জাফর আহমাদ

সিয়াম সাধনার মাস রমযান আল্লাহর অবারিত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের সওগাত নিয়ে আমাদের মাঝে এসেছিল। আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আত্মগঠনের এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স বা প্রোগ্রামটির শেষের দিকে চলে এসেছি। ফিরে যাবে রমযান, কারো জীবনে তা আবার সৌভাগ্য হয়ে ফিরে আসবে কি না তার নিশ্চয়তা আসমানের মালিক ছাড়া আর কেহ-ই বা দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুষলধারে বয়ে যাওয়া আল্লাহর অবারিত রহমত থেকে কার কতটুকু রহমত ধরে রাখার সৌভাগ্য হয়েছে তাও আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন। তবে বড়ই আফসোসের বিষয় হবে সে সমস্ত মানুষের জন্য যারা এ সময়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও মর্যাদার একমাত্র প্রতিক ‘তাকওয়া’ অর্জন করে তার মহান প্রভুর ক্ষমা ও নৈকট্যে পৌঁছতে পারল না। দুর্ভাগ্য হবে তাদের জন্য, প্রশিক্ষণকালীন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোর্স মেটিরিয়েল হিসাবে তাকওয়ার পথের দিশার জন্য একটি গাইডবুক (কুরআন) দেয়া হয়েছিল, সেটি যদি না জেনে থাকে এবং সেই কুরআন অনুযায়ী নিজের জীবন পুনর্গঠিত না করতে পারে।

রমযানের বেদনার বিদায়ক্ষণে মুমিন-মুসলমানের কাছে সবিনয় আবেদন, আমাদের সামনে এমন এক রাত্রি আসছে, যার সম্পর্কে আমাদের দাতা করুণাময় মহান আল্লাহ বলেছেন, “আমি এ (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জানো, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও বেশি ভালো। ফেরেশতারা ও রূহ এ রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাযিল হয়। এ রাতটি পুরোপুরি শান্তিময় ফজরের উদয় পর্যন্ত।”(সূরা আল কাদর) আসুন এ রাত্রির পুরোপুরি ফায়েদা গ্রহণে নিজেকে আরো অধিক ব্যাপৃত করি। মুফাসসিরগণ সাধারণভাবে এর অর্থ করেছেন, এ রাতের সৎকাজ হাজার মাসের সৎকাজের চেয়ে ভালো। কদরের রাত এ গণনার বাইরে থাকবে। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদাতের জন্যে দাঁড়ালো তার পিছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হয়েছে।” (বুখারী-মুসলিম) ”কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও বেশি ভালো।” এখানে হাজার মাস বলতে এক হাজার তথা গুণে গুণে তিরাশি বছর চার মাস বুঝানো হয়নি। তাফসীরে বলা হয়েছে যে, আরববাসীদের কথার ধরন এমন ছিল যে কোন জিনিসের আধিক্য বা বিপুল সংখ্যা ধারণা দেবার জন্য তারা “হাজার” শব্দটি ব্যবহার করতো। আমাদের দেশেও এ ধরনের কথা প্রচলিত আছে। যেমন বলা হয়ে থাকে ‘ঐ কাজে আমার হাজার হাজার টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।’ এখানে টাকার পরিমাণ এক বা দু’হাজার নয় বরং বিপুল সংখ্যা ধারণা দেয়া জন্য ‘হাজার হাজার’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, এ একটি রাতে এত বড় নেকী ও কল্যাণের কাজ হয়েছে যা মানবতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোন দীর্ঘতম কালেও হয়নি।

