শায়লা নাজনীন
বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প গত দুই দশকে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। যা স্থানীয় বাজারের প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির পরিধি আরও প্রসারিত করতে আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে যা শিল্পটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে দেবে।
এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিগত সহায়তা। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং বাজার সম্প্রসারণের স্বার্থে আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে যা দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে আরও বহুমাত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো API (Active Pharmaceutical Ingredients) বা কাঁচামালে নির্ভরতা। স্থানীয় উৎপাদন এখনো সীমিত, ফলে দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি অচও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক-কর কমানো, দ্রুত কাস্টমস ছাড়, প্রযুক্তি আমদানিতে ভ্যাট সুবিধা এসব নীতিগত পরিবর্তন সম্প্রতি আমদানিকে আরও সহজ করেছে। এর ফলে ঔষধ কোম্পানিগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারছে, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ কম খরচে উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়ছে। বিশেষ করে ক্যানসার, হরমোন, বায়োলজিক্স ও ভ্যাকসিন-জাত উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর উপাদানের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। নতুন নীতিমালা এসব উপাদান আমদানির পথ আরও প্রশস্ত করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাজার সম্প্রসারণের জন্য আমদানির সুযোগ বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী ওষুধ উৎপাদনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যেমন দ্রুত হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশও এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাইছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, বায়ো-টেকনোলজি ডিভাইস, সেফটি চেম্বার, ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট এসব উচ্চমানের প্রযুক্তি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। নীতিগত সুবিধা থাকলে এসব যন্ত্রপাতি সহজে আমদানি করা যায়, ফলে স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদন আরও মানসম্মত হয়। দ্রুত যন্ত্রপাতি আমদানি মানে দ্রুত উৎপাদন যা শেষ পর্যন্ত দেশীয় বাজারে দাম কমাতে সহায়তা করে এবং রপ্তানির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
তবে সুযোগের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি হলে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বাড়ে, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যেহেতু API নির্ভর, তাই ডলারের অস্থিরতা এই শিল্পকে সরাসরি চাপের মুখে ফেলে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে লজিস্টিক সমস্যা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সীমান্তে জটিলতা এসব কারণে সময়মতো কাঁচামাল না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো মানহীন কাঁচামাল বা প্রযুক্তি আমদানির সম্ভাবনা। আমদানির দরজা যত খোলা হবে, মাননিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তত কঠিন হবে। এজন্য দেশে কাস্টমস, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।
API শিল্পকে নিজস্বভাবে গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় API উৎপাদন যদি বাড়ানো যায়, তাহলে আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আরও স্থিতিশীল হবে। ইতিমধ্যে সরকারের API পার্ক প্রকল্প এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
তবে দ্রুত অবকাঠামো সম্পন্ন করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং গবেষণায় প্রণোদনা দেয়াও জরুরি। এ ছাড়া বৈশ্বিক ফার্মা বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। ভারত, চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশই নিজেদের আমদানি নীতিমালা শিথিল করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমদানি সুবিধা, গবেষণা বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঔষধ শিল্পে আমদানির নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে মাননিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার সমন্বয় প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ফার্মাসিউটিক্যালস বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।