যুদ্ধ কোন সমাধান দেয় না বরং নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। মূলত, যুদ্ধ মানেই হচ্ছে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও লাগামীহন ধ্বংসযজ্ঞ। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুদ্ধ কখনো শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনেনি বরং নানাবিধ অশান্তির জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধ মূলত মানবসভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকী। ইতিহাস সে কথারই সাক্ষ্য বহন করে। তাই যুদ্ধকে ‘না’ বলতে হবে সব সময়। তবে ফেতনা-ফাসাদ, অন্যায়-অবিচার তথা অপশক্তিকে প্রতিহত করতে অপরিহার্য বাস্তবতায় যুদ্ধের কোন বিকল্পও নাই।
২০২২ সালে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। উভয় দেশের সামরিক শক্তির বিচারে মনে করা হয়েছিলো এ যুদ্ধ বেশি স্থায়ি হবে না বরং সামারিক শক্তি অনেক এগিয়ে থাকায় রাশিয়া এ যুদ্ধ সহজেই জয় করে নেবে। কিন্তু সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধ চলছে তো চলছেই। থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে আলোচনার খবর বাতাসে ভাসলেও পরবর্তীতে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধে ইউক্রেন হার মানেনি। যদিও রাশিয়া সামরিক শক্তি দিয়ে ইউক্রেনের বেশকিছু অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশটিকে এখন পর্যন্ত পুরোপুরি কব্জায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এর মধ্যেই উভয় দেশের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপকভাবে সামরিক যান ও সরঞ্জাম হারিয়েছে উভয় পক্ষই। প্রাণহানি শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে নি বরং বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনা ব্যাপকভাবে ধ্বংস যজ্ঞের শিকার হয়েছে। শুরুতেই সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন যে, এ অসম যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে বিজয়ী হওয়া বা বেশিদিন লড়াইয়ে টিকে থাকার কোন সম্ভবনা নেই বরং এক অনিবার্য পরিণতিতে তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হবে। তবে তাদের সকল জল্পনা-কল্পনা, আন্দাজ-অনুমান আপাতত ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
গত বছরের মে মাসের শুরুতেই পাক-ভারত সীমিত পরিসরে যুদ্ধ হয়ে গেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সে বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ি করে ৭ মে দেশটির অভ্যন্তরে ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে। জবাবে পাকিস্তান ভারতের অভ্যন্তরে ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ পরিচালনা করে এর জবাব দেয়। মাত্র কয়েক দিনের যুদ্ধে উভয় দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও পরবর্তীতে যুদ্ধ বিরতি হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সীমিত পরিসরে এ যুদ্ধে ভারতীয় পক্ষই বেশি ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়। কিন্তু এর ফলাফল একেবারেই নিষ্ফলা। একই ভাবে গত বছরের ১৩ জুন জায়নবাদী ইসরাইলী বাহিনী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে অকস্মাৎ হামলা চালিয়ে বসে। ইরানও এর উপযুক্ত জবাব দেয়। মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধে উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও এ যুদ্ধে কোন পক্ষেরই ইতিবাচক কোন অর্জন নেই।
একথা অনস্বীকার্য যে, কোন যুদ্ধই সামরিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সঙ্গত কারণেই সকল যুদ্ধেই প্রচুর বেসামরিক লোকের হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে। যেমনটি আমরা চলমান রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যক্ষ করছি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইতিমধ্যেই উভয় পক্ষের বিপুল সংখ্যক সৈন্যের প্রাণহানি ঘটেছে। ইউক্রেনের অনেক সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি শিশু ও মাতৃসদনও। সাম্প্রতিক পাক-ভারত এবং ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ফলাফলও একই।
বস্তুত, এ ভূমণ্ডলকে সৃষ্টিই করা হয়েছে সৃষ্টিকূলের অনুকূল ও বসবাসের উপযোগী করে। শুধু জীবন ধারণ নয় বরং জীবনকে পরিপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে যা যা প্রয়োজন তার সব কিছুই আছে এই নশ্বর পৃথিবীতে। এ সৃষ্টিনিচয়কে যে সর্বাঙ্গ সুন্দর, সাবলীল ও অতিশয় সমৃদ্ধ করে সৃষ্টি করা হয়েছে তা সার্থকভাবেই ফুটে উঠেছে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন-ধান্যে পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ কবিতাংশে। যা সমঝদার কাব্য প্রেমিকদের মনে এক নির্মোহ আবেদন সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহপাকের বাণী, পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছি।
