মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতি অতি পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে তিনি সাম্প্রতিক সময় নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় একরোখা ও অপরিনামদর্শী নীতি এবং সিদ্ধান্ত তাকে নিয়ে নতুন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন ও বলে থাকেন। কিন্তু তিনি এসবের থোরাই কেয়ার করেন। এমতাবস্থায় তার গ্রহণযোগ্যতার পাদর এখন রীতিমত নিম্মমুখী। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বস্তুত, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক নাম যা মার্কিন রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক ও সমালোচনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প তার শাসনকালে নানাবিধ আলোচনা এবং সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৫-২৬ সালে তার দ্বিতীয় মেয়াদকালেও তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সমর্থন চরম ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, তাঁর জনসমর্থনের হার ৩৮-৪০% সীমায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে অসন্তোষ প্রায় ৫০% বা তারও বেশি। Reuters/Ipsos-এর জরিপে দেখা গেছে, ৩৮% মার্কিনী তাকে সমর্থন করছেন, ৫২% অসন্তুষ্ট। Similarly, Quinnipiac University-এর জরিপে অনুমোদন রেটিং ৩৯% এবং অসন্তোষ ৫০%। এ অবস্থান তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে এক নিম্নস্তরে বসিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতনের পিছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থনীতি, অভিবাসন, সামাজিক নীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। দেশের সিংহভাগ মানুষ মনে করছেন যে, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ নয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যর্থ। চবি Research Center--এর এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনমতের ৬১% মানুষ মনে করছেন যে ট্রাম্প অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি জীবনের ব্যয় এবং দুর্বল কর্মসংস্থান নিয়ে মানুষের হতাশা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রেও সমালোচনা প্রবল। কঠোর অভিবাসন-নিরোধক পদক্ষেপগুলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। যা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনেকটা ব্যাকফুটে ফেলে দিয়েছে। Reuters/Ipsos জরিপে দেখা গেছে, জনমতের মাত্র ৩৫% মানুষ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি সমর্থন করছেন, যেখানে ৫৫% এরও বেশি মার্কিন নাগরিক মনে করছেন নীতি অতিরিক্ত কঠোর। প্রশাসনিক শৈলীর দিক থেকে ট্রাম্পকে অধিক ক্ষমতাবান, বিরোধী-সমালোচনামূলক এবং প্রতিশোধমূলক বলা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর ফলে মার্কিন গণতন্ত্রর ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রীতিমত সংকটের মুখোমুখি পড়তে পারে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সংকটে আছে’ এমন মন্তব্য ট্রাম্পের রাজনৈতিক শৈলীকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যা দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যে সকল শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা লক্ষ্য করা যায়। তরুণ ভোটাররা তার সমালোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৭০% তরুণ ভোটার তাকে রীতিমত অপছন্দ করছেন। রাজনৈতিক ভিন্নমত অনুসারে, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অসন্তোষ সর্বোচ্চ, রিপাবলিকানরা তুলনামূলকভাবে তাকে সমর্থন করছেন, কিন্তু মধ্যপন্থী ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন কম। The Washington Post/ABC News জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৩৫% ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন, যেখানে ৫৫% অসন্তুষ্ট। এ গোষ্ঠীভিত্তিক বিভাজন মার্কিন রাজনীতিকে আরও ধারালো এবং সংঘর্ষময় করে তুলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির একটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল একতরফা চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতি পরিচালনার চেষ্টা। এ প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় ভেনেজুয়েলার সংকট এবং ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনে। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল সরাসরি ও আক্রমণাত্মক। নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে সমর্থন দেয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে কড়াকড়ি এবং কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘ এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এই পদক্ষেপকে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে। ফলাফল হিসেবে ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণ চরম মানবিক সংকটে পড়ে খাদ্যাভাব, ওষুধ সংকট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়। সমালোচকরা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে তারা ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও তেল-রাজনীতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘদিনের মার্কিন হস্তক্ষেপের স্মৃতি আবারও উসকে দেয়, যা অঞ্চল জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে শক্তিশালী করে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা আরও বেশি বিস্ফোরক। ইরান পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে একতরফাভাবে সরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে ইরান-মার্কিন সম্পর্ক চরম উত্তেজনায় পৌঁছায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ইসরাইল-ইরান বৈরিতার ওপর। ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই ইসরাইলের একতরফা নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমর্থন করে এবং জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়।
