১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও দলটি রাজনৈতিক দল হিসাবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেনি বরং দলটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারি ও মাফিয়াতান্ত্রিক শক্তি হিসাবেই পরিচিতি পেয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারীকে ১৯৫৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আইনসভার অভ্যন্তরে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আর এ অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলো খোদ আওয়ামী লীগ।

দলটির সাংগঠনিক আদর্শ গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষ হলেও এসব কথাকে তারা দলীয় গঠনতন্ত্রের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। দলীয় আদর্শ চর্চায় তাদেরকে এসবের ধারের কাছেও যেতে দেখা যায়নি বরং তারা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির চর্চা করে এসেছে। দলটি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি হিসাবে দাবি করলেও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তারা রাজনৈতিক ব্যবসার অনুসঙ্গ বানিয়েছে। একই সাথে তারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার চেতনাকে জলাঞ্জলী দিয়ে প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে বরাবরই। যা প্রাচীন এ দলটিকে রীতিমত গণবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

অবাধ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা হলেও আওয়ামী লীগ নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বিভন্নমতকে স্বাধীনতার বিরোধী আখ্যা দিয়ে জাতিকে বহুধা বিভক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগই প্রথম ভোট ডাকাতির সূচনা করেছিলো। কিন্তু এতেও তারা তৃপ্ত হতে পারেনি বরং সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছিলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কমরেড সিরাজ শিকদার সহ প্রায় ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যা করে পুরো দেশকেই বধ্য ভূমিতে পরিণত করেছিলো। এসবই ছিলো আওয়ামী বাকশালীদের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রকৃত নমুনা। তারা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী হিসাবে প্রচার করলেও তাদের দ্বারা দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, তাদের সম্পদ দখল ও নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি বরং ১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত পট পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিলো।

বস্তুত, আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্র পরস্পর বিরোধী। একটার সাথে আরেকটার কোন সম্পর্ক নেই। এজন্য তাদেরকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই তাদেরকে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছিলো। কিন্তু ১৯৯৬ সালে অতীত ভুলের জন্য দেশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আবারও ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হয়েছিলো। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে আবার স্বরূপে ফিরে আসার কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদেরকে আবার লজ্জাজনকভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। কিন্তু খাসলতের কোন পরিবর্তন হয়নি বরং তাদের গণবিরোধীতা একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিলো।

তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলো যে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের পক্ষে আর কখনোই ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়। তাই এ ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ৪ দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু তদানীন্তন সরকারের কঠোর ও সতর্ক অবস্থানের কারণে সেসব আন্দোলন তারা সফল ও স্বার্থক করতে পারেনি। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকে নি বরং ৪ দলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে তারা দেশকে অশান্ত করতে সক্ষম হয়। সে ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন ময়দানের লগি-বৈঠার তাণ্ডব চালিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে মানুষ পিটিয়ে হত্যা লাশের ওপর দানবীয় উল্লাস চালায়। আর এভাবেই ১/১১ ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে সাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারকে উৎখাত করে একটি অসাংবিধানিক জরুরি সরকার গঠন করা হয়। এ সরকার দীর্ঘ ২ বছর অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ সালে একটি পাতানো ও ষড়যন্ত্রের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসায়। এ সরকারই দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে অপশাসন-দুঃশাসন চালায় এবং দেশকে প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। দেশকে বানানো হয়েছিলো আওয়ামী লীগের তালুক সম্পতিতে।

অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, তারা ক্ষমতাকে একেবারে চিরস্থায়ী বস্তোবস্ত হিসাবে ধরে নিয়েছিলো। শেখ হাসিনা তো দম্ভ করেই বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের পতন ঘটানোর মত শক্তি কারো নেই। কিন্তু তার সে অহমিকা বেশিদিন স্থায়ি হয়নি বরং জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের তখতে তাউস বালির বাঁধের মত ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মনে করা হয়েছিলো যে, তারা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। কিন্তু তারা অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নেয় নি বরং জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ ও বিতর্কিত করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। সে ধারাবাহিকতায় দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বায়বীয় অভিযোগ তোলা হয়। আর সে দাবির সাথে কোরাস গাইতে শুরু করে আমাদের বৃহত প্রতিবেশী ভারত। এরপর আনসার ও শ্রমিক বিদ্রোহের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। পরিকল্পিতভাবে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদেরও মাঠে নামানো হয়। দলীয় নেত্রী সহ ভারতে পালিয়ে থাকা নেতারা উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালায়। এর সাথে যুক্ত হয় শেখ হাসিনার ‘চট করে’ দেশে ফেরার এক বায়বীয় পরিকল্পনা। সবকিছুতেই ব্যর্থ হয়ে তারা দেশে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র শুরু করে। কথিত ইনক্লুসিভ নির্বাচনের বাহানা তুলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজে লাগানো হয় ভারতকে। কিন্তু জনগণের সচেতনতার কারণে এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন না পাওয়ায় তাদের কোন পরিকল্পনায় হালে পানি পায়নি।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল। দলটি ১৯৭১-১৯৭৫, ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার দায়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১২ মে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয়। পরবর্তীকালে এর নাম ছিল নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে এর নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের প্রতীকের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সাল থেকে দলটির নির্বাচনী প্রতীক নৌকা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করে, যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকগণ প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং এর বহু জ্যেষ্ঠ নেতা-কর্মী নিহত হন বা কারাবন্দি হন। ১৯৮১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা দলটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এখনও তিনি সে পদে রয়েছেন।

