ভারত বহুদিন ধরে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিজেদের দাবি করে আসছে। ভারতীয়দের দাবি, ভারত এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু গত তিন দশকে বিশেষ করে ২০১৪ সালের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমনভাবে বদলে গেছে যে দেশটিকে আজ বহুত্ববাদের মডেল হিসেবে আর নির্দ্বিধায় তুলে ধরা কঠিন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের কল্যাণ এলাকায় তিন মুসলিম শিক্ষার্থীকে একটি মূর্তির সামনে জোরপূর্বক মাথা নত করানোর ঘটনা, এই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতীক। সম্প্রতি প্রকাশিত ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভারতের মহারাষ্ট্রের কল্যাণ এলাকায় তিনজন মুসলিম শিক্ষার্থীকে জনসমক্ষে অপমানিত করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক একটি মূর্তির সামনে হাতজোড় করে মাথা নত করতে বাধ্য করা হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়Ñএকটি নির্জন শ্রেণীকক্ষে ওই মুসলিম শিক্ষার্থীরা নামাজ আদায় করছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের সদস্যরা স্থানীয় আইডিয়াল কলেজে হঠাৎ ঢুকে পড়ে। পরে তারা মুসলিম ছাত্রদের জোর করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে এবং ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের মূর্তির সামনে মাথা নত করায়।এ সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের চারদিকে ঘিরে চরমপন্থি কর্মীরা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে থাকে এবং হুমকি দিয়ে মূর্তির সামনে প্রণাম করতে বাধ্য করে। মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস এবং মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভি এ তথ্য নিশ্চিত করে পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগÑএ ঘটনা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে সংখ্যালঘুদের ওপর বাড়তে থাকা হয়রানি ও নিপীড়নের ধারাবাহিকতার অংশ। উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো বিনা অভিযোগে মুসলিমদের টার্গেট করছে, আর এই পরিস্থিতিতে পুলিশ মুসলিমদের সুরক্ষা দিতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা কলেজ প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কর্তৃপক্ষ জনতার চাপে নতি স্বীকার করেছে এবং উল্টো ভুক্তভোগী ছাত্রদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে চাইছে।
ভারতে মুসলিম বিরোধী রাজনীতির এই উত্থানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, যা স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যেদিন অযোধ্যায় ১৬শ শতকের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেয়া হয়। এই ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য আরো অনেক বছর আগে থেকেই। ১৯৪৯ সালে রাতের অন্ধকারে বাবরি মসজিদের ভেতরে রামলালার মূর্তি রাখার অজুহাত দিয়ে প্রশাসন মসজিদটি বন্ধ করে দেয়, যা ছিল রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার ওপর প্রথম বড় আঘাত। পরবর্তী কয়েক দশকে আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বিজেপির সমন্বিত প্রচারণা অযোধ্যাকে জাতীয় আবেগের ইস্যুতে পরিণত করে। উগ্র হিন্দুদের হাতে মসজিদ ভাঙার মুহূর্তে পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ভারতের গণতান্ত্রিক পরিচয়কে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যদিও সুপ্রিম কোর্ট ২০১৯ সালের রায়ে মসজিদ ভাঙাকে অবৈধ ঘোষণা করে, কিন্তু একই সাথে আবার মসজিদের জমিটি হিন্দুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়Ñযা মুসলিম সমাজে গভীর বেদনার কারণ হয়ে আজো টিকে আছে।
বাবরি মসজিদ নিয়ে এই ট্রাজেডির পর ভারতে আরও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা দেয় আর তাহলো ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম স্থাপনাকে ঘিরে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং মন্দির পুনরুদ্ধার করার নামে একের পর এক দাবি উত্থাপন। বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ থেকে শুরু করে মথুরার শাহি ঈদগাহ, এমনকি তাজমহল পর্যন্ত একাধিক ইসলামিক স্থাপনার বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা প্রচারণা ও মামলা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই দাবিগুলোর বেশিরভাগের সাথেই ইতিহাসবিদরা একমত নন। তবুও জনমতকে উত্তেজিত করতে এবং মুসলিমদের প্রতীকীভাবে দুর্বল করতে এই অপপ্রচার কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আদালত ও প্রশাসন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব দাবির তীব্রতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো আরো বেশি আগ্রাসী হতে উৎসাহিত হয়।
ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের আরেক রূপ হলো গরুর গোশতকে কেন্দ্র করে সহিংসতা। সহিংসতার মোড়কে নির্মমতা কতটা প্রকট হতে পারে তার নিকৃষ্ট উদাহরণ ২০১৫ সালের দাদরির আখলাক হত্যার ঘটনা। এরপর থেকে প্রতি বছরইৎ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গরু পরিবহন, কসাইখানা এবং গোমাংসের গুজবকে কেন্দ্র করে লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ভয়াবহ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এরকম ৯৭% হামলার শিকার মুসলিম এবং এগুলো ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে। তাছাড়া হামলার সাথে জড়িতদের মধ্যে অনেকেরই পলিটিকাল কানেকশন থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। এসব সহিংস ঘটনায় পুলিশ কেবল অনুপস্থিতই থাকে না, এমনকি কখনো কখনো খোদ ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই মামলা দাযের করে যা ভারতে সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভারতে গরু অনেক সম্প্রদায়ের কাছেও বহুল ব্যবহৃত হলেও কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের টার্গেট করতেই এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানো হয়েছে।।
পাশাপাশি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) ভারতের মুসলিমদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করেছে। প্রথমবারের মতো নাগরিকত্ব নির্ধারণে ধর্মকে ভিত্তি করা হয়েছে এবং মুসলিমদেরকে বাদ দিয়ে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত NRC প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে এটি ভারতের বহু মুসলমানকে ভয়, অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক হয়রানির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আসামে এনআরসি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে যে, শুধুমাত্র নথি না থাকার কারণে জন্মসূত্রে ভারতীয় বহু প্রবীণ নারী-পুরুষ রাতারাতি ‘অবৈধ’ হয়ে পড়েছেন। ভারতের বহু দরিদ্র মুসলিমের কাছে জন্মমৃত্যু–সম্পত্তির নথিপত্র সংগ্রহ করা বাস্তবে কঠিন। আর এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোই মুসলিমদেরকে রাজনৈতিক এক প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইন ও উত্তরাধিকার আইন নিয়েও সরকার ও শাসক দলের নেতারা একতরফা বক্তব্য দিচ্ছেন। ট্রিপল তালাক ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার পর এখন মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ওপর হাত দেয়া হয়েছে। অথচ এ কাজগুলো করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মুসলিম সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বিশেষজ্ঞদের সাথে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। ভারতের বহুধর্মীয় পারিবারিক আইনব্যবস্থায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের আইনেই সংস্কারের সুযোগ আছে, কিন্তু শুধুমাত্র মুসলিম আইনকে কেন্দ্র করে জনমত উত্তেজিত করার প্রচেষ্টায় প্রমাণিত হয় যে. এসব অপপ্রচারের লক্ষ্য নিছক ধর্মীয় সংস্কার নয়, বরং রাজনৈতিক মেরুকরণ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনজীবনে মুসলিম পরিচয়কে লক্ষ্য করে হয়রানির ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কর্ণাটকে হিজাব নিষিদ্ধ করে মুসলিম ছাত্রীদের ক্লাসরুম থেকে বের করে দেওয়া, বিভিন্ন স্কুলে জুমার নামাজ বন্ধ করা, ছেলেদের দাড়ি বা মেয়েদের ওড়না নিয়ে মন্তব্যÑএসব আচরণ তরুণ প্রজন্মের মানসিক নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করছে। উগ্র হিন্দু গোষ্ঠী কলেজে ঢুকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের অপমান করলেও স্থানীয় পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছেÑএটাই আজকের ভারতের দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। বহু স্কুল-কলেজেই নামাজ পড়লে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য একটা সময় বিরতি দেয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেক মুসলিমের নামের সাথে আরবি শব্দ থাকায় তাদেরকে শিক্ষা, চাকুরি, কমসংস্থান বা বাসস্থান থেকে শুরু করে সবকিছুতেই বৈষম্য করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, জন্মসূত্রে থাকা ভারতীয় মুসলিমরাও এখন প্রকাশ্যে বা পাবলিক ডোমেইনে মুসলিম পরিচয় দিতে ভয় পাচ্ছে।
