জাফর আহমাদ

নবী (সা.) মুনাফিকের কিছু লক্ষণের কথা তাঁর পবিত্র বাণীতে উল্লেখ করেছেন। মানুষ মুনাফিকের এই পরিচয়ই বেশি জানে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। এক, আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; দুই, কথা বললে মিথ্যা বলে; তিন, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; চার, বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। (বুখারী : ৩৪, ২৪৫৯, ৩১৭৮, কিতাবুল ঈমান, বাবু আলামাতে মুনাফিক, মুসলিম : ৫৮, আহমাদ : ৬৭৮২, আ.প্র:৩৩, ইফা : ৩৩) কিন্তু আল কুরআনে মুনাফিকের একটি বিশেষ পরিচয় প্রদান করা হয়েছে। অবশ্য আল কুরআনের পরিচয় এবং রাসুল (সা.) এর প্রদানকৃত চারটি আলামতের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, এসো সেই জিনিসের দিকে, যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন এবং এসো রাসুলের দিকে, তখন তোমরা দেখতে পাও ঐ মুনাফিকরা তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।” (সুরা নিসা : ৬১) এই আয়াতটি ধারাবাহিক আলোচনা পূর্ববর্তী আয়াত থেকে শুরু হয়েছে, তাই অত্র সুরার ৫৯.৬০ ভালোভাবে বুঝতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে নবী! তুমি তাদেরকে দেখনি, যারা এই মর্মে দাবি করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য ‘তাগুত’ এর দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়।” (সুরা নিসা : ৬০)

তাগুত বলতে সুস্পষ্টভাবে এমন শাসককে বুঝানো হয়েছে আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোন আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে এবং এমন বিচার ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার আনুগত্য করে না এবং আল্লাহর কিতাবকে চূড়ান্ত সনদ হিসেবে স্বীকৃতিও দেয় না। কাজেই যে আদালত তাগুতের ভূমিকা পালন করছে, নিজের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালার জন্য তার কাছে উপস্থিত হওয়া যে একটি ঈমান বিরোধী কাজ এ ব্যাপারে আয়াতটির বক্তব্য একেবারেই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। আর আল্লাহ ও তাঁর কিতাবের ওপর ঈমান আনার অপরিহার্য দাবি অনুযায়ী এ ধরনের আদালতকে বৈধ আদালত হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানানোই প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য। কুরআনের দুষ্টিতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা, এ দু’টি বিষয় পরস্পরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সংযুক্ত এবং এদের একটি অন্যটির অনিবার্য পরিণতি। আল্লাহ ও তাগুত উভয়ের সামনে একই সাথে মাথা নত করাই হচ্ছে সুস্পষ্ট মুনাফেকী।

মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পরের দোসর। খারাপ কাজের হুকুম দেয়, ভাল কাজের নিষেধ করে এবং কল্যাণ থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন।” (সুরা তাওবা : ৬৭) পৃথিবীর সমস্ত মুনাফিকের এটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তারা সবাই খারাপ কাজের ব্যাপারে আগ্রহী এবং ভাল কাজের প্রতি তাদের প্রচণ্ড অনীহা ও শত্রুতা। কোন ব্যক্তি খারাপ কাজ করতে চাইলে তারা তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। তাকে পরামর্শ দেয়, তাকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করে, তার সাহস যোগায়, তাকে সাহায্য-সহায়তা দান করে, তার জন্য সুপারিশ পেশ করে, তার প্রশংসা করে, তার পক্ষে তথাকথিত ফতোয়া প্রদান করে। মোটকথা, তার জন্য নিজেদের সব কিছুই ওয়াকফ করে দেয়। নিজের অস্তিত্ব ও অবস্থান ভুলে গিয়ে তার সাথে একাকার হয়ে যায়। অথচ বাহ্যিক বেশ-ভুশায়, চেহেরা-সুরতে পাক্কা মু’মিন ও রাসুল (সা.) এর সুন্নাহর অনুসারী, দেশ বরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ কিন্তু আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হোক, তাতে সে বাঁধ সাধে। তার বিরুদ্ধে ফতোয়া প্রদান করে। ‘কুরআনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা’ যা আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন, তা নিজেরাও করে না এবং অন্যরা প্রতিষ্ঠা করুক তাতেও বাঁধ সাধে। তারা তাসবীহর দানার মধ্যে বেহেশত খোঁজে।

মনেপ্রাণে তারা তাগুতের ঐ খারাপ কাজে শরীক হয়। অন্যদেরকেও তাতে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর তাগুত তাকে অক্টোপাসে মায়া জালে বাঁধার জন্য তার এই তাগুতি কাজে সাহস যোগাতে থাকে। তাদের প্রতিটি আচার-আচরণ কথা-বার্তা থেকে এ কথা প্রকাশ হতে থাকে যে, এ অসৎ কাজটির বিস্তার ঘটলে তাদের হৃদয়ে শান্তি অনুভূত হবে এবং তাদের চোখ জুড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে কোন ভাল কাজ হতে থাকলে তার খবর শুনে তার মনে ব্যাথা অনুভূত হতে থাকে এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ কথার কল্পনা করতেই তাদের মন বিষিয়ে ওঠে। এ সম্পর্কিত কোন প্রস্তাবও তারা শুনতে পারে না। ভালো কাজের দিকে কাউকে এগিয়ে যেতে দেখলে তারা অস্থির হয়ে পড়ে। সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে তার পথে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম না হলে যাতে সে এ কাজে সফলকাম না হতে পারে এ জন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সবচেয়ে মারাত্মক যে কাজটি সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলে দেয়, তাহলো কুরআন-হাদীস থেকে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে অভিনব ফতোয়া জারি করে। এ কাজে তাদের বাহ্যিক বেশ-ভূষা ও চেহেরা-সুরতও মুখ্য ভূমিকা পালন করে। মানুষ বলে লোকটি বুযুর্গ আল্লাহ ওয়ালা, তিনি কি মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে?

