আসিফ আরসালান

দেশে মাঠের রাজনীতি সরব না হলেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে। কোনটাকে প্রায়োরিটি দেবো সেটিই হয়েছে একটি সমস্যা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যখন এ লেখাটি শুরু করেছি তখন একটি সুখবর পাওয়া গেলো। সারাদেশ যখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন তখন খবর প্রচারিত হলো যে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অথবা শেষরাতে অর্থাৎ শুক্রবার প্রথম প্রহরে বেগম জিয়াকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সরাসরি লন্ডন নেওয়া হবে। তার সঙ্গে থাকবেন ১৪ ব্যক্তি। এদের মধ্যে চিকিৎসক থেকে শুরু করে তাঁর ব্যক্তিগত সাহায্যকারীরাও রয়েছেন।

একটি কথা স্বীকার করতেই হবে যে, গত ২৭ নভেম্বর তাকে অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পর থেকে তাকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই। শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার ব্যাপারেও সরকারের পদক্ষেপ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। সরকারের সাথে সাথে দেশের সবগুলি রাজনৈতিক দল (আওয়ামী ঘরানা বাদে), রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন শ্রেণীর সামাজিক নেতারাও বেগম জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হননি। জামায়াতে ইসলামী থেকে শুরু করে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সমস্ত রাজনৈতিক দল ও নেতা তার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও মসজিদে মসজিদে বেগম জিয়ার নেক হায়াতের জন্য রাব্বুল আলামীনের দরবারে মানুষ দুই হাত তুলে মুনাজাত করেছেন। জামায়াতের নেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, বিএনপির সাথে আমাদের রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু বেগম জিয়া যে সারাদেশের শ্রদ্ধেয়া এবং অবিসংবাদিত নেত্রী এব্যাপারে কারো মনে কোনো কুন্ঠা নেই।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বেগম জিয়ার জন্য দোয়া করেছেন। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ৩ প্রধান প্রটোকলের বাইরে গিয়ে এভারকেয়ার হাসাপাতালে যেয়ে দেশনেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাকে দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, অর্থাৎ ভেরী ভেরী ইম্পর্ট্যান্ট পারসন বা ভিভিআইপি ঘোষণা করেছেন। ভিভিআইপি হিসাবে তার নিরাপত্তার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩ স্তরের নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছিলো। এ নিরাপত্তার মধ্যে ছিলো এসএসএফ বা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এ বাহিনী প্রধানত প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিধান করে থাকে), প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট বা পিজিআর এবং বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বা বিজিবি ছিলো।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাকে যদি দেশের অভ্যন্তরে কোথাও স্থানান্তর করতে হয় অথবা দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হয় সেখানে যেনো কোনো মেডিকেল বা টেকনিক্যাল সমস্যা না হয় তার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অবস্থিত ২টি ফাঁকা মাঠকে সাময়িকভাবে হেলিকপ্টার ওঠা নামার বেজ বা ঘাটি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে অপরাহ্ন এ সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার অবতরণ ও উড্ডয়নের ট্রায়াল রান করা হয়েছিলো এ অস্থায়ী হেলিপ্যাডে। সরকার প্রেস নোটের মাধ্যমে আগেই জনগণকে অনুরোধ করেছিলেন যে, এ হেলিপ্যাডে সামরিক হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা ও টেক অফের ব্যাপারে অযথা যেনো কোনো গুজব ছড়ানো না হয় অথবা কোনো জ¦ল্পনা কল্পনার আশ্রয় নেওয়া না হয়।

সরকার প্রতিশ্রুতি মতো কাজ করেছেন। কাতারের সম্মানিত আমীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে সর্বাধুনিক এয়ার এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছিলেন। শুধু চিকিৎসা সামগ্রী নয়, এ এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে প্রয়োজন হলে উড্ডয়নরত অবস্থায় রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলে তাকে মাঝ আকাশেই অপারেশন করার ব্যবস্থাও ছিলো। মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করেন যে, হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত সব আল্লাহর হাতে। আমরা তথা ১৮ কোটি মানুষ বেগম জিয়ার নেক হায়াতের জন্য আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতে পারি। তবে সে মুনাজাত কবুল করা না করা সর্বশক্তিমানের কৃপার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের সরকার থেকে শুরু করে সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং আপামর জনগণকে এজন্যই অন্তরের অন্তস্থল থেকে প্রাণঢালা ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে, একারণে যে, বেগম জিয়ার রোগমুক্তির প্রার্থনায় সারা দেশে অভূতপূর্ব গণঐক্য সৃষ্টি হয়েছিলো।

আজকের এ লেখায় আমি কোনো নেতিবাচক কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু যারা মজ্জাগতভাবে নিন্দুক তাদের ওপর গুড সেন্স কোনো দিন প্রিভেইল করবে না। অর্থাৎ তাদের কোনো দিন সুমতি হবে না। আমার ভাবতে অবাক লাগে যে, সারাদেশ যখন দেশনেত্রীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন তখন চিহ্নিত কয়েকটি ইউটিউবার অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচয় দিয়েছে। ৩ জন মহিলা এবং ২ জন পুরুষ ইউটিউবার বেগম জিয়ার অবস্থা নিয়ে এমন চরম নেতিবাচক মন্তব্য করেছে যে, শুনলে তাদেরকে মানব প্রজাতির অংশ বলে মনে হয় না। আরো অবাক হই তখন, যখন দেখি একজন সাবেক বিএনপি এমপিও (বর্তমানে তিনি দল থেকে সম্ভবত বহিষ্কৃত) এ কুৎসিত এবং নোংরা সাংবাদিকতায় লিপ্ত হয়েছেন। নাম ধাম উল্লেখ করে এদেরকে আর জনগণের কাছে পরিচিত করতে চাই না।

