গ্লোবাল ডেটাবেইস সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত, যেখানে নুম্বিও ট্র্যাফিক ইনডেক্স (২০২৪) অনুযায়ী এটি পঞ্চম স্থানে ছিল এবং যানবাহনের গড় গতি অত্যন্ত কম (প্রায় ৬.৪ কিমি/ঘণ্টা)। অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ গণপরিবহন এবং ট্র্যাফিক আইন অমান্য করার কারণে এ যানজট সৃষ্টি হয়, যা প্রতিদিন কোটি কোটি কর্মঘণ্টা এবং দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ নষ্ট করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাইভেট গাড়ির কারণে প্রায় ৭৬% রাস্তা দখল হয়ে যায়, অথচ গণপরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফলে মানুষের গড় গতি কমেছে এবং বায়ু দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৪২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা মোট জিডিপির ৭ শতাংশের সমান। এমনকি আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সমাজ ও পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে ঢাকার যানজট।

ঢাকা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল নগরীর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকা দেশের প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র। এছাড়াও দেশের সকল প্রান্ত থেকে মানুষ নানাবিধ প্রয়োজনে ছুটে আসছে ঢাকার দিকে। যা তিলোত্তমা নগরীকে জনবিষ্ফোরণের নগরীতে পরিণত করছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও স্থানাভাবেই ঢাকা নগরী ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে তা এক সময় আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকার জনসংখ্যা গত ৩ যুগে বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ। আমাদের দেশে শহরে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ বাস করেন এ মেগাসিটিতে। প্রতিদিন নতুন করে গড়ে প্রায় ২ হাজার মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসছেন। যার বার্ষিক পরিসংখ্যান ৭ লাখ লাখের ওপরে। একটি শহরে সুষ্ঠুভাবে জনগণের চলাচলের জন্য নগরীর আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তঘাট থাকা আবশ্যক হলেও ঢাকায় তা মাত্র ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর রাস্তায় প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫শ নতুন গাড়ি নামছে। বর্তমানে নগরীর ১৬৮টি রুটে ১৫৭টি কোম্পানির ৭ হাজারের অধিক বাস এবং মিনিবাসের চলাচলের অনুমতি রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় চার হাজার বাস ২০ লাখ মানুষ বহন করে। এ সংখ্যা চাহিদার তুলনায় মোটেই যথেষ্ট নয়। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাহিদা পূরণের জন্য যাত্রীরা বাসের পাশাপাশি লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, রিক্সার ব্যবহার করেন। বর্তমানে ঢাকা শহরে ১০ থেকে ১২ লাখ রিক্সা আছে এবং রিক্সা চালনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ জড়িত।

ঢাকার যানজট শুধু সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার ফল নয় বরং এক্ষেত্রে নানাবিধ কারণই বিদ্যমান। প্রথমত, প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার এ নগরীতে সড়কের তুলনায় যানবাহনের যে প্রাচুর্য সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিক নয়। বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কতসংখ্যক যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারে, তা বিবেচনায় না নিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যানবাহন নিবন্ধন করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যা গণপরিবহনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। আর এটিই হচ্ছে ঢাকা নগরীতে যানজটের অন্যতম কারণ।

ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সঠিক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (BRTA) তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে ঢাকায় মোট নিবন্ধিত মোটরযান ছিল ১২ লাখের বেশি, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারের সংখ্যাও ৩ লাখের বেশি ছিল। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে নতুন নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা কমেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সংখ্যা বাড়ছে। অনিবন্ধিত ও ভূয়া নিবন্ধনের যানবাহনের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরের মোট সড়কের প্রায় ৫০ শতাংশ জুড়েই চলাচল করে ব্যক্তিগত গাড়ি। কিন্তু এসব বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। কিন্তু ৫০ শতাংশ বড় বাসে প্রায় ৮৮ শতাংশ যাত্রী পরিবহন সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নতমানের বাসসেবা চালু করাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের গ্রহণযোগ্য বিকল্প। এ ছাড়া আর যা করা দরকার, তা হলো ফুটপাতগুলোকে হাঁটাচলার উপযোগী করা। এখন রাজধানীতে একটি যানবাহন ঘণ্টায় যেতে পারে গড়ে মাত্র ৫ কিলোমিটার। ১২ বছর আগেও এ গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের মানসিক চাপ তৈরি হয়। এ চাপ আবার কাজ করছে অন্যান্য রোগের উৎস হিসেবে। যা এখন নগর স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের: ঢাকা মহানগরে যানজট, শাসন ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়, ২০০৪ সালে ঢাকার রাস্তায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতিসীমা ছিল গড়ে ২১ দশমিক ২ কিলোমিটার। যানবাহনের সংখ্যা যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০২৬ সালে এ শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম।