এদের আরেকটি স্থায়ী ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে না। এরা সাধারণত কৃপণ হয়। বরং উল্টো তাগুতের কাছ থেকে অর্থ আহরণের জন্য নিজেদের সুনাম ও খ্যাতিকে ব্যবহার করে। তাদের উপার্জন হালাল কি হারাম এ ব্যাপারে তারা সামান্যতমও চিন্তা-ভাবনা করে না। অসৎ কাজের ব্যাপারে তারা যুগের কারূন। সৎকাজে অর্থ ব্যয় করার ব্যাপারে চরম দরিদ্র। আল কুরআনে বখিল শব্দের পাশাপাশি ‘শুহ’ শব্দ করা হয়েছে। বখিল অর্থ অত্যন্ত প্রয়োজনেও অর্থ ব্যয় না করা। আর ‘শুহ’ অর্থ নিজেরা তো ব্যয় করেই না বরং সেই সাথে অন্য কারোর অর্থ ব্যয় করতে দেখলে তার শরীর চুলকায়, দাঁত কড়মড় করতে শুরু করে। তাই এরা ইসলামী আন্দোলনে অন্যের ব্যয় ও সাহায্য-সহযোগিতাকে সহ্য করতে পারে না।

মু’মিনরা যেখানে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করে থাকে এবং এটি তার ঈমানের দাবি, সেখানে মুনাফিকরা তার বিপরীতে মানুষকে অন্যায় কথা ও কাজের আদেশ দেয় এবং ন্যায় কথা ও কাজের করতে নিষেধ করে। ইদানিং এই মুনাফেকী ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন অবয়বে প্রকাশিত হচ্ছে। আর তা হলো, এই বিশেষ গোষ্ঠী কুরআন ও হাদীসের সরাসরি বিরোধিতা না করে তারা মু’মিন পরিচয়ের আড়ালে ধর্মনিরপেক্ষবাদ বা স্থান ও কালের জাতীয়তাবাদকে উৎসাহিত করে, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদেরকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করে, তাদের হাতকে মজবুত করার জন্য অন্যদেরকেও তাদের সহযোগী বানায়। এর বিনিময়ে এরা তাদের থেকে বিশেষ সহযোগিতা গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে যারা ন্যায় ও ইনসাফকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের গায়ে বিশেষ কোন ট্যাগ লাগিয়ে মানুষকে দূরে সরাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়।

নিফাক মানব চরিত্রের এক নিকৃষ্ট, নিন্দনীয় এবং বিপদজনক স্বভাব। এটি মানুষের অন্তরকে কদর্য ও কুৎসিত করে তুলে। এই মনোরোগের কারণে বা এ ব্যধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রতারণা, আমানতের খেয়ানত, মিথ্যা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের মত মারাত্মক দোষে দুষ্ট থাকে। তাদের বাহ্যিক রূপ ও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাস সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান সমাজের দুরবস্থার জন্য এরা বহুলাংশে দায়ী। বাহ্যিকভাবে মুনাফিক নিজেকে সৎ, আল্লাহ ওয়ালা ও বুযুর্গ হিসাবে প্রকাশ করলেও তার ভিতরে বিরাজ করে এক ঘৃণ্য মানসিকতা। এ মানসিকতার জন্য সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা জেকে বসে। যার দরুণ মানুষের জীবন পর্যদুস্ত হয়। এই সামজিক অশান্তির জন্য এরা দায়ী বিধায় জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে তার ঠিকানা। (সুরা নিসা : ১৪৫) আল্লাহর দেয়া আমানতকে ভুল মানুষের হাতে তুলে দেয়ার কারণে এরা খিয়ানতকারী এবং মানব সৃষ্টির সূচনালগ্নে আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গকারী হিসাবেও জাহান্নামে নিম্নস্তরে নিপতিত হবে।

আল্লাহর দেয়া জীবন যৌবন, হায়াত ও জ্ঞান-বুদ্ধি সবই আল্লাহর আমানত। এই আমানত আল্লাহ তা’আলা বেহেশতের বিনিময়ে ক্রয় করে তার কাছেই আমানত হিসাবে রেখে দিয়েছেন। এই আমানত একমাত্র সেই মালিকের নির্দেশিত পথেই ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া জন্ম লগ্নে আল্লাহ যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে বলা হয়েছিল আমি কি তোমাদের রব তথা সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক নই? আমরা সকলেই বলেছিলাম হ্যাঁ আপনি আমাদের রব তথা সৃষ্টি আপনার হুকুমও চলবে আপনার। এই ওয়াদার পর যদি তাগুতের অনুসরণ করা হয় তাহলে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হলো। তাগুতের সাথে উঠাবসা মানে মিথ্যার সাথে আপস করা। সুতরাং কুরআনের সাথে মিল হাদীসের রয়েছে। সে হিসাবে সে একজন খাঁটি মুনাফিক।

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।