আসিফ আরসালান
দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য দেশে এবং বিদেশে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। সমস্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করে ভারত সরকার দিল্লি এবং কলকাতায় আওয়ামী লীগ অফিস খোলার অনুমতি দিয়েছে। এ অফিস খোলার ব্যাপারে ভারত সরকার এবং আওয়ামী লীগ উভয়ে মিলে একটি চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। কলকাতা থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশী বলেন যে, ঘটনাচক্রে কলকাতার নিউমার্কেটে এক আওয়ামী লীগ কর্মীর দেখা মিলে ছিলো। নানা কথার পর সে আমাকে তাদের অফিসে নিয়ে যায় এবং বলে যে কলকাতায় তারা আওয়ামী লীগের অফিস খুলেছে। বাংলাদেশের ঐ মানুষটি সে অফিসে গিয়ে দেখেন যে সেখানো কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই শেখ মুজিবের কোনো ফটো বা নেই শেখ হাসিনার কোনো ছবি। এমনকি আওয়ামী লীগ নামেও সেখানে কোনো ফাইল দেখা যায়নি। কারণ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ঐ নেতা বলেন, এখানে আমরা অর্থাৎ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বৈঠক করি। সাইনবোর্ড বা মুজিব হাসিনার ছবি থাকলে যদি প্রমাণিত হয় যে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের অফিস খোলা হয়েছে তাহলে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে। এজন্যই এমন পরিবেশ রাখা হয়েছে যাতে কেউ কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারে যে এখানে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো অফিস রয়েছে। অনুরূপভাবে দিল্লিতেও একটি সুপরিসর কক্ষ নেওয়া হয়েছে যেটি কলকাতার মতোই বাইরে থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস বলে চিহ্নিত করার কোনো প্রমাণ নেই।
দিল্লিতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে থেকেও শেখ হাসিনা নিয়মিত কলকাতা এবং বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তারই নির্দেশে বাংলাদেশে ‘মঞ্চ-৭১’ নামে বাংলাদেশে একটি সংগঠন বানানো হয়েছে। এদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো, গত ১৫ অগাস্ট দেশব্যাপী শেখ মুজিবের মৃত্যু দিবস উপলক্ষে শোক দিবস পালন করতে। ঐ শোক দিবসটির পরিণতি হয়েছে টোটাল ফ্লপ। ৩২ নম্বরের বাড়িতে ৪/৫ জন লোক গিয়েছিলো। আর বাংলাদেশের মফস্বলের কোনো জায়গায় এ দিবস পালিত হয়নি। আসলে বিদেশের মাটিতে অত্যন্ত আরাম-আয়েশের মধ্যে থেকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে শেখ হাসিনার পক্ষে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি জানা সম্ভব নয়।
আসলে জনসমর্থন না থাকলে এসব কর্মসূচি দিয়ে কোনো লাভ নেই। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি গুপ্ত সংগঠনের নেতাকর্মীরা জনসমর্থন ছাড়া কোনো কাজ করতে পারে না। বার বার তারা ধরা পড়ে যায়। বাংলাদেশে এ মুহুর্তে ভিন্ন নামে আওয়ামী লীগের এজেণ্ডা পরোক্ষভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম খান পান্না (জেড আই খান পান্না)। বর্তমানে এদের কৌশল হলো, আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি কোনো কিছু করা বা বলা সম্ভব নয়। তাই তারা এ মুহুর্তের কৌশল হিসাবে বর্তমান সরকার, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এটি হবে তাদের প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় পর্যায়ে তারা জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে। এটি হবে তাদের দ্বিতীয় পদক্ষেপ। এরপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। অর্থাৎ যদি পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে আসতে শুরু করে তাহলে উপযুক্ত সময়ে তারা তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মেচন করবে।
১৫ অগাস্টের শোক দিবস মাঠে মারা যাওয়ার পর তারা গত ২৮ অগাস্ট বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। এবারও তারা ‘মঞ্চ-৭১’ এর ব্যানারে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে একটি গোল টেবিল বৈঠক করার চেষ্টা করে। প্রচার করা হয় যে, এ গোলটেবিল বৈঠকে আসবেন ড. কামাল হোসেন এবং জেড আই খান পান্না। সম্ভবত এরা বিপদ আগেই টের পেয়েছিলেন। তাই তারা আসেননি। এসেছিলেন কাদের সিদ্দিকির ভাই সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকি এবং গণফোরামের অস্থায়ী সভাপতি মফিজুল ইসলাম খান কামাল। এর মধ্যে জনগণ টের পেয়ে যায় যে, এ গোলটেবিল বৈঠকে জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করে বক্তব্য দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে আত্মগোপনকারী আওয়ামী লীগাররা এখনো বাস্তব সত্য অনুধাবন করতে পারেননি যে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী শক্তি সমূহের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে যতোই মতদ্বৈধতা থাকুক না কেনো, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চেষ্টা বাংলাদেশের মানুষ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেবে। হয়েছেও তাই। গোলটেবিল বৈঠকের খবর পেয়ে একদল মানুষ রিপোটার্স ইউনিটিতে যান এবং উপস্থিত আওয়ামী নেতাকর্মীদেরকে ঘেরাও করে রাখেন। তারা ঘেরাও থাকা অবস্থার মধ্যেই পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ডিআরইউতে আসে এবং লতিফ সিদ্দিকি, গণফোরামের অস্থায়ী সভাপতি মফিজুল ইসলাম খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জন সহ ১০/১২ জনকে গ্রেফতার করে।