ঢাকায় বড় সড়কের সংখ্যা হাতে গোনা। ট্রাফিক মোড়গুলোও বেশ বিপজ্জনক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কে অবৈধ পার্কিং, ফুটপাতের অবৈধ দখল, ভাসমান বিক্রেতাদের সড়ক দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সড়কের প্রশস্ত তা কমে যাওয়া অন্যতম। তা ছাড়া দু’শতাধিক কোম্পানির অধীনে শহরের বাস সেবা পরিচালিত হওয়ার ফলে যাত্রী ওঠানো নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দায়িত্বহীনতাও যানজটের অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক না হলে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ অবস্থা অপেক্ষা করছে।

মূলত, ঢাকা এখন নাগরিকদের শহর নয়, বরং ‘গডফাদারদের’ শহর। ঢাকার কয়েক লাখ অনিবন্ধিত রিক্সা এবং ফুটপাতের কয়েক হাজার অবৈধ হকারের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন গডফাদাররা। বাস,লঞ্চ টার্মিনালগুলো গডফাদারদের দখলে থাকায় যাত্রীসেবার বদলে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পরও চাঁদা পরিস্থিতির আহামরি কোন উন্নতি হয়নি বরং হাত বদল হয়ে অন্যরা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোও শহরকে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিবর্তে শহরকে ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, সরকারি এক সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার কাজে সমন্বয় নেই। ফলে ঢাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার চেয়ে ক্রমেই অবনতিই হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব পেশার, সব বয়সী মানুষই যানজটের ভিক্টিম। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যানজট নিরসনে কাজ করছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে সমন্বয়ের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা সমন্বয়হীনভাবে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করায় যানজট বাড়ছে। মূলত, ঢাকার যানজট কমাতে বাস সেবা আরও বিস্তৃত ও উন্নত করা, রেলে যাত্রী পরিবহন বাড়ানো, ব্যক্তিগত গাড়ি কমানো, ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের তেমন কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না।

আসলে রাজধানীর যানজট সমস্যা বহুমাত্রিক। ঢাকায় যদি জনসংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে পরিকল্পনা করে সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন নগরবিদরা। তারা মনে করেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, পৃথক বাস লেন তৈরি, ট্রাফিক মোড়গুলোর বিষয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সবার আগে ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নেই। সবকিছুকেই ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার মধ্যে কোন কল্যাণ আছে বলে মনে হয় না। আর এই কাজটি করতে ব্যর্থ হলে সকল প্রচেষ্টাই হবে নিষ্ফলা।

বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা মাত্র কয়েক বছরেই ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকায় গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। আর হাঁটার গতি হচ্ছে প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। গাড়ির গতি প্রায় হাঁটার গতির সমান হয়ে পড়েছে। এছাড়া এ শহরে প্রতিদিন ৬ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হলেও সংগ্রহ করা হচ্ছে ৪ হাজার টন। এ রকম নানা কারণে অর্থনীতিতে ঢাকার যে অবদান রাখার কথা তা রাখতে পারছে না। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে যে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রাথমিক পরিকল্পনাতেই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করে উন্নয়ন সহযোগীরা। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক আয়োজিত ‘মেট্রো ঢাকা ট্রান্সফরমেশন প্লাটফর্ম : ট্রান্সফরমিং মেট্রো ঢাকা ইনটু এ লিভঅ্যাবল প্রসপারাস অ্যান্ড রিজিলিয়েন্ট মেগাসিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে ঢাকা শহরের পূর্বাংশের দিকে নজর দিতে হবে। এছাড়া ল্যান্ড জোনিং, সিটি গভর্নমেন্ট সিস্টেম চালুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় কোন পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

