বাংলাদেশের পাহাড়গুলো নীরবে, নি:শব্দে, নিভৃতে কাঁদছে। কাঁদছে সবুজের অবশেষ, কাঁদছে শিকড় উপড়ে ফেলা জীবনের বেদনা। কিন্তু কেউ তাদের সে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। ফলে যে পাহাড়গুলো এক সময় সবুজের বুকে ঢেউ তুলত, বৃষ্টিতে নদী বইয়ে যেত, পাখিরা বাসা বাঁধত, সে পাহাড়গুলো আজ নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার। অথচ পাহাড়কে পৃথিবীর পেরেক বলা হয়, ভারসাম্যের স্তম্ভ বলা হয়। পাহাড় শুধু সৌন্দর্য্যরে প্রতীক নয়; মানবসভ্যতার জীবনন্ত রক্ষাকবচ। পাহাড় কখনো কারও বাড়ি কেড়ে নেয়নি। নেয়নি কারও ফসলি জমি। তারপরও কিছু মানুষ পাহাড়ের সাথে শত্রুতাবশত পাহাড় ধ্বংস করছে। পাহাড় ধ্বংস করাই যেন তাদের কাজ। যদিও পাহাড় বাঁচায় নদীকে। নদী বাঁচায় জমিকে। অথচ পাহাড় কাটার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেশুমার। গাছ কাটলে গাছ লাগিয়ে পুষিয়ে নেয়া যায়। পাহাড় কাটলে আর পাহাড় সৃষ্টি করা যায় না। পাহাড় আল্লাহ তালার এক আশ্চর্য সৃষ্টি। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গার আল্লাহ তায়ালা পাহাড়ের কথা বর্ণনা করেছেন। কুরআনের ৫২তম সূরা আত তূর পাহাড়ের নামে নামকরণ করা হয়েছে। পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য খুঁটির মতো স্থাপন করা হয়েছে বলেও বর্ণনা করা হয়েছে। ভূমিকম্পের বিভীষিকা নিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেছেন- হে মানব সকল, তোমরা ভয় করো তোমাদের রবকে। নিশ্চয়ই কেয়ামত দিবসের ভূম্পন হবে এক মারাত্মক ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, স্তন্যপায়ী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানের কথা ভুলে যাবে আর সব গর্ভবর্তীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। দৃশ্যত মানুষকে মাতালের মতো দেখাবে, আসলে তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ (সুরা হজ, আয়াত: ১-২)। পাহাড়কে ভালাবাসাও সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- এ উহুদের পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও উহুদের পাহাড়কে ভালোবাসি (বোখারি ২/৫৩৬)। অথচ দিনের আলো ফুটলেই পাহাড় কাটার উৎসব শুরু হয়। আর রাত নামলেই মাটি কাটার মেশিন এর গর্জনে পাহাড়ের বুক কেঁপে ওঠে। এ প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন।

পাহাড় কাটলে আমাদের সমস্যা কোথায় এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে! কিন্তু পাহাড় কেটে সমতল ভূমি করা হলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। যার জলন্ত প্রমাণ দেশবাসী গত ২১ নভেম্বর প্রত্যক্ষ করেছে। চোখের পলকের আগেই শহরজুড়ে আতঙ্ক নেমে আসে। কেউ দৌড়াচ্ছে বাইরে, কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, কেউবা উঁচুতলা থেকে লাফ দিয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা করছে। এমন ভয়াবহ ভূমিকম্প এর আগে রাজধানীবাসী দেখেনি। ভূমিকম্পন দেখেছে। কিন্তু এর ভয়াবহ মাত্রা দেখেনি। কেন ভূমিকম্প বাড়ছে? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজলে দেখা যাবে- প্রকৃতিকে ধ্বংস করা, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বেআইনিভাবে বিল্ডিং কোড না মেনে কোন বাছ বিছার না করেই বিল্ডিং নির্মাণ করায় ভূমিকম্পের মাত্র বাড়ছে। পাহাড় কাটা অপরাধ। এটা অবুঝ শিশু বুঝে। কিন্তু স্বার্থের কারণে কিছু মানুষ তা বুঝে না। তারা শুধু বুঝে যেনতেন উপায়ে অর্থ লুটিয়ে নেয়া ফাঁদ। ফলে তাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। অপরদিকে যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের লোকজনই পাহাড় কাটায় জড়িত হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয় না। কারণ অপরাধীরা জানে-শাস্তি তাদের স্পর্শ করবে না। পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে প্রকৃতি তার আপন গতিতে প্রতিশোধ নেবে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর প্রকৃতির প্রতিশোধ দিন তারিখ দিয়ে হয় না। হঠাৎ করে জানান দেয়। তখন আর নিজেদেরকে শোধরে নেয়া যায় না। ফলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প দেখা দেয়।