এ সম্পর্কে দৈনিক ‘আজকের পত্রিকায়’ বৃহস্পতিবার সংখ্যায় যে রিপোর্ট ছাপা হয় তার অংশ বিশেষ নিম্নরূপঃ সকালে ডিআরইউর শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ‘মঞ্চ-৭১’। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষায় ‘মঞ্চ ৭১’-এর আত্মপ্রকাশ ও লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রথম কর্মসূচি হিসেবে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। আলোচনাসভায় প্রথমে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন)। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।’ এ পর্যায়ে জনতা বৈঠকটি ঘিরে ফেলে এবং অতঃপর পুলিশ এসে তাদেরকে আটক করে।
ইতোমধ্যেই এসব আওয়ামী এজেন্ট শিল্পী, সাহিত্যিক সহ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ করেছে। ৭১ বছর বয়সী প্রবীন সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের অকাল মৃত্যুতে সকলেই ব্যথিত। তার এ অকাল মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে মোটামুটি সংশ্লিষ্ট সকলেই একমত। মৃত্যুর আগে বিডিনিউজ২৪ ডট কমে তিনি যেসব কথা লিখে গেছেন সেগুলিকে অনেকে সুইসাইডাল নোট বলে গন্য করেন। ঢাকা থেকে বেরিয়ে প্রমত্তা মেঘনা নদী বক্ষে ঝাঁপ দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে তার ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। ময়না তদন্তের রিপোর্ট মোতাবেক পরলোকগত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের শরীরে ভেতরে ও বাইরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ, বিভুরঞ্জন সরকারের এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পানি ঘোলা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ‘দ্যা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশ অব জার্নালিস্ট (আইএফজে)’ বলেছে যে, তাকে মাঝে মাঝেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হুমকি দিতেন। আইএফজে অভিযোগ করেছেন যে, বিভুরঞ্জন সরকার যে পত্রিকায় কাজ করতেন সে আজকের পত্রিকাকে হুমকি দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। বিভিন্ন পত্রিকার তরফ থেকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, তিনি নিজে বা তার সচিবালয়ের তরফ থেকে কোনো ব্যক্তি সাম্প্রতিককালে বিভুরঞ্জনের সাথে যোগাযোগ করেনি। এছাড়া যে ‘আজকের পত্রিকার’ কথা বলা হচ্ছে তাদেরকেও সরকারের তরফ থেকে কোনো ব্যক্তি বা মহল কোনো রকম যোগাযোগ করেননি।
১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য যে নাটকের অবতারণা করা হয়েছিলো সেসম্পর্কে আল জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আওয়ামী পন্থী শিল্পীরা একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়েছে। সেটি ছিলো আইসোলেটেডভাবে শেখ মুজিবকে গ্লোরিফাই করা। তার মানে হলো- গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলে শেখ মুজিবের নাম নিয়ে যে অত্যাচার চালানো হয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ তাদের সব অপকর্ম শেখ মুজিবের ছবি ও নামের বর্মে ঢেকে রেখেছিলো সেখানে জুলাই বিপ্লবের কোনো উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের হত্যাযজ্ঞ সমর্থন করি না। যদিও শিল্পীদের ঐ পোস্টে শেখ মুজিবের একাত্তরের অবদানকে গ্লোরিফাই করা হয়েছে, কিন্তু সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে মুজিবের ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ভয়ানক দুঃশাসন।
জুলকারনাইন সায়ের লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাসিনার ঘনিষ্ঠ, সাংবাদিক মহলে এক পরিচিত মুখ পুরো প্রচারণার নকশা তৈরি ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন। তার আবার বিনোদন জগতে ব্যাপক প্রভাব। এদের মূল কৌশল ছিলো- যাদের প্রকাশ্যে আওয়ামীলীগপন্থী ভাবা যায় না, এমন সেলিব্রেটিদের দিয়ে পোস্ট করানো, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং অন্য শিল্পী-সেলিব্রেটিরাও একই ধারায় পোস্ট দিতে রাজি করানো যায়। ১৫ অগাস্টের প্রথম প্রহরেই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ তারিন, তমালিকা, সাজু খাদেম, অরুনা বিশ্বাস ও শামিমা তুষ্টির মতো শিল্পীরা পোস্ট দিয়ে প্রাথমিক তরঙ্গ তৈরি করেন।
ঐ বিশাল পোস্ট আল জাজিরার সাংবাদিক শেষ করেছেন এই বলে,“ আওয়ামী লীগ এখন মাঠে নেই। হয়তো ফিরতেও অনেক সময় লাগবে। কিন্তু ক্ষমা চাওয়া এবং তাদের বিচারের আগে যদি আওয়ামী লীগ কোনোভাবে ফিরে আসে তাহলে বাংলাদেশ নামক দেশটি সার্বভৌমত্ব হারাবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী কোনো দিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না। সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করে দেশে নতুন রক্ষীবাহিনী আবার হত্যাযজ্ঞ চালাবে। তাই দেশপ্রেমিক জনতাকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকার শাণিত শপথ নিতে হবে। রুখে দিতে হবে জুলাই ম্যাসাকার চালানো কসাইদের।”
Email:[email protected]