অনিয়ন্ত্রিত যানজট ছাড়াও ঢাকা মহানগরী নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকায় প্রতি বছর স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ৩৫৮ হেক্টর জলাভূমি। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা দাবি করছে, ঢাকা বিশ্বের চতুর্থ দূষিত শহর। অবশ্য সম্প্রতি বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ঢাকা একেবারে শীর্ষে ওঠে এসেছে। মূলত ঢাকা শহরে দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বাস করে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০ শতাংশ আসে ঢাকা থেকে। মোট জাতীয় আয়ের ৩৩ শতাংশ এ শহর থেকে আসছে। ৮০ শতাংশ রফতানিমুখী শিল্প রয়েছে ঢাকায়। তাই এ শহর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, ঢাকা শহরের অর্থনৈতিক ঘনত্ব বিশ্বের অনেক শহরের তুলনায় কম। যেমন ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে অর্থনৈতিক ঘনত্ব হচ্ছে সাড়ে ৫ কোটি ডলার। ব্যাংককে অর্থনৈতিক ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং সিঙ্গাপুরে ২৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ঢাকায় বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। বলা হয়েছে দেশের দারিদ্র্য নিরসনে দেশের শহরাঞ্চলগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে শহরে দারিদ্র্য নিরসনের গতি স্থবির। যেটুকু অগ্রগতি হচ্ছে এতে অবদান রাখছে গ্রামগুলো। অন্যদিকে শহরে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী পুরুষদের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত তরুণদের ২৫ শতাংশ বেকার। আর মাধ্যমিকের পরবর্তী বেকার ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে মাধ্যমিক ৩৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের পরর্বর্তী পর্যায়ে তরুণদের ৪১ শতাংশ বেকার। আর অনিয়ন্ত্রিত যানজট এসব সমস্যার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূলত, ঢাকা নগরীর যানজট সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারলেই সকল ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

সরকার সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, ঢাকা ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর যানজট ও পানিবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে। অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। মাস্টার প্লানের মাধ্যমে এ শহরকে সুন্দর করার কাজ চলছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, বিদ্যুৎ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পৌঁছানো হচ্ছে। গ্রামে যেসব সুবিধা নেই বলে মানুষ শহরে ছুটে আসে সেসব সুবিধাই গ্রামে দেয়ার কাজ চলছে। তারা আরও বলছেন, ঢাকা শহরে ৬৬ শতাংশ বাড়ি তৈরিতে অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি। অধিকাংশ বিল্ডিং করা হয়েছে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই।

ইতিমধ্যেই দু’সহস্রাধিক ইমারতের তালিকা করা হয়েছে। এগুলো কোনো না কোনো প্রভাব খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন যে, নাগরিকদের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে অনুযায়ী কাজ করতে হচ্ছে। যানজট ঢাকা শহরের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। কিন্তু ঢাকার এসব সমস্যার কথা সরকার সংশ্লিষ্টরা অবলীলায় স্বীকার করলেও সমাধানে কোন কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। শুধুমাত্র অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতির মধ্যেই রয়েছে সীমাবদ্ধ।

ঢাকা নগরীর অসহ্য বিড়ম্বনার নাম যানজট। একদিকে যেমন সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নানান স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছেন নগরবাসী। যানজটের অন্যতম ভুক্তভোগী কর্মজীবীরা। তাদের দিনের অধিকাংশ সময় যানজট আর অফিসে চলে যায়। ফলে পরিবারের সদস্যদের সময় দিতে পারছেন না। আর শিশুরা আনন্দময় শৈশব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ নগরীর যানজট এতোটাই ভয়াবহ যে, তা বিশ্বের অন্য কোন শহরের সঙ্গে তুলনাও করা যায় না। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর এখন ঢাকা। আর দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেখে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও হতাশ, ভোগান্তি নিয়ে তাদের অভিযোগও রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চে প্রকাশিত সবচেয়ে ধীরগতির শহরের তালিকায় ঢাকা ছাড়াও দেশের ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম রয়েছে। ২০২০ সালে পরিচালিত বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা যায়, সড়কে ব্যস্ত সময়ে চলাচল করা যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার। আর ২০২৩ সালে এ গতি নেমে এসেছে প্রায় ৪.৮ কিলোমিটারে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকাবাসীকে সড়কে প্রতি ২ ঘণ্টায় ৪৬ মিনিট যানজটে আটকে থাকতে হয়। আর বছরে জনপ্রতি গড়ে ২৭৬ ঘণ্টা যানজটে নষ্ট হচ্ছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এখানে অর্থনীতির বেশি ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, যানজটে দৈনিক প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার বেশি অপচয় হয়।’ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যানজটে মানুষের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হচ্ছে। অধিক সময় যানজটে আটকে থাকায় চালকের মধ্যে ক্রোধ ও অস্থিরতা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। শহরের সড়কের শতভাগ ব্যবহার, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে উন্নতমানের গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে যানজট কমে যাবে।

মূলত, রাজধানী ঢাকা আমাদের প্রশাসনিক ও জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। তাই এ মেগাসিটিকে সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নগরীতে পরিণত করতে হলে উন্নত বিশ্বের নগর ব্যবস্থাপনার সাথে সঙ্গতি রেখে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু যানজট নিরসন নয়, মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে সাফল্য পেতে ঢাকাকে নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যানজটমুক্ত নগর ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় আমাদের সকল পরিকল্পনায় ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং আমাদের সকল স্বপ্নই অধরাই থেকে যাবে।

www.syedmasud.com