জসিম উদ্দিন মনছুরি
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মধ্যপ্রাচ্য। বিগত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণে শাহাদাত বরণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও অন্যান্য সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সকালে মিটিং করার কথা থাকলে সেখানেই আক্রমণ করেন দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথবাহিনী। আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ বিপ্লবী গার্ডের প্রধান নিহত হয়েছেন। এরপর পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে জোরালো আক্রমণ শুরু হয়। ইরানের মুহুর্মুহু মিশাইলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে ইজরাইলের অভ্যন্তর। সেই সাথে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। বাহারাইনে অবস্থিত পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হামলা এবং কাতারের দোহায় অবস্থিত আমেরিকার নৌ ঘাঁটিতেও হামলা চালায় ইরান। ইরান একযোগে হামলা করে বাহারাইন,কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান, জর্দানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে। তাসনিম নিউজের বরাতে আইআরজিসি জানান,ইরানের পাল্টা “ট্রু প্রমিস ৪” অভিযানে গেল দুই দিনে ৬৫০ জনের বেশি মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। এই অভিযানে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় আইআরজিসি।৩ মার্চ আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েনি বলেন, বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি ও সামরিক সদরদপ্তরে হামলার পর ইরানের উপকূলীয় জলসীমা থেকে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।আইআরজিসির মুখপাত্র আরো জানান, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বারবার বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে আঘাত করেছে। এক দফা হামলায় দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হলে ১৬০ জন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয় বলেও তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি, মার্কিন নৌবাহিনীর এমএসটি কমব্যাট সাপোর্ট জাহাজটি ইরানি নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।নায়েনি আরও বলেন, ইরানি নৌবাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের চাবাহার উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে লক্ষ্য করে চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এসব হামলার পর এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারটি দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের দিকে পালিয়ে যায়।
এতদিন ধরে আরব রাষ্ট্রগুলি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে আসছিলো। এই ঘাটি ব্যবহার করে আমেরিকা বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। উল্লেখ্য যে , মধ্যপ্রাচ্যের ১০টিরও বেশি দেশে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, ওমান, সিরিয়া ও মিশরসহ আমেরিকার বিভিন্ন ধরনের সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি (পঞ্চম নৌবহর) অবস্থিত এবং কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিটি সবচেয়ে বড়।
ইরান পারমানবিক বোমা তৈরির ইউরেনিয়াম মজুদ করছে মর্মে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রিকরণে আমেরিকা ও ইসরাইল একযোগে হামলা করে। হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের শিশু, বেসামারিক নাগরিকসহ অন্তত ৭৮৭ জন শহিদ হয়েছেন। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এছাড়া হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, এই হামলায় ১৭৬ শিশুসহ অন্তত ৭৪২ জন বেসামরিক নাগরিক লোক নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের মিসাইল আক্রমনে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান ঘাঁটি গুলির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরান ঘোষণা করেছে যতদিন পর্যন্ত ইসরাইল নতি শিকার করবে না ততদিন পর্যন্ত ইরানিরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর মৃত্যুর প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানের মসজিদের মিম্বরে লাল পতাকা উত্তোলন করিয়ে ইরানিরা প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে ১২দিন ব্যাপী যুদ্ধে ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে ইরান। ইরানের মিসাইল আক্রমণে ব্যর্থ হয় ইসরাইলের অত্যাধুনিক আইরনডোম ও পেট্রিয়ট। ইসরাইলকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলে আসলেও এর ধারাবাহিকতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোররাতে আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা করে বসে। ইরানও তৎক্ষণাৎ হামলার জবাব দেয়। ইরান থেকে শত শত মিসাইল ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান ঘাঁটি গুলিতে আঘাত হানে। কল্পনাতীতভাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অন্তত ছয়টি দেশের নৌঘাটিতে আক্রমণ চালায়। ইরানের আক্রমণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায় এ পর্যন্ত আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রায় সাত শতাধিক সৈন্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি ইসরাইলিরা গোপন বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। ইরানের আক্রমণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেই আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর জেরে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। সরু সামুদ্রিক এ পথটি ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে যুক্ত করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেভাল মিশন এসপাইডেসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বলছে, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে আর কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’ উল্লেখ্য যে,হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবাহিত হয়।উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারীদের জন্য তেল রপ্তানির পথ হলো হরমুজ প্রণালী। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তেল পাঠায় সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ইরানে হামলার পর ইসরাইল দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ইসরাইল কাটজ একটি বিবৃতি জারি করে বলেছেন, “জননিরাপত্তা আইন, ৫৭১১-১৯৫১ এর ধারা ৯সি(বি)(১) অনুসারে আমার কর্তৃত্বে এবং বেসামরিক জনগণের উপর আক্রমণের উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পর, আমি এতদ্বারা দেশের সমগ্র ভূখণ্ড জুড়ে হোম ফ্রন্টে একটি বিশেষ অবস্থার ঘোষণা করছি।” ইসরাইল নিজেদের আকাশসীমাও বন্ধ করে দিয়েছে।নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে:বিদ্যালয়, কর্মস্থল ও জনসমাগমও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
২০২৫ সালের জুন মাসে সংগঠিত ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে দুই দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও দুই দেশই দাবি করেছে তাদেরই বিজয় হয়েছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন একদা বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে যে পক্ষই নিজেকে বিজয়ী দাবি করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে কেউই বিজয়ী না-সব পক্ষই পরাজিত।’ তার উক্তি অনুযায়ী বলা যায়, ইরান ও ইসরাইল উভয়ই এ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। বাস্তবতাও বলছে-দু’দেশের অনেক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এ যুদ্ধকে সর্বপ্রথম ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিটি যুদ্ধেরই সাধারণত একটি নাম দেওয়া হয়। এই যুদ্ধের নামটি দিলেন স্বয়ং ট্রাম্প। তিনিই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। এর মাধ্যমে মূলত যুদ্ধ থামানোর ‘ক্রেডিট’ বা কৃতিত্ব নিলেন স্বয়ং ট্রাম্প।
মাত্র ১২ দিনের ভয়াবহ এই সংঘাতে ইরান ও ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে বহু স্থাপনা ও সম্পদ নষ্ট হয়েছে। স্বজন হারিয়েছেন অনেক ইরানি ও ইসরাইলী নাগরিক। তেলআবিবের হামলায় যেমন তেহরানের দুই মাসের শিশুর জীবন গেছে, তেমনি ইরানের মিসাইলের ভয়ে হার্ট অ্যাটাকেও ৫১ বছরের এক ইসরাইলী নারী মারা গেছেন।যুদ্ধের সমীকরণ অনুযায়ী, পরাজিত শক্তিই মূলত ‘সাদা পতাকা প্রদর্শন’ করে আত্মসমর্পণ করে বা যুদ্ধবিরতি চায়। কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থাও তেমনই হয়েছে।ইসরাইলের প্রথম ধাপের হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ সেনাপ্রধান মোহাম্মদ বাঘেরি, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার জেনারেল হোসেইন সালামিসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি নিহত হন। ইসরাইলের হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। ১৪ ও ১৫ জুন তেলআবিব, হাইফা ও বাতয়ামে হামলা করে ইরান। এভাবে হামলা পাল্টা হামলা চলতে থাকে। দু’দেশের নিহতের সংখ্যাও ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। ২১ জুন শক্তিশালী বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ চালায় দেশটি। ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ‘চিরতরে নিঃশেষ’ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে ইরানের দাবি, ফর্দো থেকে তারা আগেই ইউরেনিয়ামসহ অন্যান্য পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতকারক দ্রব্য সরিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের তেমন একটা ক্ষতি হয়নি।
২০২৫ সালের জুন মাসের যুদ্ধে ইরানের অন্তত ৬১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪,৭৪৬ জন। এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা আরও জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১৩ জন শিশু, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি ছিল মাত্র দুই মাসের। নিহতদের তালিকায় ৪৯ জন নারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে দু’জন ছিলেন গর্ভবতী। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কেরমানপুর আরও জানান : ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। ৭টি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি জরুরি সেবা কেন্দ্র, ৪টি ক্লিনিক, ৯টি অ্যাম্বুলেন্স।
১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামিক বিপ্লব ঘটে ইরানে। আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে, পতন হয় পাহলভি রাজবংশের শেষ শাসক মোহাম্মাদ রেজা শাহ পাবলভীর। ইরানে প্রতিষ্ঠা হয় জনগণের অংশগ্রহণে ইসলামি সরকার ব্যবস্থা। ইরানি প্রজাতন্ত্রের সর্বশেষ রেজা পাহলবিকে পরাজিত করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান গঠিত হয়। রেজা শাহ ছিলেন একজন সেক্যুলার ব্যক্তি। ক্ষমতায় বসে তিনি বিদেশী শাসক বিশেষ করে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরাইলকে খুশি করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এর কারণ মূলত তাদের কৃপায় তিনি নিজ পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। দেশ শাসনের যোগ্যতা না যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল পরাশক্তির আনুকূল্য। ফলে দেশের মানুষেরর সুবিধা-অসুবিধাগুলো নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। নিজের