আইন ও দণ্ডবিধির পরিভাষায় অপরাধকে ‘সভ্যতার অবদান’ বলা হয়। বস্তুত, সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথেই অপরাধকে সংবিধিবদ্ধ করে জনজীবনে ফিরিয়ে আনা হয় শৃঙ্খলা। আর অপরাধের গতি-প্রকৃতি যখন সংজ্ঞায়িত হলো তখন অপরাধ প্রবণতাকে সীমিত পর্যায়ে রাখা বা প্রতিবিধানের আবশ্যকতাও দেখা দিলো। এমন আবশ্যকতা থেকেই রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভব ঘটে। কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়ে এখন আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। যদিও তা কখনো পরিপূর্ণতা পায়নি। মূলত, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ জনজীবনে শৃঙ্খলা নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। তাই এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোনভাবেই কাম্য নয়।
অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দণ্ডবিধি, আইন-আদালত, প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল এবং অবকাঠামো শুধু রাষ্ট্রের অঙ্গই নয় বরং সম্পূরকও। কিন্তু রাষ্ট্র যে সকল ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সফল হয় এমনও নয়। খুব প্রাসঙ্গিক কারণেই বিশ্বের কোন রাষ্ট্র থেকেই অপরাধ প্রবণতার নির্মূল করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে তা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব যদি রাষ্ট্র যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল থাকে।
যেসব দেশে জনজীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রে সহযোগী অঙ্গগুলো ক্রিয়াশীল থাকে সেসব দেশে অপরাধ প্রবণতা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা খুবই সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে অপরাধ প্রবণতা একেবারেই লাগামহীন। ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রতিরোধ্যও বলা যায়। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী অপশাসন-দুঃশাসনে দেশে অপরাধ প্রবণতা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মূলত আওয়ামী শাসনামলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীর শাস্তি না হওয়ায় আমাদের দেশের অপরাধ প্রবণতা একেবারে অপ্রতিরোধ্যই হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের পর সে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বলেই মনে করা হয়েছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিককালের প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে এর ভিন্ন চিত্রই আমাদের সামনে ভেসে উঠেছে। যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে স্বৈরশাসনের অবসান হলেও পতিতদের প্রতিভূরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে এখনো তৎপর রয়েছে। এ কুচক্রীমহলটি অন্তর্বর্তী সরকারকে অকার্যকর ও ব্যর্থ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যা এখন গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে শুরু করেছে। মূলত পতিত অপশক্তির মদদে দেশে চুরি, ডাকাতি, খুন ও অপহরণ এখন অনেকটাই বেড়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ প্রান্তিকে The Daily Star-এ প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে দেশে অপরাধ প্রবণতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশজুড়ে খুন, অপহরণ, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধের ঘটনা গত পাঁচ বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে। এ ধরনের অভিযোগে থানায় হওয়া মামলার সংখ্যা থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে। যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক’ বক্তব্যের সঙ্গে এ তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। যা জনমনে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৯৪টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ২৩১টি। এর আগের চার বছরের একই মাসে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২১৪, ২৬৪, ২৫৭ ও ২৭৩টি। চলতি বছরের প্রথম মাসে ডাকাতির মামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১টিতে, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ১১৪টি। অপহরণের মামলাও চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিগুণ বেড়েছে। গত ছয় বছরের মাসিক অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এসব অভিযোগে একমাসে মোট মামলা হয়েছে ২৪২টি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও আগের পাঁচ বছরের একই মাসের তুলনায় ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পুরোপুরি লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গত ছয় মাসে ছিনতাই, ডাকাতি ও চুরির মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার দাবির সমালোচনা করে তারা বলছেন, মানুষ খুন, চুরি, ছিনতাইয়ের ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। সরকারকে এ ব্যাপারে উদাসীন মনে হচ্ছে কারণ তারা এ সমস্যা সমাধানের উপায় জানে না।
