সুমাইয়া ঘানুশি

ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিতে, যুদ্ধকে পবিত্রতার মোড়ক দেওয়া যায় এবং সহিংসতা নিয়তিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে চতুর্দশ পোপ লিও যুদ্ধকে পবিত্র মনে করেন না অথবা বিশ্বাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার পক্ষপাতি নন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবার সাথে লড়াই করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপের সাথেও লড়াই বাঁধিয়েছেন। রূপক অর্থে নয়, নীরবেও নয়, বরং প্রকাশ্যে, নির্লজ্জভাবে এবং প্রায় উল্লাসের সাথে। একজন ক্ষমতাসীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী ও মিত্রদের দিকেই নয়, বরং একশ’ কোটিরও বেশি ক্যাথলিক খ্রিস্টানের আধ্যাত্মিক নেতার দিকেও আক্রমণের তীর ছুঁড়েছেন।

চতুর্দশ পোপ লিও, যিনি নৈতিক কর্তৃত্ব, সংযম এবং ধারাবাহিকতার প্রতীক, ট্রাম্পের উপহাস, অবমাননা এবং আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ট্রাম্প তাকে “অপরাধ দমনে দুর্বল এবং পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভয়ঙ্কর” বলে খারিজ করে দেন। এভাবে তিনি নৈতিকতার এক উচ্চতর কর্তৃত্বকে নিছক রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের চরিত্রে পরিণত করার চেষ্টা করেন।

ট্রাম্পের আক্রমণ থেকে জাগতিক ক্ষমতা বা আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব, কোনোটাই রেহাই পায়নি। এটি অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এই প্রেসিডেন্টের আসল চেহারা আসলে কেমন সেটাই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ করে।

ট্রাম্প যেন এমন এক লোক যে তার হাতের অস্ত্র অবিরাম ঘুরাতে ঘুরাতে সবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, এলোমেলোভাবে গুলি চালাতে থাকে, যতক্ষণ না সংঘাতটাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। শত্রু, মিত্র, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সহযোগী- কোনো ভেদাভেদ নেই, কোনো সংযম নেই। পোপও এর বাইরে নন। তিনিও আর দশটা সাধারণ নিশানার মতোই।

শুরু থেকেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ছিল সংঘাত, হুমকি আর নাটকীয়তার এক অবিচ্ছিন্ন ধারা। পুরনো মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ, বন্ধুদের ওপর শুল্ক আরোপ, আর কূটনীতির ছলে অপমান করাই ছিল এই প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য। তিনি কানাডাকে অঙ্গরাজ্য করার হুমকি দেন, অবলীলায় পানামা খাল দখলের কথা বলেন, গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়া বা গায়ের জোরে দখলের কথা এমনভাবে তোলেন, যেন সার্বভৌমত্ব কোন হিসাব-নিকাশের সূচিমাত্র। তিনি প্রচলিত রীতিনীতিকে শুধু চ্যালেঞ্জই করেন না, সেগুলোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।

এমনকি বীভৎস ঘটনাও নাটকের রূপ নেয়। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে তার বিছানা থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা গোপন না করে, টেলিভিশনের রিয়ালিটি শো’র মতো মঞ্চায়ন করা হয়। যেন এটি ছিল কূশলী অভিনয়, কোন কেলেঙ্কারি নয়।

কিউবার গলা টিপে ধরা হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “আমি এটা দখল করে নেব।” তাঁর জগতে রাষ্ট্র মানেই হলো সম্পদ অর্জন।

একই ধারা : এরপর ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলা শুরু করা হয় আলোচনার আড়ালে। মাস্কাটের আলোচনায় যখন অগ্রগতির আভাস মিলছে তখনই ছোঁড়া হল বোমা।

পরেও, একই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটে : সংলাপকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং কূটনীতিকে ছদ্মবেশে পরিণত করা হয়। যুদ্ধ ছিল যতিচিহ্ন। এই সবকিছুর মাধ্যমে একটিই প্রত্যয়ের পোষকতা চলে, সেটি হলো, ক্ষমতা একবার বেদখল হয়ে গেলে তা আর আইন, নৈতিকতা বা এমনকি সামঞ্জস্যেরও তোয়াক্কা করে না।

ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা আবার শুরু করান, ধ্বংসযজ্ঞে অর্থায়ন করেন এবং গাজাকে একটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করার ঘোষণা দেন। কথাটা এতই বাস্তবতাবিবর্জিত যে তা কদর্যতার সীমাও ছাড়িয়ে যায়। তিনি ধ্বংসস্তূপকে সৈকতের সম্পত্তি এবং ধ্বংসকে উন্নয়ন হিসেবে গণ্য করেন। এটাই হলো ট্রাম্পবাদ, রিয়েল এস্টেটের বয়ানে প্রকাশ্য সহিংসতা।

