॥ শ্রীকান্ত দেব আকাশ ॥
বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের মনে গভীর সংকটাপন্ন মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে। শিক্ষিত যুবসমাজ ক্রমেই এ দেশ ছেড়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের সন্ধানে পাড়ি জমাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে তারা দেশের বাইরে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করছে। এর পরিণতিতে দেশে মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা একটি গুরুতর মেধা-পাচারের চিত্র স্পষ্ট করে তুলছে। এ মেধা-পাচার দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মূলত মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই দেশ আজ এ গভীর হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশে বর্তমানে ৫৮ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং এর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ২৫০ এর বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও টএঈ সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং ২০২৫ সাম্প্রতি তথ্যানুযায়ী, ৫০% বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট এবং পর্যাপ্ত ক্লাস রুমের ব্যবস্থা নেই। এসব সংকট শিক্ষার্থীদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাদের মধ্যে নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রতি অনীহার জন্ম নিচ্ছে।
প্রতিবছর দেশ শিক্ষার্থীদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও, ওই টাকার অধিকাংশ আর দেশে ফেরত আসছে না। কারণ শিক্ষার্থীরা অন্যদেশের শিক্ষার প্রতি অতি আগ্রহী হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৫০,৫১২ টাকা। সাধারণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে এ ব্যয় গড়ে ২০,৪৭৮ টাকার মতো হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বার্ষিক ব্যয় আরো বেশি যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর প্রতি বার্ষিক ব্যয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা, বুয়েট ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৭ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ ৫ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৬ টাকা। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এত বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করেও প্রতিবছর পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। তার মধ্যে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরে না। তারা ওখানে নিজের ভবিষ্যৎ অতিবাহিত করতে শুরু করে।
মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়া, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং সুযোগ সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজ দেশে থাকার মতো মনমানসিকতা তৈরি করতে পারছে না। ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগের ৫ হাজার ৬০৯ তরুণ-তরুণীর মাঝে পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশই দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন। ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ আবার মনে করেন, তাদের যে দক্ষতা রয়েছে দেশে সে অনুযায়ী চাকরি নেই। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই মনে করেন ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ এবং ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন দেশে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কম। এছাড়া ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে দেশ ছাড়তে চাইছেন ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী।
দিন দিন বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহ বেড়ে চলেছে। সে সাথে তাল মিলিয়ে চলছে তাদের ব্যয়ের পরিধি। যার পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ব্যয় করেছেন ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার যা বিগত বছর গুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ। ‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ হাজার ৯৯ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো এ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিগত শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এ বৃদ্ধি বর্তমানে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাঠানো দেশের তালিকায় ১৩ তম অবস্থান থেকে অষ্টম অবস্থানে নিয়ে আসে।
এসব সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে, দেশ আসলে কত বড় দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে চলেছে। প্রতিনিয়ত এ মেধার পাচার চলতে থাকলে দেশে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো তীব্র রূপ ধারণ করবে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
মেধা-পাচার রোধে এখনই রাষ্ট্রকে সমন্বিত ও দৃঢ় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দূর করে গবেষণা ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, একই সঙ্গে আধুনিক ল্যাব, শ্রেণিকক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তরুণদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে, যাতে দেশেই ভবিষ্যৎ গড়ার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। সর্বোপরি, তরুণদের কেবল জনশক্তি নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করলেই এই ভয়াবহ মেধা-পাচার রোধ করা সম্ভব হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।