জাফর আহমাদ

হায়াত-মওতের মালিক আল্লাহ তা’আলা। তথাপি যে ক’দিনই বাঁচবেন, সম্মানের সাথে বাঁচুন। সম্মান বলতে চরিত্রকে বুঝানো হচ্ছে। আর চরিত্র বলতে সৎ চরিত্রকেই বুঝাচ্ছি। কারণ অসৎ চরিত্র বলেও তো একটি চরিত্র আছে। আর চরিত্রের প্রথম ও প্রধান বিষয় হচ্ছে, ঈমান। ঈমান মানে হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। এ বিশ্বাসের আলোকে আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজেকে সমর্পণ করার নাম হচ্ছে, মুসলিম। আর মুসলিম যখন খাঁটি বা নিষ্ঠা (খুলুছিয়াত) সহকারে নিজেকে আল্লাহর হুকুমের সামনে পেশ করে তখন তাকে আখলাক বা চরিত্র বলে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ঈমান সহকারে যে সৎকাজ করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করবো।” (সুরা নাহল: ৯৭) পবিত্র জীবন মানে সম্মানিত জীবন। সুতরাং সম্মানিত জীবন পেতে হলে, ঈমানের সাথে সৎ জীবন যাপন করতে হবে।

আমাদের লোকাচার ভুলভাবে উপস্থাপন করে যে, সম্মান ধন-দৌলত, চাকুরি-বাকুরি ও উচ্চ পর্যায়ের পদ-পদবীর সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ যার টাকা-পয়সা আছে এবং বড় বড় পদ-পদবী আছে তারাই সম্মানিত। এটি ভুল ধারণা। তারা মনে করে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার পথ অবলম্বন করলে মানুষের পরকালে সাফল্য অর্জিত হলেও তার পার্থিব জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের জবাবে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর দিকে ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটি দীর্ঘসময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবনসামগ্রী দিবেন এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অনুগ্রহ দান করবেন।” (সুরা হুদ : ৩) সত্যিকারের সম্মান পেতে হলে পবিত্র জীবন যাপন করতে হবে। পবিত্র জীবন যাপন করলে অঢেল সম্পদ, বড় চাকুরি, বড় পদ-পদবী না পেলেও মহান আল্লাহ একটি পূত-পবিত্র ও সম্মানিত জীবন দান করবেন। সঠিক পথ অবলম্বন করলে শুধু পরকালীন জীবনই সুগঠিত হয় না, বরং দুনিয়ার জীবনও সুখী সমৃদ্ধশালী হয়।

যারা প্রকৃত ঈমানদার, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, বিশ্বস্ত ও সৎ তাদের পার্থিব জীবন এবং বেঈমান ও অসৎকর্মশীল লোকদের সম্মান ও প্রতিপত্তির প্রভাব, রূপ ও মাত্রার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। সচ্চরিত্র লোকেরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম সাফল্য লাভ করেন। পক্ষান্তরে দুনিয়াপূজারী অসৎলোকদের প্রতিটি সাফল্য হয় নোংরা ও ঘৃণিত পদ্ধতি অবলম্বনের ফসল। সৎ লোকেরা ছেঁড়া কাঁথায় শয়ন করেও যে মানসিক প্রশান্তি ও চিন্তার স্থৈর্য লাভ করে তার সামান্যতম অংশ প্রাসাদধারী বেঈমান দুষ্কৃতকারীরা লাভ করতে পারে না। আমাদের দেশের সাম্প্রতিককালের হাজার হাজার ও লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার লুট-পাটকারী লুটেরাদের জীবনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তার বাস্তব চিত্র দিবালোকের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে যায়।

সৎচরিত্র বা পবিত্র জীবন অবলম্বন করলে মানুষ আখেরাতে লাভবান হলেও দুনিয়া একেবারেই বরবাদ হয়ে যাবে এ মন্ত্র মূলত: শয়তানের মন্ত্র। সে মন্ত্র শয়তান প্রত্যক দুনিয়ার মোহে মুগ্ধ অজ্ঞ-নির্বোধদের কানে ফুঁকে দেয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “শয়তান তোমাদের দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং লজ্জাকর কর্মনীতি অবলম্বন করতে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস দেন। আল্লাহ বড়ই উদারহস্ত ও মহাজ্ঞানী।” (সুরা বাকারা : ২৬৮) শয়তান মানুষকে আরো প্ররোচনা দেয় যে, এ ধরনের আল্লাহভীরু ও সৎলোকদের জীবনে দারিদ্র, অভাব ও অনাহার ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা এই ধারণার প্রতিবাদ করে বলেন, সঠিক পথ অবলম্বন করলে তোমাদের শুধুমাত্র আখিরাতই নয়, দুনিয়াও সমৃদ্ধ হবে।

দুনিয়ার জীবনে তারাই সম্মানের অধিকারী হয় এবং আখিরাতের মতো দুনিয়াতেও যথার্থ মর্যাদা ও সাফল্য ঐ লোকদের জন্য নির্ধারিত, যারা আল্লাহর প্রতি যথার্থ আনুগত্য সহকারে সৎ জীবন যাপন করে, যারা পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত চরিত্রের অধিকারী হয়, যাদের ব্যবহারিক জীবনে ও লেনদেনে কোন ক্লেদ ও গ্লানি নেই, যাদের ওপর প্রত্যেকটি বিষয়ের ভরসা করা যেতে পারে, যাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি কল্যাণের আশা পোষণ করে এবং কোন ব্যক্তি বা জাতি যাদের থেকে অকল্যাণের আশংকা করে না। যারা প্রত্যেক মানুষের সহৃদ হিসাবে পরিগণিত হয়।