গদি ঠিক রেখে যা খুশি তাই করার চিন্তাই ছিল প্রখর। এ কারণে ধীরে ধীরে তিনি জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন বিশেষ করে ইরানের শিয়া আলেমদের কাছ থেকে তিনি একেবারেই ছিটকে পড়েন। এছাড়া, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষও তাকে পছন্দ করতেন না। তার বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। দুর্নীতিতে তার আশপাশের লোকজন জড়িত ছিলেন; জড়িত ছিলেন তার পরিবারের লোকজন। প্রশাসনের এলিটরাও একইভাবে দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। ফলে তার সরকার ইসলামি গণবিপ্লব সফল হওয়ার বেশ আগেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল। এছাড়া রাজনৈতিক কিছু কর্মকাণ্ড যেমন কমিউনিস্ট ‘তুদেহ পার্টি’কে নিষিদ্ধ করা, ইসরাইলের সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিরোধী রাজনীতিকদেরকে গুপ্ত পুলিশ বাহিনী সাভাক দিয়ে নির্যাতন তার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি হিসাব মতে ১৯৭৮ সালে ইরানে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা ছিল ২,২০০ এর মতো, কিন্তু গণবিপ্লবের সময় সেই সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে ১৯৭৯ সালে দেশে গণ-অশান্তি বিপ্লবে রূপ নেয় এবং চূড়ান্তভাবে রেজা শাহের পতন ঘটে। ১১ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সফল হওয়ার আগে ১৭ জানুয়ারি তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। এরপর ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান গঠিত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হন আয়তুল্লা রুহুল্লা খোমেনী। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান গঠিত হওয়ার পর পশ্চিমাদের ইরানের উপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। এমন কি বিগত কয়েক মাসে ইরানি মুদ্রার ব্যাপকদর দরপতন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি জীবন যাত্রার মান নিম্নমুখী হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়। কথিত আছে বিদ্রোহের দাবানল সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। এমনকি নির্বাসিত যুবরাজ পেহলবী ছিল বিদ্রোহের ইন্দনদাতা।
নবী করিম (সা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে সাহাবিদের পদচারণা, পারস্যের বিজয়, ইসলাম গ্রহণ, ইসলামি জ্ঞানের বিকাশ, আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সুফিবাদ ও কাব্যধারার বিকশিত ধারা, সবকিছু মিলে ইরানকে বলা যায় ইসলামের ইতিহাসের এক মহিমান্বিত অধ্যায়। বিশ্বে ইসলামের যে বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডার, তা গঠনে ইরানের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। হাদিস, ফিকহ, দর্শন, সাহিত্য, স্থাপত্য, ক্যালিগ্রাফি, প্রতিটি শাখায় পারস্যভূমি তার দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছে। শুধু তাই নয়, ইসলামি সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইরানি আলেম, কবি, দার্শনিক ও শিল্পীরা অসামান্য অবদান রেখেছেন। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম গাজালি, রুমি, সাদির পদচারণা ছিল ইরানের ভূমিতে। ইরানের অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে ইরান বিশ্ব মুসলিম সমাজে তৈরি করেছিল এক গর্বিত অবস্থান।
ইরানে ইসলামের বিজয়ের সূচনা হয় ৬৩৭-৬৫১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এই সময়ে আরব বাহিনী পারস্য জয় করে। ৬৫১ সালে সাসানীয় সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং ইসলাম একটি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
প্রাথমিকভাবে শহরের অভিজাতরা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করলেও, গ্রামের মানুষেরা দীর্ঘকাল ধরে ধীরে ধীরে মুসলিম হয়, যা একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ শুরু হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে (৭ম-১৫শ শতাব্দী) ইরান মূলত সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী ছিল। ১৫০১ সালে সাফাভি রাজবংশের সময় শিয়া ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষিত হয়, যা ইরানের ধর্মীয় ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন এনেছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান বর্তমান ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
ইসলামের সূচনালগ্নে পারস্য (বর্তমান ইরান) ছিল একটি বিশাল সাম্রাজ্য। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর খেলাফতের সময় পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল মুসলিম বাহিনী দ্বারা বিজিত হয়।
ইরানি দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি তারা কখনো মহা শক্তির কাছে মাথা নত করেনি। পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতায় গড়ে ওঠা পারাস্য সম্রাজ্য আঞ্চলিক অখণ্ডতার দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্য ছিল। বিগত এক হাজার বছর ধরে পারস্য জাতিকে কেউ শাসন করতে পারেনি। এবার দেখার বিষয় তারা কতটুকু সাহসিকতা নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে কিভাবে মোকাবেলা করতে পারে। আশা করি এ যাত্রায়ও ইরানি বাহিনী তাদের সাহসিকতা ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দিয়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিবে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আলী রেজা।ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদে জুরিস্ট বা আইনজ্ঞ পদে আলিরেজা আরাফি নির্বাচিত হয়েছেন। আশা করা যায় আলিরেজা আরাফি খামেনীর অসমাপ্ত কাজ সাফল্যের সহিত সমাপ্ত করতে পারবেন।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।