‘রাষ্ট্র’ বলতে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমষ্টিকে বোঝায়। যেখানে একটি সংগঠিত সরকার থাকে এবং নাগরিকরা সে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। রাষ্ট্রও জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উড্রো উইলসন রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়ে বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমূহকে রাষ্ট্র বলে’। সঙ্গত কারণেই নাগরিক যেমন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে; তেমনিভাবে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তাসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্ক খুবই নিবিড় কিন্তু শর্তহীন নয় বরং পারস্পরিক স্বার্থের বৃত্তে আবদ্ধ। তাই রাষ্ট্র ও নাগরিককে আলাদা করার কোন সুযোগ নেই।
নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রশ্ন দেশে নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে প্রশ্নটা আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে। বিশেষ করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছিলো। সে সময় দেশে আইনের শাসন বলতে কিছুই ছিলো না। ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিতেতেই চলেছে সবকিছু। মূলত, শাসকগোষ্ঠীর অবৈধ ক্ষমতালিপ্সা ও সুশাসনের অনুপস্থিতিই আমাদের এ অধঃপতনের জন্য মূলত দায়ি। রাষ্ট্রের এমন কোন সেক্টর ছিলো না যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, লুটপাট, আত্মপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত ছিলো। একই সাথে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছিলো নানাবিধ অপরাধ প্রবণতাও। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর মনে করা হয়েছিলো যে, অতীতের সে অবস্থা থেকে দেশ ও জাতি মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা কিছুটা হলেও আশাহতই হয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ের অপরাধ বিষয়ক বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে আমাদের সামনে সে চিত্রই ফুটে উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশ জুড়ে খুন, অপহরণ, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধের ঘটনা গত পাঁচ বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের বরাতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ডেইলী স্টারে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৯৪টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ২৩১টি। এর আগের চার বছরের একই মাসে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২১৪, ২৬৪, ২৫৭ ও ২৭৩টি। চলতি বছরের শুরুতেই ডাকাতির মামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১টিতে, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ১১৪টি। অপহরণের মামলাও চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিগুণ বেড়েছে। গত ছয় বছরের মাসিক অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও আগের পাঁচ বছরের একই মাসের তুলনায় ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা বেড়েছে।
দেশে নারী নির্যাতনও চলছে অতীত বৃত্তেই। পরিসংখ্যান মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক অপরাধের ঘটনা গত বছর যা ছিল, এবার প্রথম ছয় মাসেই সে সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়েও গেছে। যেমন এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের ঘটনা সংখ্যাগত দিক দিয়ে গত বছরের প্রায় সমান। আবার যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণ, বাল্যবিবাহ এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা গত বছরের চেয়ে এখনই বেশি। সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন সমীক্ষা’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি ১৪ আগস্ট বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে।
মহিলা পরিষদ দাবি করেছে, ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সমীক্ষা প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশু এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী নারী-এভাবে বয়সভিত্তিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এ সমীক্ষায় ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, গৃহকর্মী নির্যাতন ও সাইবার অপরাধ-এ আট অপরাধকে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংখ্যার ভিত্তিতে মোট নির্যাতনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯৩৭টি, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৫২৫টি এবং চলতি বছরের ৬ মাসে ১ হাজার ৫৫৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
সমীক্ষায় বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করে বলা হয়, চলতি বছরের ছয় মাসে সাইবার অপরাধ এবং গৃহকর্মী নির্যাতনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও অন্যগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুরা ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহের মতো নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছে বলে সমীক্ষার তথ্য বলছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাই বেশির ভাগ অপরাধ করছেন। সমীক্ষায় আরো বলা হয়, ২০২৪ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৬৪ জন ধর্ষণের শিকার, এর মধ্যে ২২০ জন কন্যা ও ১৪৪ জন নারী। ১৪৮ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, যার মধ্যে ৪৯ জন কন্যা ও ৯৯ জন নারী। ১৩৪ জন কন্যা ও ৭৭ জন নারী ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার ২২৪ জনের মধ্যে ১২৫ জন কন্যা। যৌতুকের শিকার ৬৬ জন নারী ও ২ কন্যাশিশু। গৃহকর্মী নির্যাতনের মধ্যে ১৬ জন কন্যা ও ৮ জন নারী এবং সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন ২৬ জন কন্যা ও ৩ জন নারী। প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ২৮ শতাংশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স ১১ থেকে ৩০ বছর, এর মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীর সংখ্যা বেশি। সাইবার অপরাধের ২৯টি ঘটনার মধ্যে ১৪টি ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সের। ২৪ শতাংশ শিক্ষক এবং ৩১ শতাংশ চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও বখাটে নারী ও মেয়ে শিশুদের উত্ত্যক্ত করেছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ অভিযুক্ত ব্যক্তিই থাকে ভুক্তভোগীর অপরিচিত। সমীক্ষা বলছে, ঘটনা ঘটার পর মামলা করার প্রবণতা বেড়েছে। ধর্ষণের পর ৬২ শতাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হচ্ছে।