এ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে মহান আল্লাহ গভীর অন্তর্দৃষ্টির শক্তি দান করেন। ফলে সে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শক্তি রাখে। হিকমতের মতো অমূল্য সম্পদধারী এ ব্যক্তিরা কখনো শয়তানের দেখানো পথে চলতে পারে না। বরং সে আল্লাহর দেখানো প্রশস্ত পথ অবলম্বন করে। শয়তানের সংকীর্ণ পথে কখনো পা বাড়ায় না। শয়তানের সংকীর্ণমনা অনুসারীদের দৃষ্টিতে নিজের ধন-সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখা এবং সবসময় সম্পদ আহরণের নতুন নতুন ফন্দি-ফিকির করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। কিন্তু যারা আল্লাহর কাছ থেকে অন্তরদৃষ্টি লাভ করেছে, তাদের মতে এটা নেহাত নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের মতে, মানুষ যা কিছু উপার্জন করবে, নিজের মাঝারি পর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ করার পর সেগুলো প্রাণ কুলে সৎকাজে ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দুনিয়ার হাতে গোণা কয়েকদিনের জীবনে প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় জনের তুলনায় হয়েতো অনেক বেশী প্রাচুর্যের অধিকারী হতে পারে। কিন্তু মানুষের জন্য এ দুনিয়ার জীবনটিই সম্পূর্ণ জীবন নয়। বরং এটি আসল জীবনের একটি সামান্যতম অংশ মাত্র। এই সামান্য ও ক্ষুদ্রতম অংশের সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার বিনিময়ে যে ব্যক্তি বৃহত্তর ও সীমাহীন জীবনের অসচ্ছতা, দারিদ্র ও দৈন্যদশা কিনে নেয় সে আসলে নিরেট বোকা ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি এ সংক্ষিপ্ত জীবনকালের সুযোগ গ্রহণ করে মাত্র সামান্য পুঁজির সহায়তায় নিজের ঐ চিরন্তন জীবনের সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে সে-ই আসলে বুদ্ধিমান, সে-ই আসলে পৃথিবী ও আখিরাতের প্রকৃত সফল ব্যক্তিত্ব। আর সে-ই প্রকৃত সম্মানিত ব্যক্তি।

আগেই বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার জীবনে আমরা অঢেল সহায়-সম্পত্তির মালিক, রাষ্ট্রীয় পদ-পদবিধারী, স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পদবীওয়ালাকে দেখেছি, তাদের টাকা-পয়সা, অঢেল সহায়-সম্পত্তি ও তাদের রাষ্ট্রীয় বা কর্মক্ষেত্রের পদ-পদবী তাদেরকে সম্মানিত করতে পারেনি। মানুষ তাদের বাহ্যিক সমীহ করে বটে কিন্তু সম্মানিত মনে করে না। ব্যাহ্যিক দৃষ্টিতে আমরা তাদেরক সফল ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করি বটে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে ভালো করেই জানে সে কতটুকু সুখী ও সফল ব্যক্তি। অথচ আপনার পাশের নিতান্ত ব্যক্তিটি অঢেল সম্পত্তি মালিক নয়, অতি সাধারণ জীবন-যাপন করেন। কিন্তু ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত সৎ। আল্লাহর ভয় যাকে সাড়াক্ষণ তাড়া করে ফিরে। সত্যিকার অর্থে সে-ই প্রকৃত সফল ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।

উপরে উল্লেখিত আয়াতে এ ধরণের সৎ জীবন যাপনকারী ব্যক্তিদেরকে দুনিয়ার জীবনে উত্তম জীবন সামগ্রী দান করবেন বলে আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন। আল কুরআন দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন সামগ্রী দু’প্রকারের। এক প্রকারের জীবন সামগ্রী আল্লাহ বিমুখ লোকদেরকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে তারা নিজেদেরকে দুনিয়া পূজা ও আল্লাহ বিস্মৃতির মধ্যে আরো বেশী করে হারিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি নিয়ামত ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে এটি আল্লাহর লানত ও আযাবের পটভূমি রচনা করে। সাম্প্রতিককালে আমরা আমাদের দেশে এর উদাহরণ দেখেছি। দ্বিতীয় প্রকারের জীবন সামগ্রী মানুষকে আরো বেশী সচ্ছল, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তাকে তার আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করে। এরাই সমাজের সর্বস্তরে সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিগণিত হয়। এরা আল্লাহর দেয়া উপকরণাদির সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করে দুনিয়ায় ভালো, ন্যায় ও কল্যাণের উন্নয়ন এবং মন্দ, বিপর্যয় ও অকল্যাণের পথ রোধ করার জন্য আরো বেশী প্রভাবশালী ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এরাই সম্মানিত জীবন যাপন করে।

লেখক : ব্যাংকার।