কত জাগরণের কথা শুনিয়েছিল ইউরোপীয় রেনেসাঁ, সেই ১৪শ’ শতাব্দী থেকে। এরপর আমরা শিল্পবিপ্লব দেখলাম, যার আসল রূপটি ছিল Pursuit of matarialism. শিল্পবিপ্লব মানুষকে অর্থের পেছনে ছুটতে প্ররোচিত করেছে, টাকার পেছনে মানুষ ছুটেছে পাগলের মতো। এখানে নীতি-নৈতিকতা কিংবা কোনো মানবিক দর্শন কাজ করেনি। শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিকাশ ঘটলো। শাসকরা নিজেদের বেশ প্রগতিশীল ও ক্ষমতাবান মনে করলো, মহান প্রভুকে ভুলে নিজেরাই প্রভু হয়ে উঠলো। এইসব ক্ষুদ্র প্রভুরা যা ইচ্ছে তাই করতে শুরু করলো। ফলে মানুষ দেখলো প্রথম বিশ^যুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮ইং) এবং দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫)। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা তো খুবই স্পষ্ট বিষয়। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর দাম্ভিক শাসকরাই প্রতিষ্ঠা করলো জাতিসংঘ, যেন আর যুদ্ধ না হয়। এ যেন এক আন্তর্জাতিক প্রহসন। যারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই এই সংস্থাকে অকার্যকর করে তুললো। ফলে যুদ্ধের বীজ বপিত হলো, শাখা-প্রশাখায় যুদ্ধবৃক্ষ পল্লবিত হলো। তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের এক আশংকার মধ্যে এখন বসবাসবিশ^াসীর।
আসলে ইউরোপীয় রেনেসাঁর মধ্যেই এই সংকটের বীজ বপিত হয়েছিল। সে সময় রাজা, ধর্মজাযক ও অভিজাত শ্রেণী মিলে ইউরোপে যে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল; তা শুধু অমানবিক ছিল না, ছিল ধর্মবিরোধীও। এমন শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল ন্যায়সঙ্গত। মুক্ত মানুষকে দাস বানানোর অপশাসন তো ‘শাসন’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু বিদ্রোহ করতে গিয়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর নেতারা একটি বড় ভুল করে ফেলেছিলেন। ধর্মের নামে যারা অপশাসন চালিয়েছিলেন, তাদের উৎখাত করতে গিয়ে জাগরণের নেতারা সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকেও অপসারণ করতে চাইলেন। প্রশ্ন হলো, ধর্ম তথা বাইবেলে কি অমন অপশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা ছিলো? আসলে প্রয়োজন ছিল ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। রেনেসাঁর নেতারা যেন মাথা ব্যথা সারাতে গিয়ে মাথাটাই কেটে ফেলতে চাইলেন। এর ফলাফল যা হবার তাই হলো। যে মহান প্রভু পৃথিবীকে মানববান্ধব করে সৃষ্টি করলেন, মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের বিধান দিলেন; তাঁকেই যখন অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখানো হয়, তখন তো সমাজ ও রাষ্ট্রে ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তা-ই হয়েছে। মহান প্রভুর জায়গা দখল করেছে ক্ষুদ্র ভাবনার ক্ষুদ্র প্রভুরা। তাদের বিধান ও শাসনে শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ হয়নি; তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের আশংকার মধ্যে এখন মানুষ জীবনযাপন করছে। স্বাভাবিক ও মানবিক জীবনযাপন থেকে মানুষ এখন বঞ্চিত।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ, শিল্পবিপ্লব এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এখন পাশ্চাত্য সভ্যতার ঝা-া হাতে যিনি পৃথিবী শাসন করতে চাইছেন, তিনি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাথে বরকন্দাজ হিসেবে রয়েছেন ইসরাইলি প্রধামন্ত্রী নেতানিয়াহু। এবার ইরানে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে গেছে। যত দ্রুত যুদ্ধে জয়ী হবেন বলে ভেবেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু, তা কিন্তু ঘটেনি। ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ভালোভাবেই। সোমবারও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে আগ্রাসনকারীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা বলেছেন, হামলার মুখে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবেন তারা। এদিকে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোয় ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। পাশাপাশি লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে তারা। তবে ইসরাইলও স্বস্তিতে নেইা। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরাইলে রকেট হামলা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেন থেকে ইরান সমর্থিত হুতিরা প্রথমবারের মতো ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। একমাস আগে যুদ্ধের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনা অবস্থানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছিল ইরান। তবে সময়ের সাথে সাথে জ¦ালানি ক্ষেত্রের মতো বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যুদ্ধের পরিসরও বেড়েছে। এখন তো পানিশোধনাগাড়েও হামলা হচ্ছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ফলে জ¦ালনি তেলের দাম বেড়েছে, এর চাপ পড়েছে অর্থনীতিতে। ফলে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক উদ্যোগও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার ইসলামাবাদে বৈঠক করেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি আলোচনায় বসানো তাদের লক্ষ্য। তবে এ লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে তা নিশ্চিত নয়। কারণ, আলোচনা উদ্যোাগের মধ্যেই ইরানে আমেরিকার স্থল হামলার পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে। আসলে বর্তমান সেক্যুলার সভ্যতায় আস্থার সংকট বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির জ¦ালানি তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান তিনি। ইরানের তেল রফতানির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ দখল করতে চান ট্রাম্প। অথচ ট্রাম্প এতদিন এই যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো এবং সরকার পতনের কথা বলে আসছিলেন। উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এরপর ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ দেন ট্রাম্প। এবার ইরানের তেলসম্পদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লালসার কথা জানালেন তিনি। গত রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প একথা বলেন। এই লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্র যে অগ্রসর হতে পারে তেমন আলামতও পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিতিরক্ত হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন। এমন বাস্তবতায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের এই যে আগ্রাসনমূলক তৎপরতা, তা কীভাবে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশে^র জনগণ? মানুষ ট্রাম্পের মাস্তানি ও দস্যুতাকে পছন্দ করছে না, বরং বিরক্ত। ওয়াশিংটন থেকে রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তার প্রতি জনসমর্থন সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে গেছে। জ¦ালানিপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে মানুষের মনে অসন্তুষ্টি এর মূল কারণ। চারদিন ধরে চালানো একটি জরিপ শেষ হয়েছে গত সোমবার। এতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের বর্তমান কর্মকা-ে সন্তুষ্ট। গত সপ্তাহেও এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। আমেরিকাজুড়ে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ থেকেও উপলব্ধি করা যায় মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কতটা ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের মতো কোনো রাজাকে মার্কিন জনগণ আর চায় না। শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক, লসঅ্যাঞ্জেলসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে লাখ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। আমেরিকার ৫০টি রাজ্যে বিক্ষোভের অংশ হিসেবে তিন হাজার তিনশ’টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে কমপক্ষে ৮০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এমন বিপুল বিক্ষোভে উপলব্ধি করা যায়, মানুষ পাশ্চাত্য সভ্যতার ঝা-াবাহী দাম্ভিক শাসক ট্রাম্পকে আর চান না। ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি আজ এমন কেন? আসল প্রভুকে অস্বীক্রা করে মানুষ নিজে যখন প্রভু হতে চায়, তখন সে আসলে দানব হয়ে ওঠে। দানবের পাতন তো অনস্বীকার্য।