একথা ঠিক যে, দেশে নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা অনেকটাই বেড়েছে। সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কম বয়সীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আবার অভিযুক্তদের বয়সও কম। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে, একই অপরাধী বারবার অপরাধ করতেই থাকে। এর পেছনে অপরাধীদের রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীনদের মদদ দেওয়ার বিষয়টি সম্পৃক্ত। ক্ষমতাসীনদেরও অনেকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মতে, নারী নির্যাতনের মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সমাজে সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ঘরে-বাইরে শিশুরা অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ হয়েছে মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে। যা খুবই কাক্সিক্ষত ও যৌক্তিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বস্তুত, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হলেও সে ক্ষেত্রে তারাও ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাপকভাবে। একশ্রেণির অসৎপ্রবণ সদস্যের কারণেই গোটা বাহিনীই এখন ইমেজ সংকটে পড়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অতীতের চেয়ে খারাপ পর্যায়ে। সঙ্গত কারণেই ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের ঘটনায় জনমনে যেমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে; ঠিক তেমনিভাবে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিও মহামারির রূপ নিয়েছে। এখনকি খোদ রাজধানীতেও বেড়েছে অপরাধ প্রবণতা। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজী ও মাদক চোরাচালান সহ সকল অপরাধই সংঘঠিত হচ্ছে ঢাকা নগরীতে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর কোন কুলকিনারা করতে পারছে না। একশ্রেণির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও এসব অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর অনেক এলাকা থেকে কিশোর অপরাধীদের সম্পর্কে ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে মাদক সেবন চলছে। কোনো কোনো এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই সহিংস ঘটনা ঘটছে। যা দেশের ক্রম অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
মূলত, গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর এক বছর অতিক্রান্ত হলেও অপরাধ কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার বরং কিছুটা হলেও পুরনো বৃত্তেই রয়ে গেছে। ক্ষেত্র বিশেষ উন্নতি হলেও তা মোটেই সন্তোষজক বলার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করতে পারছে না-সে প্রশ্ন গত কিছুদিন ধরেই আলোচনায় আসছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করে দাবি করা হয়েছে যে ‘চলতি বছর বড় ধরনের অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বেড়েছে-এ দাবি সঠিক নয়। এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা স্থিতিশীল আছে’। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা অবশ্য বিবিসির কাছে স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে পুরোপুরি সক্ষম করে তোলার জন্য তারা এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ‘ডেভিল হান্ট’ কিংবা ‘চিরুনি অভিযান’-এর মতো কর্মসূচির কথা সরকার বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হলেও সেগুলো কতটা কাজে এসেছে তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অথচ গত এক বছর ধরেই দেশজুড়ে সেনাবাহিনীও মোতায়েন রাখা হয়েছে।
তবে এতোদিন চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলো নিয়ে এক ধরনের ‘দেখেও এড়িয়ে যাওয়া’ বা ‘দেখেও না দেখার ভান’ করার অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি গুলশানে একজন সাবেক এমপির বাড়ি থেকে সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদা আদায়ের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের ঘটনাকে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ‘প্রথমবারের মতো পুলিশের কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ’ হিসেবে অনেকে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারা, কিছু ঘটনায় কর্তৃপক্ষের মৌন থাকা, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর প্রতি ভয় কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের মধ্যেই আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়নি।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়েছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশ এখন সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে এবং এর ফলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। ‘অপরাধমূলক কোনো ঘটনাই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এটি নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে যা যা করণীয় সেটিই এখন করা হচ্ছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এমন দাবির সাথে একমত হতে পারছেন না দেশের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। তারা মনে করছেন দেশের অপরাধ প্রবণতা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই।
তাদের এ দাবির সত্যতা মেলে দেশে সিরিজ অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে। কারণ, গত কয়েক দিনে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে দেশে। কেপিআইভুক্ত ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিনটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও সন্দেহ তৈরি করেছে। সর্বশেষ গত শনিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ আগুন লাগে। এর আগে মিরপুরের রূপনগর ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি কারখানায় আগুনের ঘটনা ঘটে। যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতির কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
এসব ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা এ প্রশ্ন এখন দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞদের মাঝেও ঘুরপাক খাচ্ছে। অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে নাশকতামূলক আগুন শনাক্ত করার মতো সক্ষমতা নেই। ফলে বড়-ছোট সব আগুনকেই দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা একটি বড় দুর্বলতা। তারা বলছেন, এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন না করলে তা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের পক্ষে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় নাশকতার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হলেও সাম্প্রতিক ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অস্থির পরিবেশের মধ্যে কেউ কী পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটাচ্ছে এ প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা দরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে দেশে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয় বরং এসব ঘটনাকে নাশকতা হিসাবে বিবেচনার নানা অনুষঙ্গ বিদ্যমান রয়েছে। তাই এসব বিষয়ে জরুরি তদন্তের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। উদ্দেশ্য জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা সহ নাগরিক জীবনকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে গড়ে তোলা। মূলত দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু দেশে যেভাবে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে তাতে রাষ্ট্রের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
মূলত, গণমানুষের কল্যাণকামীতার ধারণা থেকেই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। তাই অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ সহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে জনগণের জনগণের জানমাল ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা সহ সকল সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ম্যাক্স ওয়েবারের প্রভাব বিস্তারকারী সংজ্ঞানুযায়ী রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আইনানুগ বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখে, এসবের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্রবাহিনী, নাগরিক, সমাজ, আমলাতন্ত্র, আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রয়োজনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে জনমনে স্বস্তি ফিরে আনতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কিছুকেই একযোগে ব্যবহার করতে হবে। কোন অজুহাতেই রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারে না। এক্ষেত্রে গণসচেতনতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার মত নয়।