আসিফ আরসালান
সম্প্রতি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত দুই রাঘব বোয়ালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুইজনই প্রাক্তন লে. জেনারেল। প্রথমে গ্রেফতার হন লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তারপর গ্রেফতার হন লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। মাসুদ উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট বলে পরিচিত সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক। আর মামুন খালেদ ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (অব.)। মামুন খালেদ ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন। তাকে আয়নাঘরের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণমাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। হত্যা মামলাসহ কয়েকটি মামলায় আদালতে তার রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। যেহেতু তার বিচার চলমান তাই তার সম্পর্কে আজ আর বিস্তারিত কিছু বললাম না।
মাসুদ উদ্দিনকে টাকা পাচার মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে আরো কয়েকজন আদম ব্যবসায়ীর সাথে মিলে বিদেশে আদম ব্যবসা করা এবং সে ব্যবসার সুযোগ নিয়ে টাকা পাচার করার সাথে এ প্রাক্তন সেনা অফিসার জড়িত ছিলেন। যাদের সাথে মিলে তিনি টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে তাদের সাথে মিলে তিনি নাকি একটি পাচারকারীর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তো টাকা পাচারকারীদের যদি ধরতেই হয় তাহলে ঐ সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদেরকেও তো গ্রেফতার করার প্রয়োজন ছিলো। সুতরাং ধারণা করা যায় যে, টাকা পাচার ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরো অনেক চার্জ আনা হবে, যেগুলো এখন প্রক্রিয়াধীন বলে জানা যায়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি কলাম থেকে জানা যায় যে, মাসুদ উদ্দিনের মামলাটি অনেক শাখা প্রশাখা বিস্তার করবে এবং অনেক দূর যাবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পারিবারিক সম্পর্কের দিক দিয়ে মরহুম প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আপন ছোট ভাই সাইদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই। তিনি প্রথম জীবনে অর্থাৎ শেখ মুজিবের আমলে রক্ষীবাহিনীর অফিসার ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবের পতন হলে পরবর্তী সরকার রক্ষীবাহিনীর অনেক অফিসার ও জওয়ানকে সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করেন। সাইদ ইস্কান্দারের সুপারিশেই তাকে নাকি সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয় এবং সে সুপারিশেই পরবর্তীতে তাকে নবম ডিভিশনের মতো শক্তিশালী ডিভিশনের জিওসি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে যে, ২০০৭ সালে যে ১/১১ সংঘঠিত হয় তার কেন্দ্রে ছিলেন ৪ উদ্দিন। এ ৪ উদ্দিন হলেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদ, ফখরুদ্দিন আহমেদ, ইয়াজুদ্দিন আহমেদ এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুকম্পায় সেনাবাহিনীর অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হলেও পরে সে মাসুদ উদ্দিনই জেনারেল মইনের সাথে যোগসাজশ করে ১/১১ ঘটান এবং ইন্দো-মার্কিন চক্রান্তে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, বেগম জিয়ার ছোট ভাই সাইদ ইস্কান্দারের আপন ভায়রা ভাই হওয়া সত্ত্বেও এ মাসুদ উদ্দিনের উদ্যোগেই তৎকালীন ৪৩ বছরের তরুণ বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। আটক অবস্থায় তারেক রহমানের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। বাজারে চাউর আছে যে, মাসুদ উদ্দিনের ইশারাতেই তারেক রহমানকে ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়। এ ফেলে দেয়ার ফলেই তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। সে মেরুদণ্ডের ভাঙা হাড়ের চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান লন্ডন যান। তারপর ১৭ বছর সেখানে অবস্থান করেন।
যারা ১/১১ ঘটিয়েছিলো তাদের সকলকে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেফ এক্সিট দিয়েছিলেন। কিন্তু মাসুদ উদ্দিন ছাড়া আর কাউকে পুরস্কৃত করেননি। ইয়াজুদ্দিনকে গ্রেফতার করেননি। অতঃপর অসুস্থতাজনিত কারণে অধ্যাপক ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ইয়াজুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। ফখরুদ্দিন আহমেদ আমেরিকার মেরিল্যান্ডে ফিরে যান। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আমেরিকার ফ্লোরিডা চলে যান। সেখানে তিনি তার পুত্রের সাথে অবস্থান করেন। ফ্লোরিডা যাওয়ার কয়েকদিন পরেই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর এখন তিনি সুস্থ এবং ফ্লোরিডাতেই অবস্থান করছেন। কিন্তু মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বেলায় ঘটে ভিন্ন ঘটনা। শেখ হাসিনা তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেন। অস্ট্রেলিয়াতে রাষ্ট্রদূত হিসাবে তার চাকরি একাধিকবার নবায়ন করা হয় বা এক্সটেন্ড করা হয়। চাকরি শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে শেখ হাসিনার সুপারিশে তার পাতানো নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা তাকে নমিনেশন দেননি, তবে তার আগে থেকেই তাকে ব্যবসা বাণিজ্যে অনেক সুবিধা দিয়েছিলেন।
এ মইন উদ্দিন, ফখরুদ্দিন এবং মাসুদ উদ্দিনরাই সংঘঠিত করেছিলেন কুখ্যাত ১/১১, যে কুখ্যাত ঘটনার সিঁড়ি বেয়ে হাসিনা পরবর্তী ১৫ বছরে ৩ বার প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ দখল করেছিলেন এবং গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ হত্যা করে নাৎসীবাদ ও কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ থেকে ১৯ বছর আগে ঐ ১/১১ সংঘঠিত হয়েছিলো। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো ঐ ঘটনা জানেন অথবা ভাসা ভাসা জানেন অথবা কিছুই জানেনা। তাদের জন্য ঐ কালো ১/১১ সংক্ষেপে নিচে বর্ণনা করছি।