মানুষের কল্যাণেই সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। আর অনুসন্ধিৎসা ও নতুন কিছু করার ইচ্ছা মানুষের চিরন্তন। সে অনুসন্ধিৎসা থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও এসেছে। সে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালেই মানুষ চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, আগামী অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করতে সক্ষম হবেন। এমনকি পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ ও মঙ্গলগ্রহকে মনুষ্য বসতির জন্য উপযোগী করার চেষ্টাও করছেন তারা। কিন্তু নির্জীব চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহকে সজীব করার জন্য মানুষ যতটা তৎপর কিন্তু সুজলা ও সফলা বসুন্ধরার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে তারা ততটাই উদাসীন।
চন্দ্র ও মঙ্গল পৃষ্ঠকে জীবন ধারনের উপযোগী করার চেষ্টায় অঢেল অর্থও ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবী নামক এ গ্রহটি যে ক্রমেই পরিবেশ বিপর্যয় ও সংঘাতের মুখোমুখি হয়ে ক্রমেই মনুষ্য বসতির অনুপযোগী হয়ে উঠছে তা নিয়ে সেভাবে ভাবা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, মানুষের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming) ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মনুষ্যসৃষ্ট দূষণকারী বস্তুর নিঃসরণ; বিশেষত সালফেট কণা শৈত্যয়ন ক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যা পৃথিবীর বৈশিষ্ট্য ও জীব বৈচিত্রের জন্য শুধু ক্ষতিকরই নয় বরং উদ্বেগজনকও।
গ্রীন হাউস ইফেক্ট বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নই যে শুধু পৃথিবীর জীব বৈচিত্র ও সভ্যতার জন্য হুমকী এমন নয় বরং বিশ্বরাজনীতিতে সংঘাত ও শক্তির প্রতিযোগীতাও বড় হুমকী হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব পরাশক্তিগুলো এখন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় বেশ পুলকবোধ করে। যুদ্ধ বা সমর বলতে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর মধ্যে সুসংগঠিত এবং কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ি সশস্ত্র সংঘর্ষকে বোঝানো হয়। চারিত্রিক দিক দিয়ে এটি প্রচণ্ড সহিংস এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। তাই একটি শান্তির বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যেখানে নিরস্ত্রীকরণ প্রয়োজন সেখানে বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর আরও অধুনিকায়নের লক্ষ্যে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিরক্ষা বাজেটে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
সুইডেনভিত্তিক স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড মিলিটারি এক্সপেন্ডিচার রিপোর্ট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে উত্থান-পতন ও রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার পরও সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে দেশটি বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করেছে। সামরিক ব্যয়ে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র এবং এরপর চীন।
বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রতিরক্ষা খাতে তাদের ব্যয় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়াচ্ছে। যার সর্বশেষ পরিমাণ দাড়িয়েছে ৬৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এশীয় দেশ চীন সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিরক্ষা খাতে দেশটি ২৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচ করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ইউরোপীয় দেশগুলো গত বছর সামরিক ব্যয় অনেক বাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ন্যাটোভুক্ত অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস, ফ্রান্স ও এস্তোনিয়ার সামরিক ব্যয় গত বছর আরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। আর ভারত সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধের ফল যে কখনো ভাল হয় না। অতীতে ফিরে তাকালেই তা ভালভাবেই উপলব্ধি করা যায়। যুদ্ধ শুধু মানুষের প্রাণহানিই ঘটায় না বরং মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। একই সাথে ব্যয় হয় প্রভূত অর্থের। যা শান্তির কাজে ব্যবহার হলে সভ্যতা আরও অনেক বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল। বিষয়টি আরও ভালভাবে উপলব্ধি করার জন্য অতীতের কিছু যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি রোমন্থন করা যেতে পারে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ : ১৯১৪-১৯১৮ সালে এই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ২ কোটির অধিক মানুষ নিহত হন। ইউরোপ কেন্দ্রীক এই যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন প্রায় ৭ কোটি সেনা। এদের মধ্যে প্রায় এক কোটির মৃত্যু হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ : এ যুদ্ধ ১৯৩৯-১৯৪৫ সালে হয়েছে। এতে ৭ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড দখল করেন। এর দুদিন পরেই ফ্রান্স এবং ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ধীরে ধীরে তা বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়।