লাইলাতুল কদরের অতীব মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা বলা হলেও রাতটিকে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। অবশ্য এর একটি কারণ রয়েছে যেমন এ প্রসঙ্গে হযরত মুয়াবিয়া (রা:), হযরত ইবনে উমর (রা:), হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এবং অন্যান্য সাহাবী যে রেওয়ায়েত করেন তার ভিত্তিতে পূর্ববতী আলেমগণের বিরাট অংশ সাতাশে রমযানকেই কদরের রাত বলে মনে করেন। সম্ভবত কদরের রাতের শ্রেষ্টত্ব ও মাহাত্ম থেকে লাভবান হবার আগ্রহে যাতে লোকেরা অনেক বেশী রাত ইবাদাতে কাটাতে পারে এবং কোন একটি রাতকে যতেষ্ট মনে না করে সে জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে কোন একটি রাত নির্র্র্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। এ জন্যই আল্লাহর রাসুলুল্লাহ সাঃ শেষের দশটি দিন মসজিদে অবস্থান করতেন, ইসলামের ইতিহাসে যাকে ইতিকাফ বলা হয়। রাসুল (স.) প্রিয়তমা জীবন সঙ্গিনী উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ (স.) ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত রমযানের শেষ দশ রাতে ইতিকাফ করেছেন।” (বুখারী মুসলিম) রমযানের শেষ দশক শুরু হলে রাসুল (স:) রাতগুলোতে জেগে থাকতেন এবং ঘরের লোকদের জাগিয়ে দিতেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, তাকে খোঁজ রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে যখন মাস শেষ হতে আর নয় দিন বাকি থাকে। অথবা সাতদিন বা পাঁচদিন বাকি থাকে। (বুখারী) অধিকাংশ আলেম এর অর্থ করেছেন এভাবে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) এখানে বেজোড় রাতের কথা বলতে চেয়েছেন। অর্থাৎ রমযানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখ সমুহ বুঝায়। এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে সরাসরি হাদিস রয়েছে। তিনি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কদরের রাতকে রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে তালাশ করো।” (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি)

এতক্ষণ কদর রাতের মর্যাদা বর্ণনা করা হলো। কিন্তু যাকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র এ রাত নয়, পুরো রমযানের সকল কিছু কেন্দ্রীভুত, সেই মধ্যমনি মহাগ্রন্থ আল কুরআন। সুরার প্রথমেই বলা হয়েছে “আমি এ কুরআনকে কদরের রাতে নাযিল করেছি।” পুরো রমযান মাসে জাঁকজমকের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন এবং রোযার গুণাগুণ ও মহিমা বর্ণনা করা হবে । কিন্তু যার কারণে রমযান এত মর্যাদা পেল সে মধ্যমনি আল কুরআনের কথা ভুলে যাওয়া হয়। রমযান তো ফরয করা হয়েছে আল কুরআনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করার ট্রেনিং হিসাবে । শুধু মাত্র রমযান নয় এমনিভাবে আমরা যতগুলো ইবাদাত পালন করে থাকি যেমন নামায, যাকাত ও হজ্জ, প্রতিটি ইবাদাতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হল সে একটিই, আর তা হল আল-কুরআন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আদর্শ সৈনিকে পরিণত করা। কিন্তু আমরা এ মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে স্রেফ একটি অনুষ্ঠানে পরিণত করেছি। এ ভাবে লক্ষ্যহীন রোযা ও অন্যান্য ইবাদাত আমরা জীবনভর পালন করে যাচ্ছি। কিন্তু ইবাদাতগুলোর ফায়দা পাওয়া যাচ্ছেনা। যেমন নামায খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখা, যাকাত পবিত্রতা দান করা এবং রোযা তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করতে পারছেনা। আর প্রতিটি ইবাদাত যেহেতু দক্ষ সৈনিকে প্রস্তুত করতে পারেনি তাই কুরআনও আমাদেরকে পথ দেখাতে পারছে না।

