মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংঘাত ও সহাবস্থানের দ্বৈত ধারায় গড়ে উঠেছে। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে জ্ঞান; একদিকে ধ্বংস, অন্যদিকে নির্মাণ। কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তা হলো যুদ্ধ আর কেবল সীমান্ত বা সিংহাসনের লড়াই নয়; এটি প্রযুক্তি, তথ্য, অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্বের এক জটিল সমন্বয়। এ পরিবর্তনকে বোঝার জন্য আমাদের বিজ্ঞান ও দর্শনের আলো একসঙ্গে প্রয়োজন। কারণ যুদ্ধের রূপান্তর কেবল সামরিক কৌশলের বিষয় নয়, এটি মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা ও জ্ঞানের বিবর্তনের প্রতিফলন।
প্রাচীনকারে যুদ্ধ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের। যেমন Battle of Kalinga--এর সময় সংঘর্ষ হয়েছিল দু’টি শক্তির মধ্যে এবং এর ভয়াবহতা সম্রাটকে অনুতপ্ত করেছিল। আবার Battle of Waterloo ছিল দুই সামরিক জোটের চূড়ান্ত লড়াই। এসব যুদ্ধে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের সরাসরি লক্ষ্য করে যুদ্ধ পরিচালিত হতো না। যুদ্ধের একটি অলিখিত নৈতিকতা ছিল যোদ্ধা বনাম যোদ্ধা। দর্শনের ভাষায় একে ‘ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব’ বলা হয়, যেখানে উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ফলাফলের নৈতিক সীমা নির্ধারণের চেষ্টা ছিল। কিন্তু শিল্পবিপ্লব ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যুদ্ধের চরিত্র আমূল বদলে দেয়। বারুদের উন্নয়ন, রেলপথ, টেলিগ্রাফ সব মিলিয়ে যুদ্ধ হয়ে ওঠে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’। World War I -এ প্রথমবারের মতো রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার হয়; লাখ লাখ সৈন্যের পাশাপাশি অসংখ্য বেসামরিক মানুষ অনাহার, মহামারি ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের শিকার হন। World War II-এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়; ড্রেসডেন, টোকিও বা হিরোশিমায় বোমা হামলা প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি যখন নৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন বিজ্ঞান মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়।
বিজ্ঞান দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বিজ্ঞান কি মূল্যনিরপেক্ষ? তত্ত্বগতভাবে বিজ্ঞান কেবল তথ্য ও পরীক্ষার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞান মানুষের হাতে পরিচালিত। যখন গবেষণা অর্থায়ন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সামরিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার প্রয়োগও সে লক্ষ্য পূরণে ব্যবহৃত হয়। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার আবিষ্কার যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনে আশীর্বাদ, তেমনি অস্ত্রে রূপান্তরিত হলে তা অভিশাপ। এখানেই নৈতিক দর্শনের ভূমিকা। জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে দায়িত্ববোধ না থাকলে সভ্যতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সমসাময়িক বিশ্বে যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয়; এটি তথ্যযুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসবের মাধ্যমে দূর থেকে আঘাত হানা যায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র আর নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল পর্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক সংঘাতে নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। শরণার্থী সংকট, খাদ্য ঘাটতি ও মানসিক আঘাতÑএসব দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষত তৈরি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রভাব ফেলে।
দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘মানবিকতা’। ইমানুয়েল কান্ট মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ নৈতিক নীতি হিসেবে দেখেছেন কোনো মানুষকে কখনোই কেবল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধে কৌশলগত সুবিধার জন্য সাধারণ মানুষকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় অবরোধ, অবকাঠামো ধ্বংস বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। এতে যুদ্ধের নৈতিক সীমা ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন, যেমন জেনেভা কনভেনশন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগে তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। যখন একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন বৈষম্য, দারিদ্র্য বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যে থাকে, তখন সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ে। সমাজবিজ্ঞানী গবেষণায় দেখা যায়, অর্থনৈতিক অসমতা ও সম্পদের সংকট অনেক সময় যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছেÑপানি ও খাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে সংঘাত বাড়াতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের পেছনে কেবল সামরিক কারণ নয়; বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি বহুমাত্রিক সংকটের ফল।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও যুদ্ধের প্রভাব গভীর। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা মানুষের মস্তিষ্কে মানসিক আঘাতের ছাপ ফেলে; শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আগ্রাসী আচরণ বাড়ে। স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, ভয় ও অনিরাপত্তা মস্তিষ্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে একটি প্রজন্ম কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বাস্তবতা প্রমাণ করে যে যুদ্ধের মূল্য কেবল তাৎক্ষণিক নয়; এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের ওপর গভীর ছায়া ফেলে।
বর্তমানে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর প্রাণঘাতি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের সঙ্গে হামাস-এর সংঘাত শুরু হলেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী যেমন হিজবুল্লাহ সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করছে। গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়েছে, বিশেষ করে ইয়েমেন-ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার কারণে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, আর প্রাথমিকভাবে ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রেখে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকট গভীর হয়েছে।
তবে ইরানের ওপর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অনেকটা আকস্মিকভাবে মার্কিন-ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ও পর হামলা চালিয়েছে এবং সে হামলা এখনও অব্যাহতই রয়েছে। ইরানও এ হামলার যোগ্য জবাব দিয়ে যাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শুরু হয়েছে মানবিক বিপর্যয়। ত্রিমুখী যুুদ্ধের তাণ্ডবে মানবতার আর্তনাদ শুরু হয়েছে। প্রাণহানী ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে সমান তালে। যা সভ্যতা ধ্বংসের অনুসঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে।
তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবন্ধ ও বিশ্বশান্তির স্বার্থেই এ যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করা উচিত। অন্যথায় মানবতার আহাজারি ও আর্তনাদ বন্ধ হবে না। বিপন্ন হবে মানব সভ্যতাও।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।