মু. শফিকুল ইসলাম

বাংলার লোকজ বাগধারায় এমন কিছু বাক্য আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর অর্থ ধারণ করে। “পাগলারে নৌকা ডুবাইস না”-এমনই একটি বাক্য। কথাটি নিছক কৌতুক বা গ্রাম্য প্রবাদ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রচিন্তা, ক্ষমতার দর্শন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য রূপক। এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তা স্পষ্ট- যে নৌকায় সবাই উঠেছে, সেই নৌকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে শেষ পর্যন্ত কেউই রক্ষা পায় না।

আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ প্রবাদ যেন রক্তমাংসের সত্য হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তাড়নায়, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার বাসনায় এবং ভিন্নমতকে শত্রু ভাবার মানসিকতায় রাষ্ট্রের সেই নৌকাটিই বারবার ছিদ্র করা হচ্ছে, যার ওপর ভর করেই পুরো জাতি চলমান।

রাষ্ট্র কি দলীয় সম্পত্তি? নৌকার মালিকানা নিয়ে বিভ্রম : ক্ষমতায় গেলে অনেক রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই একটি ভয়ংকর মানসিক রূপান্তর ঘটে। রাষ্ট্রকে তখন আর নাগরিকদের যৌথ চুক্তির ফল হিসেবে দেখা হয় না; বরং দলীয় সম্পত্তি, ব্যক্তিগত সাফল্য বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হিসেবে ভাবা শুরু হয়। এখান থেকেই শুরু হয় নৌকার মালিকানা নিয়ে বিভ্রম। রাষ্ট্র কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, যেখানে চালক ইচ্ছেমতো গতি বাড়াতে বা ব্রেক কষতে পারেন। রাষ্ট্র একটি যাত্রীবোঝাই নৌকা-যেখানে মাঝির ভুল সিদ্ধান্তে মাঝির চেয়েও যাত্রীদের ক্ষতি বেশি হয়। অথচ আমাদের রাজনীতিতে মাঝিরা প্রায়ই ভুলে যান, ডুবে গেলে লাইফবোট শুধু তাঁদের জন্য সংরক্ষিত থাকে না।

ক্ষমতা রক্ষা বনাম রাষ্ট্র রক্ষা: দ্বন্দ্বের রাজনীতি : বর্তমান রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতা রক্ষা আর রাষ্ট্র রক্ষাকে এক করে দেখার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেন ক্ষমতায় থাকা মানেই দেশ বাঁচানো, আর ক্ষমতা হারানো মানেই রাষ্ট্র ধ্বংস। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় সবকিছু জায়েজ করার দর্শন।

নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক যন্ত্রকে দলীয় হাতিয়ারে পরিণত করা, বিরোধী কণ্ঠকে আইন দিয়ে চেপে ধরা- এসবকে তখন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার নামে বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে স্থিতিশীলতা ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে, যে স্থিরতা নীরবতার বিনিময়ে অর্জিত- তা কি টেকসই? ইতিহাস বলে, না। বরং এসবই রাষ্ট্রডুবির পূর্বাভাস।

নির্বাচন: জনগণের অধিকার থেকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তর : গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন যখন প্রতিযোগিতা না হয়ে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ভোটারবিহীন কেন্দ্র, আগাম নির্ধারিত ফল, অংশগ্রহণহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা- এগুলো কেবল রাজনৈতিক অভিযোগ নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় বৈধতার গভীর সংকটের লক্ষণ।

নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যদি তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে তারা অন্য পথ খুঁজতে শুরু করে। সেই পথ সব সময় শান্তিপূর্ণ হয় না। ক্ষমতাসীনদের এই বাস্তবতা বুঝতে না পারাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কারণ গণতন্ত্রকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু জনগণের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না।

