ফাহিমা আক্তার
দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪-এই পাঁচ বছরে দেশে আত্মহত্যা করেছেন মোট ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন। গড়ে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ৪০ জন মানুষ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়-এটি সমাজের জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক বার্তা।
প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো ফাঁস ও বিষপান। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ৮ হাজার ৮৩৮টি, বিষপানে ৩ হাজার ৭৫৯টি, গায়ে আগুনে ৬৬টি, রেললাইনে ঝাঁপে ৮টি এবং অন্যান্য পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮৮৫টি।
২০২১ সালে ফাঁসে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৭টি, বিষপানে ৩ হাজার ৯৯৯টি, গায়ে আগুনে ১১২টি, রেললাইনে ৫টি এবং অন্যান্য পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮৫৭টি।
২০২২ সালে ফাঁসে ৯ হাজার ৮৬৪টি, বিষপানে ৪ হাজার ৫৪১টি, গায়ে আগুনে ৮৪টি, রেললাইনে ১টি এবং অন্যান্য পদ্ধতিতে ১ হাজার ৫৩৭টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
২০২৩ সালে ফাঁসে ৯ হাজার ৬৩৬টি, বিষপানে ৪ হাজার ২১টি, গায়ে আগুনে ৫৬টি, রেললাইনে ১২টি এবং অন্যান্য পদ্ধতিতে ৩৮৯টি ঘটনা ঘটে।
২০২৪ সালে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৮০টি, বিষপানে ৩ হাজার ৯০৩টি, গায়ে আগুনে ৩৮টি, রেললাইনে ১৪টি এবং অন্যান্য পদ্ধতিতে ৩৮৫টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাঁস ও বিষপানের সহজলভ্যতাই এই দুই পদ্ধতিতে আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও গায়ে আগুন দেওয়া ও রেললাইনে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এসব পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় যশোর জেলায় আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ দায়ী নয়। পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের ভাঙন, পড়াশোনার চাপ, বেকারত্ব, সামাজিক লজ্জা, প্রত্যাশার চাপ-এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় একাকিত্ব ও সহানুভূতির অভাব। অনেকেই সাহায্য চাইতে চান, কিন্তু “লোকে কী বলবে”-এই ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না। আবার কেউ সাহায্য চাইলে উল্টো তিরস্কার বা অবহেলার শিকার হন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো-এই মানুষগুলোর অনেকেই আমাদের আশপাশেই থাকেন। তারা প্রতিদিন কথা বলেন, হাসেন, কাজ করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের আচরণে আসে পরিবর্তন অতিরিক্ত নীরবতা, একাকিত্ব, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, নিজের প্রতি অবহেলা। ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা এসব লক্ষণ এড়িয়ে যাই। কারণ আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য এখনও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার প্রবণতাই অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
অথচ মানসিক অসুস্থতা কোনো লজ্জার বিষয় নয়-এটি চিকিৎসাযোগ্য। যেমন শারীরিক অসুখে চিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি মানসিক কষ্টেও প্রয়োজন সহানুভূতি, সহযোগিতা ও পেশাদার চিকিৎসা। সচেতনতার অভাবে এই বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অমূল্য জীবন।
এই সংকট মোকাবিলায় সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়-এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য সামাজিক সমস্যা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করা, হেল্পলাইন ও কাউন্সেলিং সেন্টার কার্যকর করা সময়ের দাবি।
নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই আর্তনাদ শোনার দায়িত্ব শুধু পরিবার বা সমাজের নয় রাষ্ট্রেরও। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকারিভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে প্রতিদিনই হারাতে থাকবে আরও একটি জীবন, আরও একটি সম্ভাবনা।
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা।