ইসলামের প্রারম্ভিক সময় থেকেই মুসলিম বীর সেনাপতিরা তাদের অসীম বীরত্ব গাঁথার মাধ্যমে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করা শুরু করেন। সে ধারাবাহিকতায় ইউরোপের অত্যাচারী শাসক রডারিককে পরাজিত করে স্পেন বিজয় সম্পন্ন করা হয়। মূলত, ইসায়ী সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইসলামের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এর শাহাদাতের পর উমাইয়া খিলাফতের সূচনা হয়। স্পেনের প্রজা উৎপীড়ক রাজা রডারিক ক্ষমতায় এসেছিলেন তার পূর্বসূরী শাসক ইউটিজাকে হত্যা করে। এ সময় সিউটা দ্বীপের শাসক ছিলেন কাউন্ট জুলিয়ান। জুলিয়ান তার কন্যা ফোরিন্ডাকে রাজকীয় রসম-রেওয়াজ, আদব-কায়দা শেখাতে রডারিকের কাছে প্রেরণ করেন। কিন্তু রডারিক কর্তৃক ফোরিন্ডার সম্ভ্রমহানির ঘটনা ঘটে। উইটিজা ছিলেন জুলিয়ানের শ্বশুর। শ্বশুর হত্যা ও কন্যার সম্ভ্রমহানীর প্রতিশোধ নিতে জুলিয়ান মুসলিম বীর মুসাকে আমন্ত্রণ জানান স্পেন অভিযানের জন্য।
স্পেনের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা যখন অত্যন্ত শোচনীয়, তখনই মুসাকে স্পেন আক্রমণের আহ্বান জানানো হয়। তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের খলিফা ছিলেন আল ওয়ালিদ। মুসা খলিফার অনুমতি নিয়ে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে পাঠান স্পেন অভিযানের জন্য। মুসা পরে এসে তার সাথে যোগ দেন। সেনাপতি তারিক ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্যর মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য সাধারণ সৈন্যদের মনে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। সেনাপতি তারেক তা উপলব্ধি করে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সকল সৈন্যদের সমবেত করে তাদের বাহন জাহাজগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি তার সাথীদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন- ‘হে মুজাহিদগণ! তোমরা পালাবে কোথায়? তোমাদের পেছনে সাগর, আর সামনে শত্রু। তোমাদের আছে কেবল সাহস আর ধীশক্তি। তোমাদের সামনে শত্রু যাদের সংখ্যা অসংখ্য। তাদের বিপরীতে তোমাদের তলোওয়ার ব্যতীত আর কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে যদি শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পার। ভেবনা আমি তোমাদের সাথে থাকব না। আমি সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভবনা সবচেয়ে কম।’
সেনাপতি তারেকের এ ভাষণে মুসলিম বাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ৭১১ খ্রীষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ‘ওয়াদি লাস্কের’ নামক স্থানে ভিসিগোথ বাহিনীর সাথে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। তারেক আরো অগ্রসর হন এবং একের পর এক শহর নিজের করায়ত্বে নিতে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় ৭১১ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবরে কর্ডোভা বিজিত হয়। এভাবেই সমস্ত হিসপাহানিয়া তথা স্পেন মুসলমানদের আধিপত্যে চলে আসে।
তারপর মুসা বিন নুসাইর পিরিনিজ পর্বতে দাঁড়িয়ে সমগ্র ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন আঁকছিলেন আর স্পেন থেকে বিতাড়িত গথ সম্প্রদায়ের নেতারা পিরিনিজের ওপারে স্পেন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ইউরোপের খ্রিষ্টান নেতারা। মুসলমানরা পিরেনিজ অতিক্রম করে ফ্রান্সের অনেক এলাকা জয় করেন। কিন্তু অ্যাকুইটেনের রাজধানী টুলুর যুদ্ধে ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়ে তারা বুঝতে পারলেন যে, অসির পরিবর্তে মসির যুদ্ধের মাধ্যমেই ইউরোপ জয় করা সহজতর। এরপর মুসলমানদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিস্তারে। তারা সে যুদ্ধে সফল হন এবং সমসাময়িক ইতিহাস তাদের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপরদিকে খ্রিস্টীয় শক্তি পুরনো পথ ধরেই হাঁটতে থাকে। ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে স্পেনের ওপর তাদের নানামুখী আগ্রাসন ও সন্ত্রাস চলতে থাকে। ফলে স্পেনের নিরাপত্তা হয়ে পড়ে হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু স্পেনবাসী জ্ঞান-বিজ্ঞান-আদল-ইনসাফ, সাম্য-সৌহার্দ-ভ্রাতৃত্ব, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্তে পদার্পন করেছিল মুসলিম শাসনামলে। মুসলিম শাসনের সময় স্পেনের রাজধানী ছিলো গ্রানাডা এবং অপর প্রধান শহর ছিলো কর্ডোভা। গ্রানাডা গড়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতার একটি তীর্থস্থান হিসেবে।
সেখানকার আলহামরা প্রাসাদ, গ্রান্ড মসজিদ আজও বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়কর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্বদ্যিালয়ের চেয়েও বড় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। সমগ্র ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা আসতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে। আধুনিককালে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা হাভার্ড কিংবা অক্সফোর্ডে যান, তখন যেতেন কর্ডোভায়।
স্পেনের প্রতিটি জনপদে গড়ে তোলা হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। দুই সভ্যতার মিলনকেন্দ্র স্পেনে দীর্ঘ মুসলিম শাসনামল ছিলো শিক্ষা-সংস্কৃতি, সভ্যতার চরম উৎকর্ষের কাল। ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিকাশের সময়। এ সময়ে স্পেনীয় মুসলমানগণ সমগ্র ইউরোপের সামনে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কারের দাবি করলেও স্পেনের মুসলমানরা তার অনেক আগে থেকেই আমেরিকানদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। স্পেনের মুসলিম সভ্যতাকে ইউরোপীয়রা স্বীকৃতি দিয়েছে ‘মরুসভ্যতা’ হিসেবে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকেরা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য নিয়মিত গোসল করতেও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। অথচ মুসলমানরা রাস্তার রাস্তায় গড়ে তুলেছিলেন হাম্মামখানা। সেখানে শুধু অজু-গোসলের ব্যবস্থাই থাকতোনা বরং থাকতো সুগন্ধি, প্রসাধন ও সাবানের ব্যবস্থা।
উল্লেখ্য, স্পেনের পূর্ব নাম হিসপাহানিয়া। মুসলিম বিজয়ের পর নতুন নামকরণ করা হয় আন্দালুসিয়া। রাজধানী স্থানান্তরিত হয় কর্ডোভায়। মুসলমানরা প্রকৃত পক্ষেই শিক্ষানুরাগী। সমস্ত ইউরোপ যখন মূর্খতা, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিল, সেখানে মুসলমানেরা আন্দালুসিয়ায় ৮০০ শিক্ষা কেন্দ্র, ৭০০ মসজিদ, ৭০টি লাইব্রেরী স্থাপন করেছিল। লাইব্রেরীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিটিতে প্রায় ৬ লক্ষাধিক গ্রন্থ স্থান পেয়েছিল। এছাড়া ৯শ’ পাবলিক গোসল খানা, ৬০ হাজার প্রাসাদ এবং প্রভূত সংখ্যক রাস্তাঘাট নির্মিত হয় মুসলিম শাসনামলে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মত।
মুসলিমদের স্পেন বিজয় ও সভ্যতার বিবর্তন খ্রীষ্টীয় শক্তি স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বরং তারা শুরু থেকেই মুসলমানদের অগ্রযাত্রা রোধে নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যখন অপ্রতিরোধ্য, রোম-পারস্য সহ সমগ্র পরাশক্তি যখন মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে, ঠিক তখনি ইউরোপের খ্রীষ্টান সম্প্রদায় নতুনভাবে জেগে উঠলো ক্রুসেডীয় চেতনায়। তারা সমস্ত খ্রীষ্টান রাজন্যবর্গ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দেয়। সে ডাকের মূলমন্ত্রই ছিল-মুসলমানদের পরাজিত করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ঠেকানো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্রুসেড’ বা ‘ধর্মযুদ্ধ’। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ক্রুসেডের আহ্বানে সাড়া দেয় সম্মিলিত খ্রীষ্টীয় শক্তি। নিজেদের বিভেদ ভুলে তারা মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। চলতে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রুসেডারদের তান্ডব।