কারণ যিনি অন্ধ তার কাছে টর্চ লাইটের আলোর কোন মূল্য নেই এবং এ আলো তাকে পথ দেখাতে পারবে না। এমনিভাবে আমরা যারা রমযানের রোযাকে আল কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন করছি এবং আল কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝতে ও মানতে এবং সে অনুযায়ী জীবন গঠন করতে চাই না। তাই রোযা ও আল কুরআন যৌথভাবে আমাদেরকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করতে পারছে না। অথচ তাকওয়া এমন একটা জিনিস, এমন একটা শক্তি, যার উপর ভিত্তি করে মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারে, ন্যায় কাজের জন্য অগ্রসর হতে পারে। নিজের ক্ষতি হবে, এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এটাই তাকওয়া। সুতরাং যে রাতে এ কুরআন নাযিল করা হয়েছে আসুন সে রাতে নফল ইবাদাতের পাশপাশি অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত করি এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেই প্রাত্যহিক জীবনে কমপক্ষে অনন্ত এক বা দু’টো আয়াত অর্থসহ বুঝে তেলাওয়াত করবো এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের প্রতিক কুরআনকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথী বানিয়ে নেব। আল কুরআন যেন আমাদের জীবনে সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, লেন-দেন, ত্যাগ-গ্রহণ ও সার্বিক মুয়ামালাতের মানদণ্ড হয়। কুরআন অনুযায়ী আমি কথা বলবো কুরআন অনুযায়ী কথা পরিত্যাগ করবো।

রমযান ফরয করা হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য। একটি মাস বিশেষ সিয়াম ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আল্লাহর ভয় আপনার ভেতর বদ্ধমূল হয়েছে বটে। কিন্তু আপনি তো জানে না বা আপনার এ জ্ঞানই না থাকে যে, কিসে আপনার ক্ষতি কিসে আপনার ভাল, কোন ইসলামে বা আনুগত্যের পথ ও কোনটি তাগুতের পথ। তবে আপনি কিভাবে বিরত থাকবেন? কুরআন হক ও বাতিল, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্যকারী একটা কষ্টিপাথর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন “রমযান তো সে মাস যাতে এ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। আর এ কুরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য পথের দিশা। মানুষের জন্য (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী।” (সুরা-বাকারা-১৮৫) রমযানের তাকওয়া অর্জনের পাশাপাশি কুরআন থেকে আপনাকে তাকওয়ার পথ সম্পর্কেকে জানতে হবে।

সুতরাং আসুন লাইলাতুল কদর থেকে সঠিক ফায়েদা হাসিলের সাথে সাথে আল কুরআনের জ্ঞানে নিজেদের সিক্ত করি এবং কুরআন অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি। কারণ আল কুরআন থেকেই আমরা জানতে পারি যে, এ কুরআন যার উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তিনি সারোয়ারে জাহানের শ্রেষ্ট নবী হয়েছে, এ কুরআনের বদৌলতে, তাঁর এর সাথীরা উম্মতের শ্রেষ্ট মানব হয়েছেন, এ কুরআন যে যুগে নাযিল হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা:) সে যুগ সম্পর্কে বলেছেন, “খাইরুল কুরুনি কারনি” আমার যুগই হল শ্রেষ্ট যুগ, এ কুরআন যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে সেই মাস বাকি ১১ মাস থেকে শ্রেষ্ট মাস এবং এ কুরআন যে রাত্রিতে নাযিল হয়েছে সে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যাকে আমরা কদরের রাত বলে এতক্ষণ আলোচনা করলাম। সুতরাং আজো যে কোন ব্যক্তি, যে কোন পরিবার, যে কোন সমাজ ও রাষ্ট্র এ কুরআন নিজেদের মধ্যে ধারণ করবে ১০০% সেটি সর্বদিক থেকে উত্তম হবে।

সর্বোপরি, আল্লাহর রহমতের একটি উদাহরণ এ লাইলাতুল কদর। অর্থাৎ মু’মিনগণ যাতে যে কোন উপায়ে আল্লাহর অবারিত সুখের ঠিকানায় প্রবেশ করতে পারে এবং তাঁর সীমাহীন নায-নিয়ামত ভোগ করতে পারে সে জন্য কত সুযোগ-সুবিধা তৈয়ার করে রেখেছেন। তিনি মু’মিনদের জন্য রমযান মাস, ইতেকাফ ও লাইলাতুল কদরের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, যাতে এগুলোর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অবারিত রহমতের সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।