এই সমস্ত ঘটনা মিলিয়ে স্পষ্ট যে ভারতে এখন একটি বিপজ্জনক ছায়া বিস্তার করছেÑ যেখানে রাষ্ট্রীয় নীরবতা, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং সংগঠিত উগ্রবাদ একে অপরকে শক্তি জোগাচ্ছে। বৈষম্য কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই নয় বরং সামাজিক মনস্তত্ত্বেও গেঁথে দেয়া হচ্ছে। একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু সংখ্যালঘুদের নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে। ভারতে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় নীরবতা ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের মতো বিষয়গুলোই সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মুসলিমদের ওপর সহিংসতা বা নিপীড়নের সময়ে বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থেকেও হস্তক্ষেপ করেনি। সহিংস ঘটনার সাথে জড়িত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধেও কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। অনেকক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মুসলিমই অভিযুক্ত হয়েছে আর সর্বোপরি প্রশাসন ‘আইনশৃঙ্খলা শান্ত রাখার দোহাই দিয়ে পুরো ঘটনাকেই চাপা দিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অদ্ভুত নিরবতা ও পক্ষপাতিত্ব সার্বিকভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আরো আগ্রাসী ও ভয়ংকর রূপ ধারন করার সুযোগ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি প্রশাসন যেভাবে মুসলিমদের কোনঠাসা করার চেষ্টা করছে তাতে ভারতের সামাজিক কাঠামোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিপদ ডেকে আনতে পারে। অনেকেই মনে করছেন যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই ক্র্যাকডাউন চলতে থাকে তাহলে সামনের দিনগুলোতে সামাজিক বিভাজন চরমে পৌঁছাবে। সেই সাথে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ শিক্ষার পরিবেশও দুষিত করবে। পাশাপাশি, চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করবে। এমনটা চলতে থাকলে সংখ্যালঘুদের মেধা, সৃজনশীলতা ও আর্থিক অংশগ্রহণ হ্রাস পাবে। আন্তর্জাতিক পরিসরেও ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিজেপি কেন এতটা মুসলিম বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে তা স্পষ্ট নয় কেননা ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা ২০ কোটিরও বেশি এবং বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোন উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
ভারত এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিসরে হিন্দুরাষ্ট্র নয় বরং নিজেদেরকে সর্ববৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর এমন একটা দাবি করার নেপথ্যে ভারতের সবচেয়ে অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে যা কাজ করেছে তাহলো বিভিন্ন বৈচিত্রের মানুষের মেলবন্ধন। মুসলিমরা সেই বৈচিত্রের অপরিহার্য অংশ। ভারতবর্ষের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ভাষার প্রতিটি স্তরে মুসলিমদের গৌরবজ্জ্বল অবদান রয়েছে। কিন্তু আজ সেই ভারতে মুসলমাদের অস্তিত্বের ওপর শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ভারতের জন্যই ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি বিপদ ডেকে আনতে পারে কেননা এমনটা চলতে থাকলে ভারতের বিদ্যমান সমাজ কাঠামোই ভেঙে পড়বে। একটি রাষ্ট্র যতই অর্থনৈতিক উন্নয়ন করুক, যদি নাগরিকদের একটি বৃহৎ অংশ অশ্বাস, বৈষম্য ও ভয় নিয়ে বাঁচেÑতবে সেই উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না।
প্রকৃতপক্ষে মানবরচিত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ যদিও সকল ধর্মের মানুষের সুরক্ষা এবং সবাইকে সমানভাবে ধর্মীয় আচারাদি পালনের সুযোগ দেয়ার কথা বলে, কার্যত এমনটা কখনোই সম্ভব হয় না। তথাকথিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতই তার প্রমাণ। ভারত কাগজে কলমে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও দেশটি শাসন করছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী একটি গোষ্ঠী যারা মূলত তাদের আদি সংগঠন আরএসএস এর স্বপ্ন অনুযায়ী একটি বৃহৎ হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের জন্য কাজ করছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা তাদের এই কার্যক্রমে সহায়তাও করছে। ভারতবর্ষ যখন মুসলিমরা শাসন করেছে তখনই বরং ভারত সবচেয়ে বেশি উন্নত ও স্থিতিশীল ছিল। মুসলিমরা শাসকের চেয়ারে বসলেও দরবারের শীর্ষ অনেক পদেই হিন্দুরা অবলীলায় কাজ করতে পেরেছে যা এখন কল্পনাও করা যায় না।
ভারতের চলমান ধারাটি হলো হিন্দুবাদের উগ্র ও কট্টরপন্থী সংস্করন। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি অনুসারে, ভারতের মাটিতে শুধুমাত্র সেই সব মানুষই থাকতে হবে, সেই সব দল বা গোষ্ঠীই বিচরণ করতে পারবে যারা তাদের মতোই কট্টরপন্থী মানসিকতা লালন করে। এখানে বলা বাহুল্য, এই চিন্তাধারার লোকেরাই কিন্তু এই ভারতের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। গান্ধীকে মনে করা হতো শান্তির প্রতীক। অথচ সেই গান্ধীকেও তারা ছেড়ে কথা বলেনি, কারণ তাদের মতে মহাত্মা গান্ধী হিন্দু হলেও তাদের মতো কট্টরপন্থী মানসিকতা লালন করতেন না। হিন্দুত্ববাদীদের মতে গান্ধী ছিলেন প্রতারক, যিনি নিজ ধর্ম বিশ্বাসের মৌলিক চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে, তাদের কট্টরপন্থী হিন্দু চিন্তাধারাই অন্য সকল ধর্মদর্শনের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর। ভারতের এই আগ্রাসী আন্দোলন সম্বন্ধে প্রতিবেশি দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সচেতন থাকাটা জরুরি।