখানে বাংলাদেশে প্রতি ৫টি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে গ্যাস এবং জ¦ালানি তেল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেখানে এখনো তেমন কোন অনুসন্ধান কার্য চালানো হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতের মধ্যমে ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার পরও আমরা এখনো গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের মতো কোন কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারিনি। অথচ ভারত এবং মিয়ানমার তাদের সমুদ্র সীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে তেল-গ্যাস আবিষ্কার করেছে।

চলমান ইরান-মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, যার আশঙ্কা প্রকট তাহলে বাংলাদেশকে আগামীতে জ¦ালানি শক্তি নিয়ে মারাত্মক বিপদে পতিত হতে হবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে কোন সঙ্কট দেখা দিলে তার প্রভাবে বিশ^ব্যাপী জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। জ¦ালানি তেল এমনই এক উৎপাদন উপকরণ যা ছাড়া কোন উৎপাদন কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। মধ্যপ্রাচ্যে কোন সঙ্কট দেখা দিলে তার প্রভাব কিভাবে বিশ^ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তার প্রমাণ হচ্ছে ১৯৭৩ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। সে সময় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হবার আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের মূল্য ছিল ৪ মার্কিন ডলার। জ¦ালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওয়েল অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কন্ট্রিজ(ওপেক) জ¦ালানি তেল রপ্তানির ওপর ব্যাপক মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বিশ^ব্যাপী তার বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়। জ¦ালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের মূল্য ১২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। বিশ^ব্যাপী হাহাকার পড়ে যায় জ¦ালানি তেলের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবার সঙ্কট সৃষ্টির পর বিশ^ব্যাপী জ¦ালানি তেলের মূল্যের ওপর সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইরানি বিপ্লব, ১৯৮০-১৯৮৮ সময়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং ১৯৯০-১৯৯১ সময়ে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বিশ^ব্যাপী জ¦ালানি তেলের সঙ্কট আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আশির দশক থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বিশ^বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সে সময় সাধারণত প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ২৫ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি উঠানামা করতো। এরপর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে। ২০০৮ সালে ব্যারেলপ্রতি জ¦ালানি তেলের মূল্য ১৪০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর একই রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় রাশিয়ার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার প্রেক্ষিতে রাশিয়া জ¦ালানি তেল সরবরাহ কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে শর্তারোপ করে, যেসব দেশ ইরান থেকে জ¦ালানি তেল ক্রয় করবে তাদের মার্কিন ডলারে নয় রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। সে সময় ওপেকভুক্ত দেশগুলোও জ¦ালানি তেলের উত্তোলন কমিয়ে দেয়। ফলে বিশ^ব্যাপী জ¦ালানি তেলের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে ১৩৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।

এবারও পরিস্থিতি সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হবার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ৬০ থেকে ৬৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের মূল্য ১১২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। অবশ্য পরে তা কিছুটা কমে ১০০ মার্কিন ডলারের আশেপাশে উঠানামা করছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন, ইরান-মার্কিন-ইসরাইল চলমান যুদ্ধ যদি ৬ মাস স্থায়ী হয় তাহলে জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারে। আর যুদ্ধ যদি এক বছর স্থায়ী হয় তাহলে জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ২০০মার্কিন ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।

ইরান-মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাণিজ্য সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীগণ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে। উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি বন্ধ হবার উপক্রম হতে পারে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান উপসাগরীয় ৮ দেশে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ২৭ কোটি মার্কিন ডলার। সার্বিকভাবে পণ্য রপ্তানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরু হবার আগে বিমানে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে ব্যয় হতো ১০৭ টাকা। এখন তা ১৫০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। সমুদ্র পথে প্রতি কন্টেইনারের ভাড়া ছিল ২ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সঙ্কটের আশঙ্কায় প্রতিটি দেশই তাদের আমদানি কমিয়ে দেবে। এতে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলো বিপদে পড়বে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে নানা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ সন্তেÍাষজনক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। ব্যাপক লুটপাট এবং অপব্যবহারের কারণে আওয়ামী লীগ আমলের শেষ পর্যায়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে আসে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক বিনিময়ের ভারসাম্য অনেকদিন পর বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে। ২০২২ সালে স্থানীয় বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৭ টাকা। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৫ টাকায় উন্নীত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার স্থানীয় মুদ্রায় ১১০টাকা ফিক্সড করে রাখা হয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে করা চরম ভুল। সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে তুলনামূলক কম দামে ডলার সরবরাহ করার জন্যই মূলত এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ফিক্সড করে রাখার নেতিবাচক প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি অনেক মূল্যের বিনিময়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রথমে ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করা হয়। ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের ফলে একদিনের ব্যবধানে বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকা থেকে ১১৭ টাকায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার পুরোপারি বাজারভিত্তিক করা হয়। বাজারভিত্তিক করার পর প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা থেকে ১২৩ টাকায় ওঠানামা করছে।

মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় ফিক্সড করে রাখার ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে। স্থানীয় বাজারে মার্কিন ডলারের ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রতি মার্কিন ডলার কার্ব মার্কেটে ১২৬/১২৭ টাকায় বিক্রি হতো। প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ পাবার প্রত্যাশায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করতে থাকে। এতে রেমিট্যান্সের আকারে আসা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে যুক্ত হতো না। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করতে শুরু করে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করতে সক্ষম হয়, যা ছিল এযাবতকালের মধ্যে কোন এক বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়। চলতি অর্থবছরে যেভাবে রেমিট্যান্স আসছিল তাতে বছর শেষে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যাবার কথা। কিন্তু এখন যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়বে বলেই মনে হচ্ছে।

নতুন সরকার আমলে ব্যক্তি খাতে স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা যুদ্ধের কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। বর্তমানে জিডিপি-ইনভেস্টমেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ। এটা বিগত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। যুদ্ধের কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবার অর্থ হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হওয়া। দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সামষ্টিক অর্থনীতি সচল এবং স্থিতিশীল না থাকলে রাজস্ব আহরণের পরিমাণও কমে যেতে পারে। রাজস্ব আহরণের পরিমাণ কমে গেলে সরকারকে উন্নয়ন কর্মকা-ে অর্থায়নের জন্য বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে অধিক পরিমাণে ঋণ করতে হবে। কিন্তু বিদেশি ঋণ পাওয়া এখন আর সহজ হবে না। ব্যাংকগুলো সরকারকে অধিক পরিমাণে ঋণদানের জন্য প্রস্তুত নেই।

কাজেই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে, দেশ এক গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে পতিত হতে চলেছে। এই অবস্থায় আমাদের সর্বাবস্থায় কঠোর কৃচ্ছ্র সাধন করতে হবে।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।