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপি জামায়াতের সাথে মিলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দলটি ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ শাসনকালকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র থেকে পশ্চাদপসরণ এবং দলটিকে ধারাবাহিকভাবে কর্তৃত্ববাদী এবং স্বৈরতান্ত্রিক দল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর দলটি গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের সকল ধরনের অনলাইন ও সরাসরি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। শেখ হাসিনা এবং ওবায়দুল কাদের যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের পরিকল্পনা করে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এমনকি আসি আসি বলে শেখ হাসিনার দেশেও ফেরা হয়নি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে ‘নো বোট, নো ভোট’ পলিসি গ্রহণ করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে নির্বাচন বানচালের ছক বাস্তবায়ন করতে না পারায় মূলত দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী এমন পলিসি নিয়ে কাজ করেছেন পতিত দলটির শীর্ষ নেতারা। দিল্লিসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলটির পক্ষে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এমন ক্যাম্পেইন চালায়।

দেশে নির্বাচনী উত্তাপ যখন তুঙ্গে তখন কার ভোট কোথায় যাচ্ছে, কোন দল ক্ষমতায় বসছে-এসব আলোচনা যখন চায়ের টেবিলে ঝড় উঠেছিলো আওয়ামী তখন আওয়ামী নানাবিধ কুটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। ভোটাররা যখন সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তাদের পছন্দের প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন এবং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য বিএনপি জোট এবং জামায়াত জোট নানা কৌশল গ্রহণ করছিলো, পতিত ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগও দিল্লিতে বসে তাদের নির্বাচনী কৌশল পরিবর্তন করে বলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংসদ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জ্ঞাত হওয়া গেছে, শেষ মুহূর্তে ‘নো বোট, নো ভোট’ পলিসি নিয়ে এগিয়েছিলো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে নির্বাচন বানচালের ছক বাস্তবায়ন করতে না পারায় মূলত দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী এমন পলিসি নিয়ে কাজ করেছেন পতিত দলটির শীর্ষ নেতারা। দিলীøসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এমন ক্যাম্পেইন চালিয়েছে। জানা যায়, ‘নো বোট, নো ভোট’ পলিসি অনুযায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ভোট কাস্ট করানোর বিষয়ে জোরালো তৎপরতা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করেছিলো, দেশের ইতিহাসে একেবারে সর্বনিম্ন কম ভোট কাস্ট হলে আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হবে যে, তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো প্রাসঙ্গিক, তারা যে জনসমর্থনের তথ্যগুলো তুলে ধরছে এক দিকে সঠিক প্রমাণ করাও যাবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বলতে পারা যাবে-আওয়ামী লীগকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করানো হয়েছে। এ দেশের মানুষ এখনো আওয়ামী লীগকে চায়। তাদের এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সংগঠনকে দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে তাদের পুনর্বাসনের জন্য চাপ প্রয়োগ করাটাও অনেকটা সহজ হবে বলে মনে করা হয়।

আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী, এ দেশে তাদের সমর্থনের হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন- ‘আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম দল। তাদের ভোট শেয়ার ৪০-৫০ শতাংশ। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ছয়-সাত কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক।’ নির্ভরযোগ্য সূত্র এও বলছে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের এ দাবিকে সত্য প্রমাণিত করতে হলে ‘নো বোট, নো ভোট’ পলিসি বিকল্পহীন মনে করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। তাদের এ পলিসির পেছনে কয়েকটি শক্ত যুক্তির মধ্যে একটি তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হয় তা হলো-আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপারে নৌকা নাই, তাই ভোটও নাই। তা ছাড়া দলটির তরফ থেকে আরেকটি শক্ত যুক্তি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে কৌশলে তুলে ধরা হয় তা হলো-আওয়ামী লীগকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি এখন ভারতে এবং দলটির সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন ড. আবদুর রাজ্জাক, ফারুক খানসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের অংশ হিসেবে ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদেরও এসব বার্তা কৌশলে পৌঁছে দেয়া হয়েছে নির্বাচনের দু’সপ্তাহ আগেই। যদিও আওয়ামী লীগের ভোট দেশের বড় একটি দল প্রত্যাশা করেছে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সেটাই প্রচার করা হয়।

নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে এক ফেসবুক পোস্টে পতিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন লিখেন- ‘নো বোট, নো ভোট’। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের শেষ ষড়যন্ত্রকেও নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং তারা আওয়ামীকে এ বার্তাই দিয়েছে যে জাতীয় রাজনীতিতে তারা এখন পরিত্যক্ত ও অপ্রাসঙ্গিক। ফলে তাদের ‘নো বোট, নো ভোট’ পরিকল্পনাও সুপার ফ্লপ করেছে। তারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ভোট কাস্টের যে রেকর্ড সৃষ্ট করতে চেয়েছিলো সে আশায় গুঁড়েবালি পড়েছে। নির্বাচনের কমিশন সূত্রে জানা গেছে এবারের ভোট কাস্টের শতকরা হার ৫৯.৪৪ শতাংশ। যা দলটিকে রীতিমত হতাশ করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অংশীজনের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও এ নির্বাচন যে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই জুলাই বিপ্লব পরবর্তী আওয়ামী লীগের সকল ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়েছে। মূলত, তারা এখন পতিত ও গণধিকৃত শক্তি। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে এবং জনগণকে আস্থায় না নিয়ে রাজনীতির নামে অপরাজনীর কারণেই তারা এ অবস্থায় পড়েছে। যা আগামী দিনের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সতর্ক বার্তা।

www.syedmasud.com