বিরোধী রাজনীতি দমন: স্বস্তি না আত্মঘাতী : বিরোধী দল দুর্বল-এ কথা শুনে অনেকেই স্বস্তি পান। কিন্তু বাস্তবে বিরোধী দল দুর্বল হওয়া মানে রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া। বিরোধী দল হলো রাষ্ট্রের অ্যালার্ম সিস্টেম। সেটি বন্ধ থাকলে চুরি হয় না-এমন নয়; বরং চুরি ধরা পড়ে না।

আজ বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে দমন করা হচ্ছে। সভা-সমাবেশ, বক্তব্য, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও হয়ে উঠছে মামলার উপাদান। এতে সাময়িক নীরবতা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে জমে উঠছে বিস্ফোরক ক্ষোভ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- রাজনৈতিক কণ্ঠরোধ শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই উগ্র করে তোলে।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: পেশাদারিত্ব বনাম আনুগত্য : রাষ্ট্র টিকে থাকে তার প্রতিষ্ঠান দিয়ে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি পেশাদারিত্বের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে রাষ্ট্র কাঠামো ভিতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আজ অনেক নাগরিক রাষ্ট্রকে আর ন্যায়ের আশ্রয়স্থল মনে করেন না; বরং ভয় ও বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন।

যে পুলিশ জনগণের আস্থা হারায়, যে প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারায়-তারা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাকেও রক্ষা করতে পারে না। কারণ প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ক্ষমতার ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে যায়।

গণমাধ্যম : আয়না ভাঙার রাজনীতি : গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের বিবেক। এই বিবেককে দুর্বল করলে রাষ্ট্র নিজের ভুল দেখতে পায় না। সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা, প্রশ্নকে ষড়যন্ত্র এবং অনুসন্ধানকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

মামলা, হুমকি, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার-এসবের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু আয়না ভেঙে মুখের দাগ লুকানো যায় না। বরং দাগ থেকে যায়, আয়নাই শুধু থাকে না।

অর্থনীতি : রাজনীতির সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী : রাজনৈতিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। বিনিয়োগ স্থবির হয়, কর্মসংস্থান কমে, বৈদেশিক আস্থা নড়ে যায়। অথচ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অর্থনীতি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য যে শেষ পর্যন্ত জনগণকে দিতে হয়-এ সত্যটি ক্ষমতার কক্ষগুলোতে খুব কমই আলোচিত হয়। ক্ষুধা, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি যখন বাড়ে, তখন রাজনৈতিক ভাষণ আর আশ্বাস অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন নৌকায় পানি ঢোকার শব্দ আর উপেক্ষা করা যায় না।

আত্মসমালোচনার অনুপস্থিতি : ডুবির শেষ ধাপ : সবচেয়ে ভয়ংকর লক্ষণ হলো-আত্মসমালোচনার সম্পূর্ণ অভাব। যখন শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ভুল স্বীকার করতে অস্বীকার করে, তখন সংশোধনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধুদের পরামর্শ, নাগরিক সমাজের সতর্কতা, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ— সবই তখন শত্রুতার চশমায় দেখা হয়।

এটাই রাষ্ট্রডুবির শেষ ধাপ— যখন মাঝি নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন, নৌকা কখনোই ডুববে না।

উপসংহার : শেষবারের সতর্কবার্তা : “পাগলারে নৌকা ডুবাইস না”- এটি কোনো ব্যঙ্গ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত। রাষ্ট্রকে দুর্বল করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাকেই গ্রাস করে। ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম খুব কম।

আজ যদি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা না হয়, ভিন্নমতকে সম্মান না দেয়া হয়, নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য না করা হয়-তাহলে নৌকা ডোবা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন কেউ আর জিজ্ঞেস করবে না, কে ক্ষমতায় ছিল; সবাই শুধু দেখবে-নৌকা কেন বাঁচানো হলো না।

রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে ক্ষমতার নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নইলে ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে বলবে- সতর্ক করা হয়েছিল, তবু নৌকা ডোবানো হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক।