॥ সরদার ফরিদ আহমদ ॥

বাংলাদেশের রাজনীতি আবার এক সন্ধিক্ষণে। ক্ষমতার পালাবদলের পর যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে আলোচিত দিক- ভারত নীতি। যে বিএনপি একসময় ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল, সেই দলই এখন দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্রীয়। এতে প্রশ্ন ওঠছে। সন্দেহ বাড়ছে। উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক সমন্বয় নয়- এটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি ক্ষমতার ভাষা। এটি ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশের সংকেত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এখন দিল্লিতে। সেখানে বৈঠক করবেন ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে। আলোচনার তালিকায় থাকবে গঙ্গা পানি চুক্তি, ভিসা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সমন্বয়। কাগজে-কলমে এটি স্বাভাবিক কূটনীতি। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। কারণ এই সফর ঘটছে এক সংবেদনশীল সময়ে।

দেশে ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে-বিএনপি সরকার ভারতপন্থী হয়ে যাচ্ছে। এই অভিযোগ হঠাৎ তৈরি হয়নি। ঘটনাপ্রবাহই তা তৈরি করেছে।

ভারতের গণমাধ্যমে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি সরকারের প্রশংসার ঢেউ। দুই দশক ধরে যাদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল বর্তমান নেতৃত্ব তারেক রহমান, তারাই এখন নরম। এটি কি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল? নাকি এর পেছনে কূটনৈতিক সমঝোতা? এই প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।

ভারতের একটি প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে- ঢাকা নাকি দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করেছে। গণমাধ্যমটি লিখেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দিল্লিও যদি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসে তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। অতীতের প্রেক্ষাপট থেকে বিএনপিকে মূল্যায়নের পরিবর্তে বিএনপিকে নতুন রূপে দেখার কথা বলা হয়েছে দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে। দ্য প্রিন্ট বলছে, শুধু নেতৃত্ব বদলায়নি দিল্লির প্রতি দলটির দৃষ্টিভঙ্গিও এখন আরো সংবেদনশীল ও ইতিবাচক। অতীতের তুলনায় ভারত এবার প্রথমবারের মতো এমন একটি বিএনপিকে পাচ্ছে যারা দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। দ্য প্রিন্টের ‘রিসেট’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি বোঝায় পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসা। এটি বোঝায় নীতিগত পরিবর্তন। এটি বোঝায় নতুন সমীকরণ। আর এখানেই শুরু বিতর্কের।

কারণ জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক চেতনা ছিল অন্যরকম। সেই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল সার্বভৌমত্ব। ছিল ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতা। ছিল স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি। অনেকেই মনে করেন-৫ আগস্ট শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন নয়। এটি ছিল একটি প্রভাব বলয়ের পতন। এটি ছিল ভারত নির্ভরতার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লিমুখী কূটনীতি সন্দেহ তৈরি করছে। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে-দলীয় পর্যায়ে এর ব্যাখ্যা নেই। প্রতিবাদ নেই। স্বচ্ছতা নেই। এই উদ্বেগ অমূলক নয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতের প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। এটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। রাজনীতিতে এই প্রভাব বহুবার দৃশ্যমান হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে অবস্থান, ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বার্তা, দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে পরোক্ষ মন্তব্য, সবই ঘটেছে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের টেলিভিশন বাজার দীর্ঘদিন ভারতীয় চ্যানেলে দখল হয়ে আছে। দেশীয় শিল্পীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছেন।

সাংস্কৃতিক রুচি বদলেছে। ভাষাগত প্রভাব বেড়েছে। চলচ্চিত্র শিল্পও একই চাপে পড়েছে। যৌথ প্রযোজনার নামে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশি শিল্পীরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন।

সংবাদমাধ্যমেও প্রভাবের অভিযোগ এসেছে। বাংলাদেশের মূলধারার বেশিরভাগ মিডিয়ায় ‘ভারতপন্থী’ বলে পরিচিতি। তাদের কর্মকা- সেটি প্রমাণও করেছে এবং করছে। ভারতের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘ভারতপন্থী’ মিডিয়া সবসময় দিল্লির পক্ষে বয়ান তৈরিতে সচেষ্ট থাকে। অর্থনীতিতেও অসমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বেড়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশে বাধা। ভারতীয় পণ্যের অবাধ প্রবাহ।

নদীর পানি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে। ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্বেগের সমাধান হয়নি।

সীমান্তে হত্যাকা- আরেকটি বড় প্রশ্ন। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। তবু সম্পর্কের ভাষা বদলায়নি।

এই বাস্তবতা মানুষ ভুলে যায়নি। জুলাই বিপ্লবের প্রজন্ম তো নয়ই। এই প্রজন্মের কাছে সার্বভৌমত্ব শুধু স্লোগান নয়। এটি রাজনৈতিক নীতি। এটি রাষ্ট্রচিন্তা। তাই বর্তমান কূটনৈতিক পরিবর্তন তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করছে।

সরকার বলছে-এটি বাস্তববাদী কূটনীতি। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। আঞ্চলিক সহযোগিতা দরকার। এই যুক্তি অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের ভূগোল বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-সম্পর্ক নাকি নির্ভরতা? সহযোগিতা নাকি সমঝোতা? সমতা নাকি প্রভাব? এখানেই মূল দ্বন্দ্ব।

পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বর্তমান দিল্লি সফরের দিকে তাকালে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, রাজনৈতিক বার্তা। ঢাকা দিল্লিকে আশ্বস্ত করতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক পুনরুদ্ধার। সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খুলছে। তৃতীয়ত, নীতিগত পুনর্বিন্যাস। পুরনো অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। এই পরিবর্তন কতদূর যাবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

যদি এটি সমতার ভিত্তিতে হয়, তাহলে উদ্বেগ কমবে। যদি এটি নির্ভরতার দিকে যায়, তাহলে সংকট বাড়বে। সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ বড়। তাদের প্রমাণ করতে হবে-বাংলাদেশের স্বার্থই প্রথম। কোনো চাপ নয়। কোনো আপস নয়। বিশেষ করে পানির প্রশ্নে। সীমান্ত নিরাপত্তায়। বাণিজ্য ভারসাম্যে। আঞ্চলিক নিরাপত্তায়। দিল্লি সফরের সাফল্য এখানেই মাপা হবে।

বাংলাদেশের জনগণ সম্পর্কের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু আধিপত্যের বিরুদ্ধে। এই পার্থক্য বোঝা জরুরি। জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট ছিল-বাংলাদেশ কারো উপগ্রহ হবে না। কারো প্রভাব বলয়ে থাকবে না। নিজস্ব পথেই চলবে। এখন সেই বার্তার পরীক্ষা চলছে।

দিল্লির আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত হয়-তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ-সিদ্ধান্তের চরিত্র। বাংলাদেশ কি সমান অংশীদার? নাকি ছোট অংশীদার? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই মুহূর্তে দরকার স্বচ্ছতা। দরকার স্পষ্ট অবস্থান। দরকার জনগণের আস্থা। কারণ ইতিহাস বলছে- অস্পষ্ট কূটনীতি সন্দেহ বাড়ায়। গোপন সমঝোতা বিতর্ক তৈরি করে। নির্ভরতার রাজনীতি সংকট ডেকে আনে।

বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটতে পারে না। জুলাইয়ের চেতনা এখনো জীবিত। তরুণ প্রজন্ম নজর রাখছে। তারা প্রশ্ন করছে। এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। দিল্লির পথে ঢাকার কূটনীতি তাই শুধু সফর নয়। এটি একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা। এটি সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা। এটি নতুন সরকারের পরীক্ষা। ফলাফলই বলবে- বাংলাদেশ কি নতুন সমীকরণে প্রবেশ করছে, নাকি পুরনো প্রভাব বলয়ে ফিরে যাচ্ছে।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।