তার আগে দু একটি কথা বলা দরকার। বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সারাদেশে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। অবশেষে বেগম জিয়ার সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে বাধ্য হন। ১৯৯৬ সালে যে নির্বাচন হয় সে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তখন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের পর, অর্থাৎ ২১ বছর পর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে।
২০০১ সালেও কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। কেয়ারটেকার সরকার প্রধান ছিলেন অবসর প্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। স্বাভাবিকভাবেই ২০০৬ সালে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচন নিয়েই বাধে যতো গোল। আমি সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণে যাচ্ছি না। ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২৮ অক্টোবর বেগম জিয়া পদত্যাগ করেন। নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি। কেয়ার টেকার সরকার গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগ দেশে একটি টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি করে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামীর জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো। প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের তৎকালীন আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। এ জনসভায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ হামলা করে এবং ৭ জন জামায়াত ও শিবির কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ড লগি বৈঠার হত্যাকাণ্ড হিসাবে ইতিহাসে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। হত্যা করার পর ওরা লাশের ওপর উঠে নৃত্য করে। এসবের হোতা ছিলো বাপ্পাদিত্য। মাওলানা নিজামী স্বয়ং তৎকালীন আইজি আনোয়ারুল ইকবালকে সাহায্যের জন্য বার বার ফোন করা সত্ত্বেও কোনো পুলিশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক জামায়াত হত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি।
আওয়ামী লীগ ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য সমস্ত আসনে মনোনয়ন দিলেও ৩ জানুয়ারি অকস্মাৎ সমস্ত মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে। তখনই তথ্যাভিজ্ঞমহল আঁচ করেন যে বড় একটি কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ঘটলোও তাই। ৩ জানুয়ারির পর ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বাতিল হয়। বিশ্বব্যাংকে চাকরি করা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি ছিলো একটি ছদ্মবেশী সামরিক শাসন। ফখরুদ্দিন ছিলেন তার সিভিলিয়ান ফেস। আর জেনারেল মইন এবং জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন তার পেছনের অবয়ব।
ফখরুদ্দিন আসেন কেয়ারটেকার প্রধান হিসাবে। তার মেয়াদ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মোতাবেক ছিলো ৩ মাস। কিন্তু তিনি নেন ২ বছর। এ দুই বছর ছিলো অত্যন্ত ঘটনাবহুল। জেনারেল মইন ভারতে যান। দেখা করেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সাথে। প্রণব মুখার্জি তাকে আশ্বাস দেন যে নির্বাচন হলেও মইন উদ্দিনের চাকরি যাবে না। সে গ্যারান্টি মইন উদ্দিনকে প্রণব মুখার্জি দেন। (এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন, প্রণব মুখার্জির লেখা গ্রন্থ ‘দি কোয়ালিশন ইয়ার্স’)। এখানে বলা দরকার যে, প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া সেনাবাহিনীর ৮ জন জেনারেলকে ডিঙ্গিয়ে ৯ নম্বরে অবস্থানকারী জেনারেল মইনকে সেনাপ্রধান করেন। আর সে মইনই বিএনপিকে ডুবিয়ে দেয় ১/১১’র মাধ্যমে।
এরপর নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী দিল্লীতে অনুষ্ঠিত আমেরিকা ও ভারতের যৌথ বৈঠকে প্রণীত নীলনকশা মোতাবেক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সব বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করা হয়। সে বন্দোবস্ত মোতাবেক ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাকে দু’তৃতীয়াংশ মেজরিটি দিয়ে ক্ষমতায় আনা হয়। এখানে উল্লেখ্য, এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনেও বিএনপিকে দু’তৃতীয়াংশ মেজরিটিতে ক্ষমতায় আনা হয়েছে।
যাহোক, ইন্দো-মার্কিন পরিকল্পনা মোতাবেক শেখ হাসিনা বিএনপিকে দমন করেন সত্য, কিন্তু জুলুম ও নৃশংসতার পরাকাষ্ঠা দেখান জামায়াতের বেলায়। মিশরে ইখওয়ানুল মুসলেমিনের (মুসলিম ব্রাদারহুড) ওপর সংঘঠিত বর্বর নির্যাতনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাওলানা নিজামীসহ ৫ জন জামায়াতের শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হয়।
আমেরিকা তখন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম করে মুসলিম দেশগুলিকে একটির পর একটি করে পঙ্গু ও খতম করে দিচ্ছিলো। বাংলাদেশেও অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর ইসলামী সন্ত্রাসের তকমা এঁটে দেয়া হয় এবং জামায়াত ও শিবিরকে নির্মূল করার কাজে নেমে পড়ে।
স্থানাভাবে ১/১১ ঘটার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া সম্ভব হলো না। তবে ইন্দো মার্কিন শক্তি শেখ হাসিনাকে দিয়ে ১৫ বছর ধরে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন শক্তিকে ধ্বংস করার কাজ বিরতিহীনভাবে করে গেছেন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিচার যদি টাকা পাচারের জন্য হয় তাহলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা হবে। তার বিচার করতে হবে কুখ্যাত ১/১১’র দুই শীর্ষ কুশীলব হিসাবে। তার বিচার করতে হবে দেশকে ভারতের তাবেদার এবং গণতন্ত্র হত্যার পথ খুলে দেয়ার অভিযোগে। নাহলে সব আই ওয়াশ হিসাবে গণ্য হবে।