মু: শফিকুল ইসলাম
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার উচ্চারিত একটি বাক্য-“আমরা এমন নির্বাচন চাই, যেখানে ভয় ও বাধা থাকবে না”- কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জন্য একটি নৈতিক ঘোষণা। এ উক্তির ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জনগণের হতাশা, আস্থাহীনতা এবং একটি সুষ্ঠু ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষা। প্রশ্ন হলো-এ বক্তব্যের বাস্তব অর্থ কী, আর তা বাস্তবায়নের দায় কার?
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচন এখানে প্রায়ই উৎসবের বদলে উৎকণ্ঠার নামান্তর হয়েছে। ভোটের দিন মানেই অনেক এলাকায় আতঙ্ক, কেন্দ্র দখলের শঙ্কা, বিরোধী মতের কর্মীদের ওপর হামলা, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং ভোটারদের নিরুৎসাহ। এমন বাস্তবতায় প্রধান উপদেষ্টার এ বক্তব্য জনগণের দীর্ঘদিনের না-বলা কথাকে রাষ্ট্রীয় উচ্চারণে রূপ দিয়েছে।
ভয়হীন নির্বাচন মানে কেবল ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রের অনুপস্থিতি নয়। ভয়হীনতা একটি বিস্তৃত ধারণা- যেখানে ভোটার নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারেন, প্রার্থী সমান সুযোগ পান, প্রচারে বাধা আসে না, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো দলের ঢাল হয়ে ওঠে না। ভয় তখনই জন্ম নেয়, যখন ক্ষমতার অপব্যবহার হয়; বাধা তখনই আসে, যখন মত প্রকাশকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়।
এ উক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘বাধা’। নির্বাচন বাধামুক্ত হবে-এর অর্থ কেবল রাস্তায় ব্যারিকেড না থাকা নয়। মনস্তাত্ত্বিক বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা, মামলা-হামলা, প্রচার সভায় অনুমতির নামে প্রতিবন্ধকতা- এসবই নির্বাচনের পথে বড় বাধা। বিরোধী রাজনৈতিক দল যদি মাঠেই নামতে না পারে, তাহলে নির্বাচন যতই নিয়মতান্ত্রিক হোক, তা গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে না।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য মূলত রাষ্ট্রের দায় স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচারব্যবস্থার কার্যকর ভূমিকা সবকিছু মিলেই একটি ভয় ও বাধামুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এখানে ব্যর্থতা মানেই গণতন্ত্রের পরাজয়।
একই সঙ্গে এ বক্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা। নির্বাচনকে জিততে হবে জনগণের ভোটে, পেশিশক্তিতে নয়। বিরোধী মতকে দমন করে নয়, যুক্তিতে মোকাবিলা করে। রাজনীতি যদি শত্রু দমনের খেলায় পরিণত হয়, তাহলে নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, গণতন্ত্র সেখানে অনুপস্থিত থাকে।
এ উক্তি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের জন্যও একটি দায়িত্বের আহ্বান। ভয়হীন নির্বাচন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক, সক্রিয় পর্যেবক্ষণ এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না থাকলে ভয় নির্মূল হয় না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জনগণের আস্থা। গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া ছিল একটি নীরব প্রতিবাদ। মানুষ ভোট দিতে চায়, কিন্তু ভোট দিতে গিয়ে অপমানিত বা আতঙ্কিত হতে চায় না। প্রধান উপদেষ্টার এ বক্তব্য যদি বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেয়, তবে সেটিই হবে ভোটার আস্থা ফেরানোর প্রথম ধাপ।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, “ভয় ও বাধাহীন নির্বাচন- কোনো অলঙ্কারিক স্লোগান নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার এই উক্তি সময়োপযোগী, সাহসী এবং প্রত্যাশাবহ। এখন প্রয়োজন- কথার সঙ্গে কাজের মিল। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না। এ সত্য উপলব্ধি করেই জাতি আজ অপেক্ষা করছে- একটি নির্বাচনের, যেখানে ভোট হবে অধিকার; ভয় নয়, হবে উৎসব।
লেখক : প্রাবন্ধিক।