ইকবাল হোসেন
দেশ যখন উন্নয়নের গল্প শোনে, তখন সেই গল্পের পেছনে একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করে-জ্বালানি। এই জ্বালানিই আমাদের শহরকে সচল রাখে, গ্রামকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে, শ্রমিককে কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়, আর অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে রাখে নিরবচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু আজ সেই জ্বালানিকেই ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তার ছায়া। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে-সারাদেশের পেট্রোল পাম্প যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কা নিছক আতঙ্ক নয়; বরং এটি এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার প্রতিধ্বনি।
দেশের কোনো একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়ালে আজকের পরিস্থিতি খুব সহজেই বোঝা যায়। লম্বা লাইন, ক্লান্ত মুখ, বিরক্ত মানুষের ভিড়-এ যেন এক নিঃশব্দ হতাশার প্রতিচ্ছবি। একজন মোটরসাইকেল চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, তবুও নিশ্চিত নন তিনি তেল পাবেন কি না। এই অপেক্ষা শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি তার জীবিকার অনিশ্চয়তা, তার পরিবারের উদ্বেগ, তার প্রতিদিনের সংগ্রামের আরেকটি অধ্যায়।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে-পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, তারা অয়েল কোম্পানিগুলো থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে-কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? একটি দেশ যেখানে জ্বালানি প্রতিদিনের প্রয়োজনীয়তার অন্যতম ভিত্তি, সেখানে সরবরাহের এই ভঙ্গুরতা কীভাবে তৈরি হলো?
এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ, এবং সেগুলো শুধুমাত্র সাময়িক নয়-বরং কাঠামোগত। প্রথমত, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য। দেশে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এটি উন্নয়নের একটি চিত্র, কিন্তু সেই উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ সেই গতিতে এগোয়নি।
দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করবে-এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত সেই অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত থাকা। কৌশলগত মজুদ, বিকল্প উৎস এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা-এসবই একটি স্থিতিশীল জ্বালানি খাতের ভিত্তি। যদি সেই ভিত্তি দুর্বল থাকে, তাহলে সংকট অবশ্যম্ভাবী। তৃতীয়ত, ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। কোথাও সরবরাহে ঘাটতি, কোথাও বণ্টনে অসামঞ্জস্য-এসব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটিই চাপের মুখে পড়েছে। এর ফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। একজন ডেলিভারি রাইডারের কথা ভাবুন। তার প্রতিদিনের আয় নির্ভর করে কতগুলো ডেলিভারি তিনি করতে পারছেন তার ওপর। কিন্তু যদি তিনি দিনের অর্ধেক সময় পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে কাটান, তাহলে তার আয় অর্ধেকে নেমে আসে। এই ক্ষতি শুধু তার ব্যক্তিগত নয়; এটি তার পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ওপরও প্রভাব ফেলে।
একইভাবে, একজন পেট্রোল পাম্প কর্মীর কথাও ভাবা দরকার। সীমিত জ্বালানি নিয়ে শত শত মানুষের চাপ সামলানো কতটা কঠিন-তা সহজেই অনুমেয়। ক্লান্তি, মানসিক চাপ, আর প্রতিনিয়ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি-এসব মিলিয়ে তাদের কাজের পরিবেশ আজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক জায়গায় গ্রাহক ও কর্মীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতারও ইঙ্গিত।
এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হবে, পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে, বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়বে। একটি দেশের অর্থনীতি তখন ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়বে। উন্নয়নের যে গতি আমরা এতদিন ধরে দেখেছি, তা হঠাৎ করেই থেমে যেতে পারে।
তাহলে করণীয় কী?
স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে জরুরি হলো জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে জরুরি ভিত্তিতে আমদানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত সংকট তৈরি না হয়।
মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। কোথায় কত তেল যাচ্ছে, কীভাবে বণ্টন হচ্ছে-এসব তথ্য জনসম্মুখে আনতে হবে। এতে করে অনিয়ম কমবে এবং মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ভাবতে হবে ভিন্নভাবে। শুধুমাত্র জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশ দীর্ঘদিন টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখতে পারে না। বিদ্যুৎচালিত যানবাহন, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো, সচেতনভাবে চলাচল করা এবং ধৈর্য ধারণ করা-এসব ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সবশেষে, এই সংকটকে আমাদের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-আমাদের উন্নয়নের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ না করলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।
আজ পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ক্লান্ত চোখে যে হতাশা, সেটি কেবল তার ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি দেশের নীতিনির্ধারণের প্রতিচ্ছবি। সেই চোখের ভাষা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে স্বস্তি আনে-অস্থিরতা নয়।
এখনই সময়-বাস্তবতা স্বীকার করে দ্রুত, কার্যকর এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়ার। অন্যথায়, জ্বালানি সংকটের এই ছায়া একসময় পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করতে পারে।
লেখক : সংবাদকর্মী