বাংলাদেশ পাহাড় কাটার প্রবণতা নতুন তা কিন্তু নয়। বহু পুরনো ঘটনা। ইংরেজ শাসনের পর পাকিস্তানের শাসনামাল এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত পাহাড় কাটার উৎসব চলছে। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানের ছোট-বড় পাহাড়গুলো কাটা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। কারণ কেউ এগিয়ে আসছে না। সবাই রাষ্ট্রীয় মাল বলে নিজেদের সুযোগ সুবিধা ভাগিয়ে নিচ্ছে। পাহাড় কাটা শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রের ও ক্ষতি। যে রাষ্ট্রে অনবতর পাহাড় কাটা হয় সে রাষ্ট্র বেশি দূর এগোতে পারে না। তার ভূরি ভূরি উদাহারণ আছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের শাসনামলে বলা হতো দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু পতিত ফ্যাসিস্ট বিদায় নেয়ার পর উন্নয়নের মুখোশ উন্মোচন হয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধ না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় স্বার্থগোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকট আকার ধারণ করায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পাহাড় কাটা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থা পাহাড় কাটতে পারে না। Environment Conservation Act (Amended 2010/2012) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এর বিধান থাকা সত্বেও পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। ফলে পাহাড়ধসে মানুষ হত্যার মিছিল বেড়েই চলছে। নিচে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো- ২০০৭ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বড় দুটি পাহাড়ধসের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ২০০৭ সালে পাহাড়ধসে প্রায় ১২৭ জন এবং ২০১৭ সালের ঘটনায় ৪ সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড়ধসে ৪ জন, ২০১১ সালের ১ জুলাই টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিল পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জন, ২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন চট্রগ্রামে ২৪ জন, ২০১৩ সালের মতিঝরনায় দেয়াল ধসে ২ জন, ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড়ধসে ৩ জন এবং ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্রগ্রামে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখে দেখেনি। ফলে একই ঘটনা বার বার সংঘটিত হচ্ছে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি ঘটনা আগের ঘটনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।

পাহাড় কাটলে শুধু পাহাড়ের ক্ষতি হয়, বিষয়টি এমন নয়! আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে। প্রকৃতি সাথে বিরোধ করে, প্রকৃতির বারোটা বাজিয়ে, প্রকৃতিকে হত্যা করে কোন জাতিই সামনে এগুতে পারে না। যত সামনে এগোতে চায় ততই পেছনে চলে আসে। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারে না। রাষ্ট্র যদি কঠোর হতো তাহলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটা কবেই বন্ধ হয়ে যেত। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে গত দুই দশকে ভূমিধসে শত শত মানুষ মারা গেছে। প্রতিটি ঘটনার মূল কারণ পাহাড় কাটা। পাহাড় কাটা সাধারণ কোন অপরাধ নয়, এটাও ফৌজদারী অপরাধ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে উন্নয়নের নামে বহু বন উজাড় হয়েছে, বহু নদী বিনাস হয়েছে, বহু পাহাড় ধ্বংস হয়েছে। অথচ উন্নয়ন মানে প্রকৃতির সাথে বিরোধিতা নয়। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে পরিবেশ নষ্ট করা যায়। উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায় না। পাহাড় কাটা শুধু প্রকৃতিকে হত্যা করা নয়, মানব সভ্যতাকে হত্যা করার শামিল। যে দেশ পাহাড় রক্ষা করতে পারে না, সে দেশ ভবিষ্যতও রক্ষা করতে পারে না। পাহাড়কে রক্ষা করা কোনো অঞ্চলের বা এলাকার স্বার্থ নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ জড়িত। আজ যে পাহাড় ধ্বংস করা হচ্ছে, কাল সেই ক্ষতি নদী, জমি, শহর সবকিছুতে আঘাত করবে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে টেকস উন্নয়ন হয় না; বরং সে উন্নয়ন একদিন বষার বাদলে ডুবে যায়। তাই পাহাড়কে রক্ষা করা কেবল আইনি বা প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়- ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকার। সুতরাং পাহাড় কাটা বন্ধে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের সদিইচ্ছা থাকলে পাহাড়ের কান্না কিছুটা হলেও থামবে। পাহাড় কাটা মানে শুধু একটি পাহাড়ের মৃত্যু নয়- একটি পরিবেশ ব্যবস্থার ধ্বংস, একটি অঞ্চলের জলবায়ু বিপর্যয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও ওপর অপরাধ। আইন আছে, দণ্ড আছে। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে পাহাড় রক্ষা করা অসম্ভব। এখনই সময় রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবাইকে একসাথে দাঁড়ানোর। পাহাড় না বাঁচলে, জলবায়ু বাঁচবে না; জলবায়ু না বাঁচলে বাংলাদেশও বাঁচবে না। পাহাড় রক্ষা করা মানে আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। তাই পাহাড় বাঁচাতে চাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও কঠোর পদক্ষেপ। অন্যথায় পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।