আফগান যুদ্ধে ব্যাপক নাকানি-চুবানি এবং সেখান থেকে পাততাড়ি গুটানো এবং তালেবানদের কাছে বশ্যতা স্বীকারের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন আধিপত্য কিছুটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত হওয়ার আভাস পাওয়া গিয়েছিলো। তাইওয়ান সহ নানা ইস্যুতে চীনের সাথে মাঝে মাঝেই উত্তেজনা সৃষ্টি, একই সাথে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন-এর সাথে বাগাড়ম্বর ছাড়া মার্কিনীদের সাম্প্রতিক সময়ে তেমন কোন অর্জন নেই বললেই চলে। অবশ্য বর্তমান মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্য শু মাধ্যম একটা আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালালেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এ ইস্যুতে তাকে পৃষ্ঠ প্রদর্শনই করতে হয়েছে।

গত বছর ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার জেরে উভয় দেশের মধ্যে অপরাশেন সিঁদুর ও অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস নামে উভয় দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের মাঝ পথেই উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম এ যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। আর একই বছরে ইরান ও ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করলে ১২ দিনের মাথায় যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কৃতিত্বও দাবি করেছিলেন ওয়াশিংটন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাদের এ দাবি নিয়ে খোদ মার্কিনী থিংক ট্যাংকদের মধ্যেই রয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। তাই বোদ্ধামহল বিষয়টিকে রীতিমত আষাঢ়ে গল্প বলেই মনে করেন। ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্য যে রীতিমত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

মূলত, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে নিজ দেশ থেকে গ্রেফতার করে মার্কিন মুলুকে নিয়ে যাওয়ার সফলতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খানিকটা বেপরোয়া করে তোলে। ফলে অনেকটা আনন্দের আতিশয্যেই মার্কিন-ইসরাইল যৌথভাবে গত মাসের শেষের দিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে যৌথভাবে হামলা চালিয়ে বসে। তারা ধরেই নিয়েছিলো যুগপৎ হামলায় ইরান বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না। সঙ্গত কারণেই হামলা শুরুর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, শিগগির এ যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু প্রায় মাস হয়ে এলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এদিকে জায়নবাদী ইসরাইলও এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। যুদ্ধবাজদের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সূত্রই তাদের জানিয়েছে, হামলা চালালে হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহনের কী হবে, এ বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে। সিএনএনের আরেক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনে হচ্ছে ট্রাম্প দিন দিন বড় হয়ে ওঠা এ যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলা শুধু ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশে হামলা শুরু করেছে ইরান। তবে কয়েক দিন পর মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালায় ইরান। এর জেরে সৌদি আরব একটি তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেয়। কাতার তার গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করেছে। ইরাক, ওমানেও তেলের স্থাপনায় হামলা করা হয়েছে। এমন হামলা হয়েছে বাহরাইনেও। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা কমে আসতে শুরু করে যুদ্ধের এক সপ্তাহ না পেরোতেই। বাধ্য হয়ে এসব দেশে আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। একই পথে হাঁটতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকেও। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘টার্মিনাল হাই অল্টিচিউড এরিয়া ডিফেন্স’ (থাড) সিস্টেমের অংশবিশেষ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। ইরানের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্রের মতে, চলমান অভিযানের পরিকল্পনা করার সময় ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ইচ্ছা বা সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষা করে গেছে পেন্টাগন এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য পরিণতিগুলো পুরোপুরি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এ সংঘাতের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ের পুরোটাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। অভিযান শুরু হওয়ার আগে আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা সভায় জ্বালানি ও অর্থ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বা এর আগের সব প্রশাসন হরমুজ নিয়ে যেসব বিশ্লেষণ এবং পূর্বাভাস দিয়েছিল, সেগুলো উপেক্ষা করে গেছেন বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। হরমুজ প্রণালির এ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক প্রশাসনে কাজ করা একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি প্রতিরোধের পরিকল্পনাটি কয়েক দশক ধরে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির একটি মূল ভিত্তি ছিল। সরকারের কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি হতবাক।’

এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্প্রতি হরমুজ নিয়ে তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ বন্ধ থাকবে। ফলে এ প্রণালি দিয়ে কবে পণ্য পরিবহন পুরোদমে শুরু হবে এবং এর কল্যাণে জ্বালানি সংকট কাটবে, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, ট্রাম্প এ প্রণালিতে জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বললেও মার্কিন নৌবাহিনী তাতে সাড়া দেয়নি। সিএনএনের আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে এবারের হামলা শুরুর পর সততার সঙ্গে বিজয় ঘোষণা করতে পারবেন না। মনে হচ্ছে, তিনি একটি সম্প্রসারিত হয়ে চলা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন এবং যুদ্ধ থেকে সরে আসার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি, এতে থেকে যাওয়ার চেয়ে বেশি বিপর্যয়কর হবে।

ট্রাম্পের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির আভাস দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধে হেরে সংঘাতগুলোকে দীর্ঘায়িত করেছিলেন। ট্রাম্প এখনো তাদের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। প্রায় মাসব্যাপী চলমান এ যুদ্ধের আকার দিন দিন বড় হচ্ছে। এ যুদ্ধের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের ক্রমহ্রাসমান সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে তেল রপ্তানির একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ইরানের বন্ধ করে দেয়ার মধ্যদিয়ে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি সত্ত্বেও ইরানের সরকার দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকলেও সবকিছু সহিংসতা দিয়ে সমাধান করা যায় না।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদিও সামরিক দিক থেকে ইরান অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পকে এমন এক সামরিক ধাঁধায় ফেলেছে, যা সমাধান করার চেষ্টা করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। ট্রাম্পের যে চরম দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে, সেটাও প্রকাশ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা। মার্কিনীদের সামরিক বিজয় কীভাবে আসতে পারে এ প্রসঙ্গে দেশটির নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান সিএনএনকে বলেন, ‘যদি আপনি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারেন, তবে আপনি বিজয়ী হতে পারবেন না। হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় খুলে দিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অসম্ভব না হলেও একটি কঠিন কাজ।’

সার্বিক দিক বিবেচনায় মার্কিনীরা যে ইতোমধ্যেই লেজে-গোবরে অবস্থায় পড়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে চেয়ে এখন সে অবস্থান থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ইরানে আগামী সপ্তাহের মধ্যে কঠোর আঘাত হানা হবে। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পার হতে বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলোকে রক্ষা করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ভালোভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার এ রণহুঙ্কার বাস্তবতার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, ইসরাইলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এখন ইরানের ওপর চলতে থাকা ক্রমবর্ধমান ও অনির্দিষ্টকালীন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এমন কিছু সম্ভাব্য ‘এক্সিট র‌্যাম্প’ বা ‘প্রস্থান পথ’ বা সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এমনটি হলে হয়তো যুদ্ধ আরও বিস্তার লাভ করার আগেই থেমে যেতে পারে এবং অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

গত কয়েক দিনে ইসরাইলের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। এরপর তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ইসরাইলী কর্মকর্তার উদ্বেগের মূল কারণ হলো ‘যুদ্ধের মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে।’ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটে ঠেলে দিতে পারে। আর ট্রাম্প নিজেও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। কারণ, জনসমর্থন ছাড়াই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে নিয়ে গেছেন। ইসরাইলী ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণভাবে পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের স্বার্থে কি না, আমি নিশ্চিত নই। কেউই অনন্তকাল ধরে চলা কোনো গল্প চায় না।’

উল্লেখ্য, ইসরাইলের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের ব্যাপক হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইসরাইলের বিরশেবায় সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী। সিএনএন জানায়, ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত কয়েক ডজন মানুষ আহত এবং বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে ইরাকে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ছয়জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে বিবিসি জানায়, ওমানে একটি ড্রোন বিধ্বস্তের ঘটনায় দুই ব্যক্তি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুবাইয়ে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। দুবাইয়ের আল-কুজ এলাকায় আগুনের কুণ্ডলী দেখে নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ৫৬টি ড্রোন প্রতিহতের খবর জানিয়েছে সৌদি আরব।

এদিকে ইরাকের কুর্দিস্তানে এক হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইরবিল অঞ্চলে সংঘটিত এ হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা করেছেন। এদিকে তেহরানে আল কুদস দিবসের র‌্যালিতে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে তারা। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে হামলায় আটজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দেশটিতে ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য বিভাগ। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানে ১৫ হাজার হামলা চালিয়েছে তারা। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫১ জন। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী গার্ড সকল হামলার যোগ্য জবাব দিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে করা হচ্ছে, মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্র এখন ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটার পথ খুঁজছে। সে ধারাবাহিকতায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তেহরানের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আদায় করা সম্ভব হয়েছে এবং সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে। গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনই আলোচনায় আছি’। তিনি আরও জানান, একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র সঠিক পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ইরানও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ইরান এ আলোচনার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এ ধরনের খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে এক মাসের যুদ্ধবিরতি চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করা, আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, জ্বালানি খাত ও হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত বিষয়ে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান জানিয়েছে যে অ-শত্রুতাপূর্ণ জাহাজগুলো নির্দিষ্ট সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করতে পারবে।

যদিও কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছে, তবু সংঘাত থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী হাজার হাজার সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে আগে থেকেই অবস্থানরত প্রায় ৫০ হাজার সেনার সঙ্গে নতুন বাহিনী যুক্ত হতে পারে, যা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে উদ্দেশ্য হাছিল করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। মুখে স্বীকার না করলেও অবশেষে হার মানতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ এলাকায় যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে ইরানের কাছে ১৫ দফার যে শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তাতে পরিকল্পনার নির্দিষ্ট দফাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে এ প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আগে পাকিস্তান যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ এ পরিকল্পনার বেশ কিছু শর্ত ও দাবির কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং একে একটি ‘মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।

বিনিময়ে ইরান কী সুবিধা পাবে, প্রতিবেদনে সেটিও বলা হয়েছে। খবরে দাবি করা হয়েছে, ইরান যদি এ প্রস্তাবগুলো মেনে নেয়, তবে দেশটির ওপর থেকে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। অবশ্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, তারা এখনো এই সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র দেখেনি। গণমাধ্যমে আসা এ তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছে তারা। তবে ইরান তা সরাসরি প্রত্যাখান করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য পাল্টা শর্ত আরোপ করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে বলে গত সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ইসরাইলী সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পরোক্ষ আলোচনার অংশ হিসেবে এ সংঘাত নিরসনে ইরান কিছু কঠোর আনুষ্ঠানিক দাবি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা এ নিশ্চয়তা চাইছেন যে যুদ্ধ আর নতুন করে শুরু হবে না। পাশাপাশি তাঁরা হরমুজ প্রণালির জন্য এমন একটি নতুন ব্যবস্থা চাচ্ছেন, যার মাধ্যমে ওই এলাকা কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সাথে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। সে সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণও চেয়েছে তারা।

এ ছাড়া বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে ইরান। তাদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা শত্রুভাবাপন্ন কার্যকলাপে জড়িত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের বা ব্যক্তিদের তাদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা তাঁদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এর আগে গত সোমবার ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন বেশ কিছুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ‘এবার তারা (ইরান) বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে’।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ইরান যোগ্য জবাব দেওয়ায় মার্কিনীরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তারা এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশল অবলম্বন করতে শুরু করেছে। তবে তেহরান কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিচ্ছে না বরং তারা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। যা যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্র দখলদার ইসরাইলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিপত্য এখন রীতিমত হুমকির মুখে পড়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরাজয়, আফগানিস্তানে বিপর্যয় এবং ইরান যুদ্ধে ব্যাকফুটে থাকা বিশ্ববাসীকে সে কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়। মূলত, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে নিজ প্রাসাদ থেকে গ্রেফতার এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিমাত্রায় আত্মম্ভরী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ফলাফল প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। একথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।

www.syedmasud.com