মো. আনিসুর রহমান সজল
জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আত্মার পরিচায়ক, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা প্রকাশের সর্বোচ্চ মঞ্চ। এ মঞ্চে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করাই একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে একটি গৌরবময় ও অত্যন্ত দায়িত্ববহুল জাতীয় কর্তব্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সেনাবাহিনী তথা সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর নির্বাচনকালীন ভূমিকা কেবল সহায়কের নয়; তা গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য একটি অপরিহার্য সুরক্ষা বলয়, জাতির সম্মিলিত আস্থার প্রতীক এবং সংকটকালে সংহতি ও স্থিতিশীলতার মূল স্তম্ভ।
সাংবিধানিক কর্তব্য ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা : বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার সকল প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। সশস্ত্র বাহিনীর মূল দায়িত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা। কিন্তু ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বা বেসামরিক কর্তৃত্বকে সহায়তা করার ধারণা থেকেই উদ্ভূত হয় নির্বাচনী দায়িত্ব। যখন স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাধ্যের সীমায় পড়ে একটি জটিল, বৃহৎ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া যেমন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা, তখন সংবিধান ও আইনের অনুমোদনক্রমে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এটি একটি অস্থায়ী, নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যযুক্ত কার্যক্রম, যার কেন্দ্রে থাকে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও বেসামরিক প্রশাসনের সাথে সমন্বয়। এ দায়িত্ব পালনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনেও এ অঞ্চলে নিয়োজিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা নিরাপত্তা দায়িত্বে ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ নির্বাচনী সহায়তা দিয়ে এসেছে। সময়ের সাথে সাথে এই ভূমিকা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রতীকী উপস্থিতি থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণ : সশস্ত্র বাহিনীর নির্বাচনী ভূমিকা সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে বিবর্তিত হয়েছে। অতীতে এ ভূমিকা মূলত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ বা সংরক্ষিত শক্তি হিসেবে দূরবর্তী অবস্থানে থাকা, যাদের প্রয়োজন হলেই তলব করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে, বিশেষ করে আগামী আজকের নির্বাচনে এ ভূমিকা আরও প্রত্যক্ষ, বিস্তৃত ও সক্রিয় হয়েছে। এবার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ শুধু ব্যারাক বা ঘাঁটিতে নয়, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথ ও তার আশেপাশের আঙিনা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা পেয়েছেন। এক লাখেরও বেশি সদস্যের মোতায়েনের কথা বলা হচ্ছে, যা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ বিবর্তনের কারণ গভীর। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর কার্যপদ্ধতি রূপান্তরিত হয়। জনগণের মাঝে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা সৃষ্টি, সহিংসতা রোধ এবং সর্বোপরি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করাই এ পরিবর্তনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যখন সাধারণ নাগরিক ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি সশস্ত্র বাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ উপস্থিতি দেখেন, তখন তাদের মাঝে নিরাপত্তার অনুভূতি ও ভোটদানে উদ্বেগ হ্রাস পায়।
পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জাতীয় আস্থার পরীক্ষা : সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নির্বাচনী দায়িত্ব কোনো সামরিক কার্যক্রম নয়; এটি একটি সর্বোচ্চ স্তরের জনসেবা ও জাতীয় দায়িত্ব। এখানে সাফল্যের মাপকাঠি হলো চূড়ান্ত পেশাদারিত্ব, নিরঙ্কুশ নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান। বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা ব্যক্তির পক্ষে নয়, বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে হয়। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ জনগণের দৃষ্টিতে এবং ইতিহাসের কঠোর বিচারে ধরা পড়ে। তাই একে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বলা যথার্থ। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অর্থ হলো সাংবিধানিক কর্তব্য পালন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মান্য করা এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে নিখুঁত সমন্বয় বজায় রাখা। সেনাবাহিনী কখনই নির্বাচন পরিচালনা করবে না; তাদের ভূমিকা হবে সহায়ক ও সহযোগিতামূলক। ভোটারদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী উপকরণের নিরাপদ পরিবহন (যার জন্য হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকে), ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়াদানÑএইসব ক্ষেত্রেই তাদের কার্যক্রম সীমিত।
সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা : আধুনিক যুগে সশস্ত্র বাহিনীর নির্বাচনী দায়িত্বের মুখোমুখি নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও গুজবের দ্রুত বিস্তার নির্বাচনী পরিবেশকে দূষিত করতে পারে, যা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সাথে সহযোগিতা করে সঠিক তথ্য প্রচার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া, একটি অতিমাত্রায় মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে নিরপেক্ষ থাকার চাপও অনেক বেশি। ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীর এ ভূমিকা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারে। স্বচ্ছ নির্দেশিকা, উন্নত সমন্বয় প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ দায়িত্ব পালনকে আরও দক্ষ ও ফলপ্রসূ করা যায়। সর্বোপরি, জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। জনগণ যখন দেখবে যে সশস্ত্র বাহিনী দেশ ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে, তখনই তাদের প্রতি জাতির আস্থা অবিচল থাকবে।
উপসংহার : সশস্ত্র বাহিনীর নির্বাচনকালীন ভূমিকা হলো জাতীয় একাত্মতা ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের জীবন্ত প্রকাশ। তারা যখন নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে, তারা কেবল ভোটার বা ভোটকেন্দ্র রক্ষা করে না, তারা রক্ষা করে গণতন্ত্রের মূলনীতি, জনগণের মৌলিক অধিকার এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের স্বপ্ন। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী তার গৌরবময় ইতিহাসে বহুবার জাতির আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের নির্বাচনেও তাদের কর্তব্য হবে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি কেবল একটি কার্যক্রম নয়; এটি একটি জাতির প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী থাকে গণতন্ত্রের নিঃশব্দ, শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ। তাদের সফলতা হবে সমগ্র জাতির সফলতা, এবং তাদের প্রতি জাতির আস্থাই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অটুট শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল ও সামরিক বিশ্লেষক।