॥ ড. মো. মিজানুর রহমান ॥
বাংলাদেশে ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতি’- এ দুইয়ের সংমিশ্রণ বহন করে এক দীর্ঘ, জটিল ও গতিময় ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন রাষ্ট্রের সূচনা এবং পরবর্তী সংস্কার ও পরিবর্তনের ধারায় ধর্ম ও রাজনীতি কখনো একত্রিত হয়েছে, কখনো বিভক্ত। তবুও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক স্বার্থ যদি একসাথে মিলিত হয়, রাজনীতিতে ধর্মের প্রকৃত অর্থ কী হবে, নাকি এটি শুধুই একটি হাতিয়ার হয়ে যাবে- এ প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে বিশ্লেষণ করা হলো। এছাড়া ইসলামিক আদর্শ ও ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী রাজনৈতিক শাসন ও সমাজ-ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সেই বিষয়গুলোও আলোকপাত করা হয়েছে।
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ইবাদত নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে আইন, ন্যায়, নৈতিকতা, সামাজিক বিচার, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় শাসন। কুরআন ও সুন্নাহ মুসলিম সমাজকে এমনভাবে জীবনযাপনের নির্দেশ দেয় যেখানে ন্যায়, যুক্তি পরামর্শ (শূরা), মানুষের মর্যাদা, দান ও দারিদ্র্য বিমোচন, বিচার এবং দায়বদ্ধতার মূল্য সংরক্ষিত থাকে। এ নীতি অনুসারে, প্রথম মুসলিম যুগে, বিশেষ করে রাশিদুন খলিফাদের শাসনকালে, এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা প্রতিমূর্তির উপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং এটি সামাজিক ন্যায়, প্রশাসনিক সততা এবং জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। ঐতিহাসিকভাবে, দলীয় রাজনৈতিক কাঠামো বা ভোট-নির্বাচন না থাকলেও শাসন ধর্মীয় বিশ্বাস ও ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো। অর্থাৎ, শাসনাধিকার আল্লাহা-নির্ধারিত এবং শাসনকারীদের দায়িত্ব ছিল জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ইসলামিক রাজনীতি কেবল ধর্মীয় বক্তৃতা নয়; এটি ছিল নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র, বিচার, আইন ও জনগণ একসঙ্গে পরিচালিত হতো।
ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ এবং খেলাফতে রাশেদীনদের জীবনাদর্শ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ধর্মে রাজনীতি রয়েছেÑকারণ আল্লাহ তাআলা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, ন্যায়বিচার, শাসন, আইন, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক দায়িত্বও মুসলমানদের ওপর আরোপ করেছেন; আর রাসুল (সা.) নিজে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন এবং চার খলিফা সেই সুন্নাহ অনুসরণ করে রাজনৈতিক-রাষ্ট্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। অতএব কেউ যদি বলে ‘ধর্মে রাজনীতি নেই’, তা সাধারণত হয় ব্যক্তিগত স্বার্থ, আধিপত্য রক্ষা বা ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনৈতিক সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যেই বলা হয়। আর যারা মুখে বলে ধর্মে রাজনীতি নেই, কিন্তু ভোট, সমর্থন বা ক্ষমতার প্রয়োজনে ধর্মীয় ভাষা, অনুভূতি বা পরিচয়কে ব্যবহার করে—তাদের এ আচরণ নিঃসন্দেহে মুনাফিকির লক্ষণ; কারণ তারা বিশ্বাসে এক কথা বলে, কাজে আরেকটি করে এবং ধর্মকে সত্যের জন্য নয়, কেবল নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিভাষা, নীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বদলে গেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে চারটি মূল নীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল: জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থাৎ, নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময় ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়নি, বরং ন্যায়, জাতি, ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে, ১৯৭৫ সালের পর সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ১৯৭৭ সালে সেক্যুলারিজম বাদ দেয়া হয় এবং ১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানে স্থান দেয়া হয়। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চার মূল নীতির পুনঃউল্লেখ করা হলেও, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখার ধারা অক্ষুণœ থাকে।
এ দ্বিমাত্রিক কাঠামো- আইনত সেকুলার নীতি গ্রহণ এবং একই সাথে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি- রাজনৈতিক দল, সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের উৎস হিসেবে দেখা দেয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দেখলে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণভাবে ধর্মের শক্তি ব্যবহার করে, এবং অন্যদিকে সেকুলার বা জাতীয়তাবাদী দলও ভোটে টিকে থাকার জন্য ধর্মীয় প্রতীক ও আবেগ কাজে লাগায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ধর্ম ও রাজনীতির ধরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ইসলামিক দল এবং গোষ্ঠী, যারা স্পষ্টভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দাবি করে, তারা জনমত তৈরি, সামাজিক কাজ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সক্রিয় হচ্ছে। তবে প্রায়ই এ কার্যক্রম নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ইমেজ বা ভোট প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রাজনীতিতে ধর্মকে শুধুমাত্র প্রতীক, ইমেজ বা ভোটভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ঝুঁকি দেখা দেয়। প্রথমত, ধর্মীয় আবেগ এবং বিশ্বাসকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করলে ধর্মের আসল সারমর্ম বিকৃত হতে পারে। ধর্ম হয়ে যায় পোষ্টার, ইমেজ বা অস্ত্র; আর শাসন, ন্যায়, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক কল্যাণ পিছিয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করলে সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিভাজন, উগ্রবাদ বা বৈষম্যের সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ ভোট বা ক্ষমতার জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগালে গোষ্ঠীগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক কৌশল ধর্মীয় সংঘর্ষের দিকে ধাবিত হতে পারে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং নাগরিক আস্থা পৃথক হয়ে যেতে পারে। যদি রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিরা ধর্মীয় ভিশন বা মূল্যবোধের নামে কেবল ভোট বা ক্ষমতা অর্জন করে, কিন্তু ন্যায়, দায়িত্ব, সামাজিক কল্যাণ ও জবাবদিহিতা উপেক্ষা করে, তাহলে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যদি কেবল ইমেজ নয়, আদর্শ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়- তাহলে এটি বাংলাদেশে একটি দায়িত্বশীল, ন্যায়সংগত ও সমাজকল্যাণমুখী পথ হতে পারে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে, ইসলামের ন্যায় বিচার, দারিদ্র্যবিমোচন, দাতব্য কর্ম, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু অধিকারকে ধর্মীয় নৈতিকতার ভিত্তিতে গ্রহণ করলে রাজনৈতিক সাংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হতে পারে। ন্যায্য বিচার, জবাবদিহিতা, সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের মর্যাদাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হলে, সেটি প্রকৃত অর্থে উন্নয়নমুখী, ন্যায্য এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংগত হবে। বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক দল, জোট ও পরিবর্তনের হাওয়া আসছে। যদি এটি শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই না হয়ে দায়িত্ব, ন্যায্যতা, মানুষের কল্যাণ ও জাতির উন্নয়নের উদ্দেশ্য নিয়ে হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন দিগন্ত খুলবে।
সম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক প্রবণতা দেখায় যে ধর্ম, জাতীয়তা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। এখানে চারটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা যায়। প্রথম, ইসলামিক আদর্শের ভিত্তিতে ন্যায্য রাজনীতি, যেখানে ইসলামিক দলগুলো কেবল ধর্মীয় ইমেজ নয়, বরং কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্য গ্রহণ করে। শাসনব্যবস্থা হবে ন্যায়, দারিদ্র্য বিমোচন, সংখ্যালঘু ও গরীবের অধিকার, সামাজিক কল্যাণ, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয়, ধর্মের ব্যবহার, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ভোট সংগ্রহ, জনমত ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য ধর্ম ব্যবহার করে। এতে সাময়িক রাজনৈতিক লাভ হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় বিশ্বাসের অপব্যবহার ও সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি থাকে। তৃতীয়, হাইব্রিড বা মিশ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ইসলামিক আদর্শ, সেকুলার নীতি, জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা মিলিত। চতুর্থ, সম্পূর্ণ সেকুলার বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, যেখানে ধর্ম রাজনৈতিক প্রভাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয় না এবং সব প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসারে পরিচালিত হয়।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশে জন্মসুত্রে নব্বই ভাগ মুসলমান হলেও ধর্মীয় বিধি বিধান অনুসরণ করা মুসলমানের সংখ্যা অনেক কম। তা ছাড়া ১০ ভাগ অমুসলিম রয়েছে। সুতরাং পুরাপুরি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা বা রাষ্ট্র চালানো শুরুতেই অনেক কঠিন হবে। আল্লাহ তাঁর বিধান শুরুতেই সরাসরি তাঁর বান্দাদের উপর একবারে চাপিয়ে না দিয়ে ধীরে ধীরে নাজিল করেছেন; যেমন সুদ এবং মদ পান ইত্যাদি নিষিদ্ধ করার পদ্ধতি তাঁর প্রমান। সুতরাং বাংলাদেশেও সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হবে একটি হাইব্রিড রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রশাসন, আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো আধুনিক থাকবে; সামাজিক ন্যায়, দারিদ্র্য বিমোচন, সংখ্যালঘু অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা ইসলামী নৈতিকতা ও ন্যায় চেতনা গুরুত্ব পাবে; এবং ধর্মীয় প্রতীক বা ইমেজ কেবল ভোট বা ক্ষমতার হাতিয়ার নয়, বরং রাজনৈতিক আদর্শ, ন্যায্যতা ও মানুষের কল্যাণের অংশ হবে; এক কথায় কল্যাণ রাষ্ট্রের আদলে রাজনীতি ও রাষ্ট্রনিতি পরিচালনা করাই হবে সবচেয়ে ভাল এবং গ্রহণযোগ্য। এভাবে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করে একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাংবিধানিক গঠন ধর্ম ও রাজনীতির জটিল এক মেলবন্ধন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধর্মের ব্যবহার উভয়ই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ধর্মকে রাজনৈতিক কৌশল, ভোট বা ইমেজ হিসেবে ব্যবহার করা হবে, নাকি ধর্মের ন্যায়, নৈতিকতা ও মানুষের কল্যাণের মূল্যবোধকে বাস্তব রাজনীতির ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কেবল ধর্মীয় প্রতীক নয়; এটি এমন রাজনীতি যা ন্যায়, দায়িত্ব, সামাজিক সমতা, সংখ্যালঘু ও গরীবদের অধিকার এবং মানুষের মর্যাদা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যদি বাংলাদেশ এ পথ গ্রহণ করতে পারে, তবে ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ একসঙ্গে সমন্বিত হয়ে দেশকে একটি অভূতপূর্ব উন্নয়ন, ন্যায় ও শান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, ধর্মকে শুধুমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে রাজনীতি হবে স্বার্থ, ইমেজ ও বিভাজনের লড়াই; ধর্ম, সমাজ ও মানুষের বিশ্বাস সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট