আসিফ আরসালান
আজ ১ ফেব্রুয়ারি রবিবার। ১১ দিন পর দেশে ত্রয়োদশ বা ১৩ নম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমি এর আগে এ কলামে বলেছিলাম যে, নির্বাচনী প্রচারাভিযান সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে। সে সাথে আমি এ আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলাম যে, অবশিষ্ট দিনগুলোতেও নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ থাকবে। আমরা ভেবেছিলাম যে, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং মারামারি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ করে। যেহেতু আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে তাই এবারের নির্বাচন আপদ মুক্ত হবে। কিন্তু আমাদের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হলো। যে বিএনপি শেখ হাসিনার আমলে দু’-একটা সাউন্ড গ্রেনেড ফাটলে সদলবলে পালিয়ে যেতো তারা আজ হঠাৎ করে মাস্তান সেজেছে। জামায়াতে ইসলামী সে ১৯৪৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অর্থাৎ ৮১ বছরে কোনো দিন কোনো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়নি।
পাকিস্তান আমলের কথা না হয় বাদই দিলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব তার সংবিধানের মাধ্যমে শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামী নয়, পুরো ইসলামী রাজনীতিই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অথচ ধর্ম বিরোধী কমিউনিস্ট পার্টিকে রাজনীতি করার অনুমতি প্রদান করেননি। শেখ মুজিবের পতনের পর জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামিক দল রাজনীতি করার অনুমতি পায়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত জামায়াত কোথাও গুন্ডামি করেছে, তার একটি নজিরও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
জামায়াতের এ অব্যাহত শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে বিএনপি দুর্বলতা হিসাবে গ্রহণ করেছে। তাই তারা শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমসহ জামায়াতের সমস্ত নেতা কর্মীর ওপর হামলা চালায়। তাদের হামলায় শ্রীবর্দীর জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম শহীদ হন। বৃহস্পতিবার এ ভাষ্য লেখার সময় এ হামলায় প্রায় ৫০ জন জামায়াত নেতা কর্মী আহত হন। তাদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যথা ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জেনারেল সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ অন্যান্য নেতা দেড় মাস/দু’মাস আগে থেকেই বলে যাচ্ছিলেন যে এ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা হচ্ছে না। প্রশাসন সর্বক্ষেত্রে বিএনপিকে সহযোগিতা করছে। এখন একথা সবার মুখে মুখে যে, প্রশাসন মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় যাচ্ছে। সুতরাং তাদের নেক নজরে পড়ার জন্য আগেভাগেই তাদের পক্ষ নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
শুধুমাত্র শেরপুরেই এমন হামলা চালানো হয়নি। শেরপুর ছাড়াও জামায়াতের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে এবং হামলা করছে বিএনপি। এ পর্যন্ত ৭টি জেলার ২২টি প্রচারণা সভায় বিএনপির হামলার খবর পাওয়া গেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তারা এমন সহিংস হয়ে উঠেছে যে, ঢাকায় জামায়াতের মহিলা কর্মীদের ওপরেও হামলা করা হয়েছে। তাদের বিবেক বর্জিত হামলায় মা-বোনদের সম্ভ্রম বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় সারাদেশে জামায়াতের নারী নেতাকর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদে ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিল জামায়াতের মহিলা শাখা। বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ সমাবেশ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
গত ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে সমাবেশ স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আগামী ৩১ জানুয়ারি মহিলা সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহের বলেছিলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কর্মসূচিতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবে আমাদের মহিলা শাখার পক্ষ থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। প্রয়োজনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও আমরা রাজপথে বড় ধরনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। আপাতত আমরা মহিলা শাখার কর্মসূচি ঘোষণা করছি, যাতে সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয় এবং তারা সজাগ হোন। ধারণা করা যায় যে, মহিলাদের সভায় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাতেই এই সভা স্থগিত করা হয়েছে।
এ স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি থেকে বোঝা যায় যে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন। একটি সমাবেশে প্রথম সারিতে বসার ইস্যুকে কেন্দ্র করে যারা হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারে তারা ক্ষমতায় গেলে তাদের প্রতিপক্ষকে যে কিভাবে শায়েস্তা করবে সেটি বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। এ ভাষ্য লেখার সময় পর্যন্ত শ্রীবর্দীর এই হত্যাকাণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তিকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি।
ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে এমন বল্গাহীন স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, জুলাই বিপ্লবের শত্রুরাও এখন জুলাই বিপ্লব এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন। গত ৩০ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর মোতাবেক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের একাধিক রাজনৈতিক দল, জুলাই যোদ্ধা ও গণমাধ্যম কর্মীর বিরুদ্ধে লাগাম ছাড়া বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং জনগণকে না ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশ নিতে না দেয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন।
জিএম কাদেরের এসব বক্তব্যের প্রতিবাদে বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। জামায়াত নেতারা বলছেন, নির্বাচনের নামে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভোটের নামে নাটক করছেন জিএম কাদের। তাই তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জুলাইযোদ্ধাদের। ভিডিও জার্নালিস্টের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ডেমি বলেন, গত শনিবার জিএম কাদের প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন- যারা নাৎসি বাহিনীর সদস্য তারাই গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দিতে বলবে। গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে হবে। ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়া যাবে না। মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল হুদা বলেন, জিএম কাদের এখন প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং এতে রংপুরের শান্ত পরিবেশ যেকোনো সময় অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
দৈনিক ‘আমার দেশের’ ২৯ জানুয়ারি অনলাইন সংস্করণের রিপোর্ট মোতাবেক জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও রংপুর জেলা সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক আমার দেশকে বলেন, জিএম কাদের যা বলছেন তা ভেবেচিন্তেই বলছেন। তার বলার পেছনে অনেক যুক্তি রয়েছে। আমরা জিএম কাদেরের কথার বাইরে যেতে পারি না।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জিএম কাদেররা এবং বাংলাদেশের বাইরে ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশ ওকালতি করেনি। এর পরেও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে কোনো এ্যাকশন না নেয়ায় ইউনূস সরকার রাজনীতির ব্যাপারে ও জি এল বা ওপেন জেনারেল লাইসেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। ইন্টারিম সরকারের এ নির্লিপ্ততা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
গণভোট নিয়ে ইন্টারিম সরকারের কার্যকলাপকে তোঘলকি কারবার বললে ভুল বলা হবে না। জামায়াত সাধারণ নির্বাচনের দিন ছাড়া অন্য কোনো একটি দিনে গণভোট করতে চেয়েছিলো। কিন্তু সরকার জামায়াতসহ অন্যদের কথা শোনেনি। তারা শুনেছে বিএনপির কথা। এখন সারাদেশ বিএনপির নির্বাচনী লিফলেট ও পোস্টারে সয়লাব। ঢাকাসহ সারাদেশে শুধু ইলেকশনের আওয়াজ। গণভোটের ব্যাপারে বিএনপির কোনো বক্তব্য নেই।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান। গতকাল বুধবার রাতে নিজের ফেসবুকে এ পোস্ট করেন তিনি। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফেসবুক পোস্টে নাজিমুর রহমান লেখেন, ‘গণভোট প্রতারণার ফাঁদ, জোর করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি না ভোটের পক্ষে। গণতন্ত্র আর দেশের স্বার্থে আপনিও না ভোট দিন।’ যেকথাটি দলের সিনিয়র নেতারা মুখ ফুটে বলতে পারছেন না সেসব কথা তারা জুনিয়র লেভেল এবং জেলা পর্যায়ের নেতাদের মুখ থেকে বের করছেন। একটি কথা এখানে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলা দরকার। আর সেটা হলো, যদি হ্যাঁ ভোট পরাজিত হয় তাহলে বাংলাদেশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। ভারত চায় হ্যা ভোট পরাজিত হোক। আওয়ামী লীগ চায় হ্যা ভোট পরাজিত হোক। এখন বিএনপিও কি তাই চায়?
আমি একটু আগে বলেছি যে, গণভোট নিয়ে সরকারের মধ্যে তোঘলকি কারবার চলছে। তাই যদি না হবে তাহলে প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনূসের সপক্ষে পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টার মর্যাদা নিয়ে ড. আলী রিয়াজ কিভাবে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন? শুধুমাত্র আলী রিয়াজ নন, রেজওয়ানা চৌধুরীসহ আরো দু’-একজন উপদেষ্টা যেখানে হ্যা ভোটের পক্ষে কথা বলছেন সেখানে নির্বাচন কমিশন কিভাবে বলতে পারেন যে, গণভোটের পক্ষে সরকারী কর্মকর্তারা কথা বললে সেটি আইনত দণ্ডনীয় হবে? বরং সরকারের তরফ থেকে এর আগে একাধিকার বলা হয়েছে যে, গণভোটে হ্যা জয়যুক্ত না হলে সংস্কার ভেস্তে যাবে। জনগণও মনে করেন যে, হ্যা যদি পরাজিত হয়, তাহলে জুলাই বিপ্লব স্বয়ং পরাজিত হবে। জয়ী হবে ভারত, জয়ী হবে আওয়ামী লীগ এবং জয়ী হবে জাতীয় পার্টি। নির্বাচন কমিশন কোন পক্ষ নিয়ে খেলছেন? সেব্যাপারে তারা কি সচেতন আছেন?