সিদ্ধান্তগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যহীনতা বাড়িয়ে তোলে। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী, ইসরাইলী সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এক অনিরাপদ সংঘর্ষের বলয়ে আটকে পড়ে। ইউরোপীয় দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ছিল মূলত শক্তিনির্ভর এবং সংঘাতকেন্দ্রিক। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা ও মধ্যপ্রাচ্যের এ ঘটনাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির মূল দর্শনকে উন্মোচন করে যেখানে বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনীতির চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক প্রভাব। এ নীতিকে অনেকেই ২১শ শতকের নতুন রূপের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির ধারণাকেও গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে যার রেশ আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
আন্তর্জাতিকভাবে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ও সমালোচনার ধরনও সমানভাবে বিতর্কিত। Pew Research Center-এর গ্লোবাল জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজনীনভাবে ৬২% মানুষ মনে করছেন ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন। ইউরোপের দেশগুলো যেমন ইতালি, জার্মানি, স্পেন মার্কিন নীতির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। তুলনামূলকভাবে, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর স্থানীয় নেতাদের প্রতি আস্থা রেটিং স্থিতিশীল থাকে, যেখানে ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী হলেও তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত।
যদিও কিছু দেশ যেমন হাঙ্গরি, ভারত তাঁর কঠোর নীতি ও জাতীয়তাবাদী অবস্থানের প্রশংসা করে, তবুও পশ্চিমা দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তার নীতি বিশেষত অভিবাসন এবং বহুপাক্ষিক বৈদেশিক নীতি নিয়ে সমালোচিত। বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং সমালোচনার এই দ্বিমুখী চিত্র দেখায়, তিনি একদিকে কিছু জনগোষ্ঠীর কাছে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বিতর্ক এবং দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু।
ট্রাম্পের অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি বাস্তবিক পক্ষেই বিভাজক। ইউরোপীয় নেতাদের যেমন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ জনমত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং ধ্রুব। এদের নীতি আন্তর্জাতিক সমঝোতা এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেয়। চীন ও রাশিয়ার নেতারা আন্তর্জাতিকভাবে কম পছন্দ হলেও, ট্রাম্পের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত। এশিয়ার কিছু উন্নয়নশীল দেশের নেতারা যেমন ভারতের নরেন্দ্র মোদি দেশীয়ভাবে শক্তিশালী হলেও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে, কিন্তু ট্রাম্পের মতো পোলারাইজিং নয়।
এ তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখায়, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যা একদিকে তার অনুগত সমর্থক এবং নির্বাচককে উজ্জীবিত করে, অন্যদিকে বিরোধী শক্তির অসন্তোষ বাড়ায় একটি রাজনৈতিক বিভেদের প্রতীক। অভ্যন্তরীণভাবে তিনি তরুণ এবং মধ্যপন্থী ভোটারদের সমালোচনার মুখে, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বজনীন সমালোচনার সামনে, এবং কিছু নির্দিষ্ট সমর্থক গোষ্ঠীর কাছে দৃঢ়। এ বৈপরীত্য ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক প্রভাবশালী কিন্তু বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছে।
উপসংহারে বলা যায়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার উত্থান-পতন মার্কিন সমাজ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতি আমাদের সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। তিনি একদিকে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে বিতর্ক এবং বিভেদের কেন্দ্রবিন্দু। এ দ্বিমুখী অবস্থানই তাকে এক অনন্য রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করেছে যে চরিত্রকে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জনগণ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছে। ট্রাম্পের অবস্থান যেমন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, তেমনি বিশ্বমঞ্চে মার্কিন নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও সমালোচনার ব্যালান্সকে চ্যালেঞ্জ করছে। বস্তুত, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়; এটি একটি সমাজিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক মনোভাবের প্রতিফলন। এমতাবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতার পারদ এখন রীতিমত নিম্নমুখী। যা তার ভবিষ্যতের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
সংযুক্ত জরিপ সূত্রসমূহ :
Reuters/Ipsos (২০২৫-২৬): অনুমোদন ৩৮%, অসন্তোষ ৫২%
Quinnipiac University Pol (২০২৫-২৬): অনুমোদন ৩৯%, অসন্তোষ ৫০%
Pew Research Center (২০২৫): ৬১% মার্কিনি মনে করেন ট্রাম্প অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যর্থ।
The Washington Post/ABC News (২০২৫): মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যে অনুমোদন ৩৫%, অসন্তোষ ৫৫%।
Pew Research Center Global Survey (২০২৫): ৬২% মানুষ মনে করেন ট্রাম্প আন্তর্জাতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।