৬ষ্ঠ ক্রুসেডের সময় পর্যন্ত বারবার প্রতারণার আশ্রয় নেয় খ্রীষ্টান রাজন্যবর্গ ও ক্রুসেডাররা। ১০৯৫ থেকে দীর্ঘ ১৯৬ বৎসর পর্যন্ত এইসব ক্রুসেডের ফলে বহু নিরীহ মানুষকে জীবন হারাতে হয়। চূড়ান্তভাবে ১২৪৪ সালে জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে আসে। ১২৪৪ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত একটানা ৬৭৫ বছর জেরুজালেম মুসলিম শাসনে থাকে। ১৯১৯ সালে ইংরেজ জেনারেল এলেনবাই জেরুজালেম শহরে সদলবলে ঢুকে ক্রুসেডের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
মূলত, মুসলিম শাসকদের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, জনগণের অসচেতনতা ও অনৈক্যের ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলিম জাতিকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। এ মাশুলেরই একটি হচ্ছে ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি। যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিভীষিকা ও দুঃসহ স্মৃতি হয়ে আছে।
স্পেনে মুসলমানদের শাসক তখন বাদশাহ হাসান। খ্রীষ্টানরা হাসানের বিরুদ্ধে তার পুত্র আবু আব্দুল্লাহকে বিদ্রোহী করে তোলে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে। পিতার বিরুদ্ধে আবু আব্দুল্লাহ বিদ্রোহ করলে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে পালায়ন করেন এবং আবু আব্দুল্লাহ ক্ষমতা গ্রহণের পরই শুরু হয় স্পেনের মুসলমানদের পতন। আবু আব্দুল্লাহ দুর্বল নেতৃত্ব, নৈতিক অবস্থান ও মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ করে সম্মিলিত খ্রীষ্ট শক্তি। সে ষড়যন্ত্রকে মজবুত ভিত্তি দিতেই আরগুনের শাসক ফারডিনান্ড এবং কাস্তালিয়ার পুর্তুগীজ রানি ইসাবেলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মূলত স্পেনে মুসলমানদের পতনের জন্য সম্মিলিত খ্রীষ্টীয় শক্তির ষড়যন্ত্র ও নিজেদের আন্তঃকলহই প্রধানত দায়ি। সে ধারাবাহিকতায় ১৪৮৩ সালে আবু আব্দুল্লাহ লুসান আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দি হন। পরবর্তীতে গ্রানাডার গভর্নরের সাথে তার গৃহযুদ্ধ বেধে যায় যা ছিল ফারডিন্যান্ডের ষড়যন্ত্র। এভাবে গৃহযুদ্ধের ফলে মুসলমানদের শক্তি কমতে থাকলে খ্রীষ্টান বাহিনী গ্রানাডা অবরোধ করে। তারা প্রতিপক্ষের সাথে একটা আপসরফার সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৯২ সালে ‘ক্যাপিচুলেশন অব গ্রানাডা’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মুসলিমদের ধর্মীয়, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধাই ছিল এ চুক্তির বিষয়বস্তু।
ফার্ডিন্যান্ড আবু আব্দুল্লাহকে আশ্বস্ত করেন যে তারা যদি বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। দুর্বল রাজা ও তার সভাসদগণ অতীতের চুক্তিভঙ্গের রেকর্ড ভুলে গিয়ে ফার্ডিন্যান্ডের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক সাহসী সৈনিক আত্মসমর্পনের পরিবর্তে লড়াই করে শাহাদাতকে বেছে নিলেও অন্য সকলে গ্লানিকর আত্মসমর্পনের পথ গ্রহণ করে। শুরু হয় গণহত্যা ও ধ্বংষযজ্ঞ। খ্রীষ্টান সৈন্যরা মুসলমানদের শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়। সমৃদ্ধিশালী গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়। গবাদিপশু তুলে নিয়ে যায়।