পোপের সাথে তার সংঘাত আরও গভীর কিছু প্রকাশ করে। এটি রাজনীতি নয়, নৈতিক জগতের দ্বন্দ্ব। ট্রাম্প খ্রিস্টধর্ম রক্ষা করার, এর প্রতিমূর্তি হওয়ার এবং আমেরিকান পরিচয়ে এর স্থান সুরক্ষিত করার দাবি করেন। অথচ, হোয়াইট হাউস উপাসনালয় না হয়ে, ঈশ্বরের সেবকের পোশাকে ভণ্ডদের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে। তারা হাত বাড়িয়ে জড়ো হয়, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মাঝে ঈশ্বরকে ডাকে, তাঁর কাছে প্রার্থনা করে, তাঁর প্রশংসা করে এবং তাকে মহিমান্বিত করে। তারপর, অনিবার্যভাবে, তিনি, ট্রাম্প নিজেকেই মহিমান্বিত করলেন।

ট্রাম্প সাদা পোশাকে, এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হাত নিয়ে আবির্ভূত হলেন, আরোগ্যদাতা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে, যা বিপজ্জনকভাবে যিশুর প্রতিরূপ। এটা কোনো রূপক ছিল না, এটা ছিল আক্ষরিক এবং ইচ্ছাকৃত।

ক্ষমতাকে যখন বেলাগাম ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন তা শুধু বিস্তারের মধ্যেই থেমে থাকে না। এটি নিজেকেই পৌরাণিক রূপ দেয়। আর এখানেই পোপের সাথে এর সংঘর্ষ বাঁধে।

পোপের বার্তা : পোপের অবস্থান দ্ব্যর্থহীন। তিনি যুদ্ধকে পবিত্র বলে মানবেন না, ধ্বংসযজ্ঞকে আশীর্বাদ করবেন না অথবা বিশ্বাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করবেন না। বলেছেন, “আমি মনে করি না, সুসমাচারের অপব্যবহার করা উচিত, যেভাবে কিছু লোক করছে।”

আরও শান্তভাবে তিনি বললেন, “কাউকে দাঁড়িয়ে বলতে হবে যে, এর চেয়ে উত্তম পথ আছে।” তিনি কোনো প্রান্তিক ব্যক্তিকে আক্রমণ করেননি। পোপ লিও চতুর্দশ শুধু একজন নৈতিক কর্তৃপক্ষই নন, তিনি যথেষ্ট বিশ্বস্তও।

যে খ্রিস্টধর্ম ট্রাম্পকে টিকিয়ে রেখেছে, তা ইভানজেলিক্যাল ধারা এবং খ্রিস্টান-জায়নবাদ দ্বারা গঠিত। এটি কেবল বিশ্বাস নয়। এটি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব।

পোপের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের ৬৯ শতাংশের এবং ডেমোক্র্যাটদের ৭৫ শতাংশের সমর্থন আছে। রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিভেদ নির্বিশেষে সবাই তাঁর সমর্থক। বিশ্বের জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি কোন দুর্বল প্রতিপক্ষ নন।

তিনি প্রথম আমেরিকান যিনি পোপ হয়েছেন। নিজের দেশে তিনি ট্রাম্পের চেয়েও বেশি আস্থাভাজন। পোপের অবস্থান চার্চের কাঠামোর একটি স্বতন্ত্র ধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। লাতিন আমেরিকায় গড়ে ওঠা এক সুসমাচারের ওপর, যেটি মুক্তির বার্তা। এটি পোপ ফ্রান্সিস এবং লিবারেশন থিওলজির উত্তরাধিকার, যা চার্চকে দরিদ্র, নিপীড়িত এবং বঞ্চিতদের পাশে স্থাপন করে। এটি ট্রাম্পের সরাসরি বিরোধী।

বিপরীতে, ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টধর্ম খ্রিস্টান-জায়নবাদের মিশ্রণ। এটি ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে ভূ-রাজনীতির ব্যাখ্যা করে, সম্প্রসারণকে ঐশ্বরিক আদেশ হিসেবে গণ্য করে এবং ধর্মগ্রন্থকে ক্ষমতার সাথে একীভূত করে। এই বিশ্বদৃষ্টি যুদ্ধকে পবিত্র করে, সহিংসতাকে নিয়তিতে পরিণত করে এবং ক্ষমতাকে প্রমাণ হিসাবে হাজির করে। আর ঈশ্বরকে বানিয়ে ফেলা হয় এসবের অনুমোদনকারী। আর এদের বিবেচনায়, যে সত্য বলে, সে প্রকৃত বিশ্বাসী নয়, বরং সে-ই খাঁটি ঈমানদার যে জয়ী হয়।

আর তারপর আছেন জেডি ভ্যান্স, একজন ক্যাথলিক, যিনি চুপ করে আছেন যখন ট্রাম্প পোপকে অপমান করছেন। এটাই তার সাহসের বৃত্তান্ত। ভ্যান্স সিংহের মতো ভাবভঙ্গি করেন। বাস্তবে, তার আচরণ হাঁসের মতো। তিনি পোপকে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে বক্তৃতা দেন, অথচ হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে উদ্ধার করতে বুদাপেস্টে ছুটে যান। যদিও তাতে কিছুই বদলায়নি। ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর অরবান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন। তার দল মুখ থুবড়ে পড়ল। তার আসন সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেল। এ এক বিশাল পরাজয়।

নেতৃত্বের পরীক্ষা : এরপর এল ইসলামাবাদ। এ আলোচনা ছিল নেতৃত্বের পরীক্ষা।

ভ্যান্স ২১ ঘণ্টায় ট্রাম্পকে এক ডজন ফোন করেন এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে পরামর্শ করেন। নেতানিয়াহুকেও ফোন করার খবর পাওয়া গেছে। এটি ছিল এক শোচনীয় ব্যর্থতা। তিনি নেতার ভান করেন, কিন্তু আচরণ করেন একজন অধস্তনের মতো। জনগণ তা দেখতে পাচ্ছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভ্যান্সের জনপ্রিয়তা ২১ শতাংশ কমেছে। অন্য ভাইস প্রেসিডেন্টদের তুলনায় তার রেটিং সবচেয়ে খারাপ, মাইনাস ১৮।

তিনি বিশ্বাসের কথা বলেন এবং দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রদর্শনী করেন। এতে নেতৃত্ব নয়, বরং সুবিধাবাদই ফুটে ওঠে। এটি কোনো নৈতিক কণ্ঠস্বর নয়, বরং একটি প্রতিচ্ছবি। তিনি যে প্রশাসনের অধীনে কাজ করেন, তিনি তারই প্রতিচ্ছবি। এমন একটি প্রশাসন যা বিশ্বাসকে ব্যবহার করে, কিন্তু সে বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক নয়।

ট্রাম্প একজন মধ্যযুগীয় সম্রাটের মতো পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক হতে চান; পৃথিবীতে ঈশ্বরের এক ছায়া, যা সংযম ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। তাই প্রশ্ন ওঠে: তিনি কি খ্রিষ্ট, নাকি খ্রিষ্টবিরোধী? ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থে।

প্রতারণা, ক্ষোভ, জাঁকজমক এবং শক্তি দিয়ে গড়া এক ব্যক্তিত্ব, যেখানে সত্যের জায়গায় বিজয় এবং নৈতিকতার জায়গায় ক্ষমতা স্থান করে নেয়। নেতা বা রাষ্ট্রের সেবক নন, তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রেরই প্রতিমূর্তি। তিনি জবাবদিহি করেন না, তিনি অভিষিক্ত। তিনি সীমাবদ্ধ নন, তিনি পবিত্র।

নেতানিয়াহু : ব্যতিক্রম : সেই মুহূর্তে, ক্ষমতা আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে চেনে না। সে কেবল শত্রু এবং অপসারণযোগ্য বাধাই দেখতে পায়। ট্রাম্প সবার সাথে লড়াই করেছেন। কাউকেই ছাড়েননি। তারপরও এমন একজন মানুষ আছেন যার সাথে তিনি লড়াই করেন না, যাকে তিনি উপহাস করতে পারেন না। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প তার সাথে লড়াই করেন না। তিনি তার জন্য লড়েন।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি পদানত করা এবং বিজয়ের ধারণায় গঠিত, যেখানে নৈতিকতা সমস্যা হিসেবে গণ্য। নেতানিয়াহুর জন্যই গাজা থেকে মিনাব পর্যন্ত, শিশুদের হত্যা করা হয়। এখানেই ধরণটা পাল্টে যায়। কোনো উপহাস নেই, কোনো তামাশা নেই, কোনো হুমকি নেই, আছে শুধু জোটবদ্ধতা। কখনো, এমনকি বিনয়ও। আর আপনাকে প্রশ্ন করতেই হবে, কেন?

যে লোকটা সবাইকে ধমকায়, সে এখানে সংযম দেখাচ্ছে। যে লোকটা মিত্র ও প্রতিপক্ষ নির্বিশেষে সবাইকে অপমান করে, সে নেতানিয়াহুকে সমকক্ষ হিসেবে দেখছে এবং মাঝে মাঝে তার কাছে নতি স্বীকার করছে। ‘বিবি’ যখন বসে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকে। ভঙ্গি বদলে যায়। ক্ষমতার ক্রম উল্টে যায়। কেন?

এটা শুধু মতাদর্শগত মিল নয়। হ্যাঁ, তারা একটি অভিন্ন বিশ্বদৃষ্টি পোষণ করে। কিন্তু এটা আরও কিছু, লুকানো কিছু, আরও গাঢ় অন্ধকার কিছু বলে মনে হয়। একটি লাগাম। একটি অদৃশ্য রাশ অথবা ফাঁস।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এর উত্তর জেফরি এপস্টাইনের ফাইলে চাপা পড়ে আছে।

লেখক : ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ।

(মিডল ইস্ট আইতে ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ)

অনুবাদ : মুজতাহিদ ফারুকী