অশালীন অমার্জিত এবং অভব্য ভাষায় কথা বলা শেখ হাসিনার মজ্জাগত স্বভাব। একবার তিনি বলেছিলেন, “সব সময় শুনি খালেদা জিয়ার মরো মরো অবস্থা। কই , তিনি তো মরেন না।” এমন কুৎসিত ও বিকৃত যার মানসিকতা তার চেলা চামুণ্ডারাতো তার মতোই কুৎসিত ও বিকৃত মস্তিষ্ক হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে জামায়াতে ইসলামী সহ অনেক ইসলামী দলের রাজনৈতিক মতাদর্শগত মতভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এমন দুঃসময়ে কেনো তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না, তা নিয়ে একের পর এক আষাড়ে গল্প ফাঁদা আর যাহোক সভ্যতা ও ভব্যতার মধ্যে পড়ে না। আমার মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, আওয়ামী লীগ কি মনুষ্য প্রজাতির কেউ?

এবার নির্বাচনে প্রধান ২ রাজনৈতিক দল বলি বা জোট বলি, সে দুটি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোট। জামায়াত জোটের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যেই মাঠে ঘাটে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিয়ছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি সভা বা সমাবেশেও তারা তারেক রহমান সম্পর্কে নীতিগত ভাবে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি। জামায়াতে ইসলামী বলছে এবং কাজ করে দেখাচ্ছে যে তারা রাজীনিতিতে কুৎসিত, হিংসাত্মক এবং নেতিবাচক কালচারের অবসান চায়। বেগম জিয়ার এবং তারেক রহমানের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক দুর্যোগের সময় আরেকবার প্রমাণিত হলো যে, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী ঘরানা কোনো দিন শোধরানোর পদার্থ নয়।

প্রথমেই বলেছি যে, আজ গুরুত্বপূর্ণ খবরের ভিড়। তেমনি একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ খবর হলো, বিডিআর ম্যাসাকার সম্পর্কে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট দাখিল। গত ৩০ নভেম্বর কমিশন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম ফজলুর রহমান তার কমিশন সদস্যদেরকে নিয়ে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের ৩৬০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট দাখিল করেছেন। এ রিপোর্ট নিয়ে দেশে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এক দিকে নির্বাচনী ডামাডোল, অন্য দিকে বেগম জিয়ার জীবন মরণ অবস্থা এ আলোড়নকে আপাতত স্তিমিত রেখেছে।

এটি একটি দুঃসাহসী রিপোর্ট। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে এ রিপোর্টটি হয়তো দিনের আলোর মুখ দেখবে না। আর যদি মুখ দেখেও তাহলে অনেক কঠোর কিন্তু অপ্রিয় সত্য রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হবে না। কিন্তু জেনারেল ফজলুর রহমান বলে কথা। তিনিই সে জাতীয় বীর যিনি রৌমারি এবং পদুয়ায় ভারতীয় বাহিনীকে তাড়া করে ভারতের অনেক ভেতরে ঠেলে দিয়েছিলেন এবং যার নেতৃত্বে বিডিআর বিএসএফের অনেক হানাদারকে হত্যা করেছিলো। এমন জ¦লন্ত দেশপ্রেমের জন্য যেখানে জেনারেল ফজলুর রহমানের পুরস্কার পাওয়ার কথা সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জরুরি এত্তেলা দিয়ে ঢাকায় ডেকে পাঠান এবং তাকে কমাণ থেকে সরিয়ে দেন।

এ সীমান্ত সংঘর্ষের কয়েক মাস পরেই তাকে তার চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়। এ অবসর সম্পর্কে উইকিপিডিয়ার মন্তব্য, “Renowned unforeseeable nature led him to a truncated retirement in September 2001 as ambassador .” অর্থাৎ তাঁর বিখ্যাত এবং দৃশ্যমান নয় এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকে অকালে অবসর দেওয়া হয়। স্পষ্ট করে বলতে গেলে ভারতীয় বাহিনীকে তিনি বিতাড়িত করেছিলেন, এটিই ছিলো তার অকাল অবসরের প্রধান কারণ।

সে দুঃসাহসী ফজলুর রহমান তার রিপোর্টে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ছিলো ভারত, আওয়ামী লীগ এবং জেনারেল মঈনের চক্রান্তের ফসল। দেশের একাধিক দৈনিক পত্রিকার হাতে এ ৩৬০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট এসেছে। একাধিক পত্রিকা রিপোর্টের অংশ বিশেষ ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরছে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ৫৭ জন চৌকষ সেনা অফিসার সহ ৭৪ ব্যক্তিকে হত্যার নেপথ্য চক্রান্তকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার পর দেখা যায়, পরিকল্পনাকারী এবং ঘাতকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ, হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিকী, আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম প্রমুখ। আরো ছিলেন ৯২৭ জন ভারতীয় নাগরিক। আর সরকার ছাড়াও দলগতভাবে জড়িত ছিলো আওয়ামী লীগ।

কয়েকদিন আগে রাওয়া ক্লাবে প্রাক্তন সেনা সদস্যদের এক সভায় অবিলম্বে ফজলুর রহমান কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ এবং রিপোর্টের সুপারিশ মোতাবেক চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করা হয়েছে। যেহেতু দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়েছে তাই অবিলম্বে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার এবং দোষী সাব্যস্ত হলে চিরদিনের জন্য আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি করা হয়েছে।

Email:[email protected]