ফলে সহজেই ফার্ডিন্যান্ড গ্রানাডার রাজপথসহ পুরো শহর দখল করে নেয় ২৪শে নভেম্বর ১৪৯১ সালে। এরপর শুরু হয় নৃশংস ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ। এসব অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে উঠলে অনেক মুসলিমরা বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহী এসব লোকজনকে হত্যা করার পাশাপাশি এক পর্যায়ে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার বাহিনী ঘোষণা করে যারা শান্তি চায় তারা যেনো সব মসজিদে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
সরল বিশ্বাসে হাজার হাজার মুসলিম আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নগরীর মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেন। তারা ভেবেছিলেন এতেই তাদের জানমাল নিরাপদ থাকবে। কিন্তু খ্রীষ্টানরা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। রাতের আঁধারে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো সমস্ত মসজিদ। প্রজ্জলিত আগুনের লেলিহান শিখা, নারী-পুরুষের আর্তনাদ আর ফার্ডিন্যান্ড-ইসাবেলার যুগপৎ অট্টহাসিতে গ্রানাডার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো। যা ইতিহাসের এক নির্মম গণহত্যা। এঘটনা ছিল ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার ও নারকীয় বিয়োগান্তক ঘটনা সংঘঠিত হয় সেদিন। হাসি তামাশাচ্ছলে এ দিনে ‘এপ্রিল ফুল’ তথা ‘এপ্রিলের বোকা’ উদযাপিত হলেও এটি মূলত মুসলমানদের জন্য এক ট্র্যাজেডির দিন।
এ নির্মম ও নিষ্ঠুর গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, তাদের ফার্ডিনান্ডের ছেলে তৃতীয় ফিলিপ সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করেন। তাদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। এভাবেই মুসলিম আন্দালুসিয়া বর্তমান স্পেনের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের দুঃখ স্মারক বেঁচে আছে।
মূলত ইউরোপে মুসলমানরা প্রবেশ করেছিলেন স্পেনের দরজা দিয়ে। ঐতিহাসিক রবার্ট ব্রিফল্ট ‘দ্য ম্যাকিং অব হিউম্যানিটি’ গ্রন্থে মুসলমানদের এ প্রবেশকে অন্ধকার কক্ষের দরজা দিয়ে সূর্যের আলোর প্রবেশ বলে অভিহিত করেছেন। রবার্ট ব্র্রিফিল্টের বক্তব্য হলো ‘যেহেতু স্পেনে মুসলমানদের আগমণের ফলে শুধু স্পেন নয়, বরং গোটা ইউরোপ মুক্তির পথ পেয়েছিল এজ অব ডার্কনেস তথা হাজার বছরের অন্ধকার থেকে। এজ অব ডার্কনেস সম্পর্কে রবার্ট ব্রিফল্টের মন্তব্য হলো ‘সে সময় জীবন্ত অবস্থায় মানুষ অমানুষিকতার অধীন ছিল, মৃত্যুর পর অনন্ত নরকবাসের জন্য নির্ধারিত ছিল।’
মুসলিম সেনাপতি তারেক-মুসার বীরত্বগাঁথায় মুসলমানরা আন্দালুসিয়া তথা স্পেনে ইসলামের বিজয় নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু খ্রীষ্টবাদী ষড়যন্ত্র, মুসলিমদের অনৈক্য ও শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতার কারণেই স্পেন অনেক আগেই মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী-খ্রীষ্টবাদী ষড়যন্ত্র আজও বন্ধ হয়নি। সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ১৯৯৩ খ্রীষ্টাব্দে ১ এপ্রিল গ্রানাডা ট্র্যাজেডির পাঁচশ’ বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে স্পেনে আড়ম্বরপূর্ণ এক সভায় মিলিত হয়েছিল বিশ্ব খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। সভায় একচ্ছত্র খ্রীষ্টান বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাগরণ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘হলি মেরী ফান্ড’।
স্পেনে মুসলমানদের গৌরবগাঁধা আর অবশিষ্ট নেই বরং ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্রাজেডির মাধ্যমে তার অবসান হয়েছে। সেদিন খ্রীষ্ট শক্তি মুসলমানদের নিরাপত্তার আশ্বাসে মসজিদে একত্রিত করে মুসলিম আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে সেভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল তা ইতিহাসের সকল নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। তারেক-মুসার স্পেন মুসলমানদের জন্য এখন অতীত স্মৃতি বৈ কিছু নয়।
www.syedmasud.com