এদিকে গত ২২ মার্চ দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জ্ঞাত হওয়া গেছে, দেশে সামগ্রিক অপরাধ ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যুতা, অপহরণের মতো ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। খুনও বেড়েছে কিছুটা। তবে ধর্ষণ, চুরি ও সিঁধেল চুরির মতো অপরাধ কমেছে। গত সাত মাসে উল্লেখিত সাত ধরনের অপরাধের ঘটনায় সারা দেশের মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সাত ধরনের ১৩ হাজার ৪৯৬টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের একই সময়ে এমন সাত ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ১২ হাজার ৭১৪টি। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অপরাধ ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশী ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে আসতে থাকে। এর মধ্যে ছিনতাই বা ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ, চুরি ও সিঁধেল চুরি এমন সাত ধরনের অপরাধের ঘটনা নিয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সাত মাস পরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ডাকাতি ও দস্যুতা মামলার পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনেও মামলা হচ্ছে। তবে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা বাড়লেও দ্রুত বিচার আইনের এ মামলা কমেছে। ২০২৩-২৪ সালের একই সময়ে এমন সাত ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ১২ হাজার ৭১৪টি। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অপরাধ ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে ৩০৬টি মামলা হয়। ২০২১-২২ সালে একই সময়ে এ মামলার সংখ্যা ছিল ২২১, ২০২২-২৩ সালে মামলা ছিল ২৫৩টি, ২০২৩-২৪ সালে একই সময়ে এ মামলা হয় ২২৯টি এবং গত ছয় মাসে এমন মামলা হয়েছে ১৮১টি।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)র বক্তব্য হলো, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যে পুলিশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং পুলিশের আইনি নির্দেশনা না মানার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটাকেও সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। এ জন্য এখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অপরাধ করলেই মামলা হবে, জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। সারা দেশের পুলিশকে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইজিপি বলেন, ‘তবে কিছু কিছু অপরাধ বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। আবার আগের অপরাধের অনেক মামলা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে হয়েছে, এ কারণেও খুনসহ মামলার সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিটি অপরাধের কারণ বের করা এবং পৃথক ধরনের অপরাধের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে’। আইজিপি মহোদয়ের এ বক্তব্যের যৌক্তিকতাও পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পুলিশের কাছে সংরক্ষিত মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডাকাতি হয়েছে ৪২৬টি, যা বিগত বছরে একই সময়ে ছিল ১৮২টি। অর্থাৎ ডাকাতি ১৩৪ শতাংশ বেড়েছে। গত সাত মাসে দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৩৮টি, যা আগের বছরে একই সময়ে ছিল ৭৩৫টি। সর্বশেষ দু’মাসে সারা দেশে ১৪৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৬২টি। গত দু’মাসে দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ৪২২টি। গত বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দস্যুতার ঘটনা ঘটে ২৩৫টি। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী, ছিনতাইয়ের ধরন অনুযায়ী কখনো ডাকাতি ও কখনো দস্যুতার মামলা হয়েছে। প্রচলিত আইনে দস্যুতার ক্ষেত্রে অপরাধীর সংখ্যা এক থেকে চারজন হয়ে থাকে। আর চারজনের বেশি ব্যক্তি দস্যুতার অপরাধে জড়ালে তা ডাকাতি হিসেবে গণ্য হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যে পুলিশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং পুলিশের আইনি নির্দেশনা না মানার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটাকেও সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত সাত মাসে অপহরণের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এ সময়ে ৫৪৮টি অপহরণের ঘটনা ঘটে, যা বিগত বছরে একই সময়ে ছিল ২৯৪টি। গত দু’মাসে ২১৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর একই সময়ে অপহরণের ঘটনা ঘটে ৯৪টি। অপহরণের ঘটনা গত ৫ আগস্টের পর থেকেও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছেই। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অপহরণের ঘটনা ঘটে ১৬১টি। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অপহরণের ঘটনা ঘটে ১৪১টি। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিগত দু’মাসে আগের মাসগুলোর তুলনায় অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি-হ্রাস নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য হলো, ‘অপরাধ এড়িয়ে যাওয়া বা ব্যবস্থা না নেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় মামলা নিতে মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের অভিযোগে ৮৩২টি মামলা হয়েছে। তবে মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাত মাসে ধর্ষণ, চুরি ও সিঁধেল চুরি এ তিন ধরনের অপরাধ কমেছে। সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৪৫৬টি, যা বিগত বছরে একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৭২৫টি। অর্থাৎ ধর্ষণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। গত সাত মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৭৩৪টি, যা বিগত বছরে সাত মাসে ছিল ৫ হাজার ৫২২টি। অর্থাৎ চুরির ঘটনা ১৪ শতাংশ কমেছে। তা ছাড়া সিঁধেল চুরির অপরাধ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। অপরাধ এড়িয়ে যাওয়া বা ব্যবস্থা না নেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় মামলা নিতে মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ি, গত সাত মাসে খুনের মামলা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ২ হাজার ৮৪০টি খুনের মামলা হয়েছে। বিগত বছরে একই সময়ে খুনের মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৬৮০টি। বেড়েছে ৬৯ শতাংশ। তবে খুন বা হত্যা মামলার বৃদ্ধির নেপথ্যে ভিন্ন কারণ পাওয়া গেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের আমলের ৯৮৬টি খুনের ঘটনায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মামলা হয়েছে। এ ঘটনাগুলো বাদ দিলে ৫ আগস্টের পর খুনের ঘটনা বৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও অপরাধ প্রবণতা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে জানানো হয়েছে।
সেখানে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অপরাধ প্রবণতার নেপথ্যে পাঁচটি বিষয় উঠে এসেছে। এতে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শূন্যতাকে প্রথম কারণ হিসেবে দেখানো হয়। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখানো হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলের অভাবকে। চলমান অপরাধ প্রবণতার তৃতীয় কারণ হিসেবে সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনের প্রতি মানুষের সাময়িক অনাস্থা এবং অপরাধীদের সুযোগ গ্রহণকে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। তাদের মূল্যায়ন হলো গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার অভাব ও সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনের প্রতি মানুষের অনাস্থা রয়েছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা ও অপহরণের মতো অপরাধ করছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের আমলের ৯৮৬টি খুনের ঘটনায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মামলা হয়েছে। এ ঘটনাগুলো বাদ দিলে ৫ আগস্টের পর খুনের ঘটনা বৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। তা ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখল-চাঁদাবাজি ও সহিংসতাকে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে তাদের মূল্যায়ন হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্য, রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, লুটপাট ও দখল-চাঁদাবাজির কারণে অপরাধের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুনির্দিষ্ট কিছু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত নেতিবাচক প্রচারণাগুলো বেশি চালানো হচ্ছে। একই ধরনের গুজব একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হচ্ছে। এতে বোঝাই যাচ্ছে, প্রচারণাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত। ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কয়েক শ অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করছে।
মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় মামলা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মামলা বেড়েছে নাকি কমেছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চলাচল নিরাপদ করার বিষয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারা। অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না, সবার মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে হবে। অবশ্য অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিসংখ্যান দিয়ে সব সময় অপরাধ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যা না। কখনো কখনো একটি ঘটনা সব পরিসংখ্যানকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে পারে। এ জন্য মানুষের ধারণাগত মূল্যায়ন বিবেচনায় নিতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মামলার এজাহারে দুর্বলতা ও তদন্তে গাফিলতির কারণে অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে যায়। এ দুটি জায়গায় তদারকি জরুরি।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, ফ্যাসিবাদের পতনের পর তাদের প্রতিভূরা দেশে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এরা অনেকটা নেপথ্যে থেকেই দেশের অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতাকে উস্কে দিচ্ছে। ফলে দেশে অপরাধ বেড়েছে গাণিতিকভাবে। একই সাথে একটি চিহ্নিত মহল তিলকে তাল বানিয়ে অতিরঞ্জিত খবরও প্রকাশ ও প্রচার করছে। যাতে আগস্ট বিপ্লব ও অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা যায়। এমতাবস্থায় জনমনে স্বস্তি, দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। অন্যথায় আমাদের আগস্ট বিপ্লবের অর্জন ব্যর্থ হবে। যা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত নয়!