তাইপিং বিদ্রোহ : ১৮৫১-১৮৬৪ সালে এ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এতে ২ কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। এটি চীনের সবচেয়ে বড় গৃহযুদ্ধ।
মোঙ্গল শাসনকাল : ১২০৭-১৪৭২ সালে মঙ্গল শাসনকালে সংগঠিত এ যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ৩ কোটি থেকে ৬ কোটি।
লুসান রেবেলিয়ন : ১৭৫৫-১৭৬৩ সালে সংগঠিত এ যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ। চীনে ট্যাঙ্গ এবং ইয়ান রাজবংশের মধ্যে সিংহাসন দখলের এই লড়াইয়ে নিহত হয়েছিল প্রায় দুই কোটি মানুষ।
কুইঙ্গ সম্রাজ্যের পতন : এ যুদ্ধ ১৬১৬-১৬৬২ সংগঠিত হয়েছিলো। এতে মৃতের সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লক্ষ। চীনের সর্বশেষ রাজবংশ হল কুইঙ্গ। মিঙ্গদের আক্রমণে এই রাজবংশের পতন হয়।
তৈমুর লং : ১৩৬৯-১৪০৫ সালে এ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো। এতে মৃতের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ২ কোটি।
দুনগান অভ্যুত্থান : ১৮৬২-১৮৭৭ সালে সংগঠিত এ যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষ। চীনে দুনগান জাতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল কুইঙ্গ রাজবংশের বিরুদ্ধে।
রাশিয়ার গৃহযুদ্ধ : ১৯১৭-১৯২১ সালে সংগঠিত যুদ্ধে ৫০ লক্ষ থেকে ৯০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। বলশেভিক পার্টির অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতা দখলের সেই গৃহযুদ্ধে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের।
নাপোলিওনিক যুদ্ধ : ১৮০৩-১৮১৫ সালে সংগঠিত হওয়া এ যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৭০ লক্ষ। এক সঙ্গে একাধিক দেশ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল সেই সময়ে। প্রায় বারো বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের।
অতীতের কোন যুদ্ধই সভ্যতার জন্য সুখস্মৃতি বয়ে আনেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু হামলায় শুধুমাত্র হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক নিহত হন। নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন।
অতীতে যুদ্ধ নিয়ে এমন দুঃসহ স্মৃতির পরও বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুদ্ধোম্মাদনা বন্ধ হয়নি। রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ও ইউক্রেন যুদ্ধ, দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এ সবকিছুই বলে দেয় যে আগামী দিনে সশস্ত্র সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে প্রত্যেক দেশকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো যে দেশগুলো ইতোমধ্যেই সামরিক শক্তিমত্তায় বলিষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছেছে, তাদের মাঝেও এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন বিশ্বের সবচেয়ে সঙ্কটময় অঞ্চলের একটি। যুদ্ধের কারণে সংশ্লিষ্ট সব দেশকেই তাদের সামরিক ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছে। অর্থনীতিবিদ ন্যান তিয়ানের মতে, ‘শুধুমাত্র ২০১৬ সালে সিরিয়া যুদ্ধে ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে রাশিয়া।’ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৫ সালে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করেছে সৌদি আরব। ২০১৬ সালে এই ব্যয় ছিল ৯ শতাংশ। ইউরোপেও সামরিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যেমতে, মধ্য ইউরোপীয় দেশগুলো ২০১৬ সালে আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। প্রতিরক্ষা গবেষক সিমন উইজম্যানের দেয়া তথ্যমতে, রাশিয়া ২৭ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর পর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোও অনেকটা একই কাজ করেছে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবসভ্যতাকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তা সকল ক্ষেত্রেই মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হয়নি। চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে প্রাণের স্ফুরণ ঘটানোর পরিকল্পনা নিঃসন্দেহ ইতিবাচক। কিন্তু পৃথিবীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট ও জীববৈচিত্র রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে সবার আগে। যখন এমন তাগিদই অনূভব করছেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সস্ত্রীক অপহরণ বিশ্ববিবেককে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। যা বিশ্বশান্তির জন্য রীতিমত উদ্বেগজনক। এমতাবস্থায় সভ্যতাকে শান্তিময় ও মানবতার কল্যাণে বিকশিত করতে অবিলম্বে সকল প্রকার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। একইসাথে ভাবতের হবে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার কথা। সর্বোপরি যুদ্ধকে সবসময় ‘না’ বলতে হবে। অন্যথায় আধুনিক সভ্যতা কখনোই বিশ্বশান্তির নিয়ামক হবে না।
www.syedmasud.com