পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক পিতা-পুত্রের সম্পর্কগুলোর একটি হলো মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) এবং তার পুত্র ইসমাইল (আ.) এর মধ্যকার সম্পর্ক। একজন পিতা আল্লাহর আদেশে নিজের সন্তানকে কুরবানি করার জন্য প্রস্তুত, আর একজন সন্তানও বিনা দ্বিধায় নিজেকে আল্লাহর পথে সোপর্দ করতে প্রস্তুত। প্রকৃতপক্ষে, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) এর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মিরাকল ছিল তাঁর কুরবানির ঘটনা। ইবরাহীম (আ.) দীর্ঘদিন সন্তানহীন ছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেন। তিনিই হলেন ইসমাইল (আ.) আর এ ইসমাইল (আ.) এর বংশীয় ধারা থেকেই আমাদের রাসুল (সা.) এরও দুনিয়ায় আবির্ভাব।

ইবরাহীম (আ.) এর কুরবানির মাত্রা চিন্তা করলেও অবাক হতে হয়। এত সাধনার পর পাওয়া এ ছেলে যখন এমন বয়সে পৌঁছাল যে বাবার সঙ্গে চলাফেরা ও কাজকর্মে সাহায্য করতে পারে, ঠিক সে মুহূর্তে ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি তাঁর ছেলেকে কুরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্নকে ওহি হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই তিনি এটিকে আল্লাহর নির্দেশ হিসেবেই গণ্য করেছিলেন। পরীক্ষাটি ইসমাইল (আ.) এর জন্যও কোনো অংশে কম ছিল না। পিতা যেমন পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। সন্তানও তার জন্য প্রস্তত হয়েছিলেন। সুরা আস সাফফাতে ১০০-১১১ নং আয়াতে বর্ণিত ঘটনাবলী থেকে জানা যায়, ইবরাহীম (আ.) সরাসরি জোর করে ছেলেকে কুরবানি করতে যাননি। বরং ছেলেকে বিষয়টি খুলে বলেন:

“হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন বলো তুমি কি চাও। উত্তরে ইসমাইল (আ.) বলেছিলেন, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” এরপর দুজনই আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইবরাহীম (আ.) যখন বাস্তবে কুরবানি কার্যকর করতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তাঁকে থামিয়ে দেন এবং পরিবর্তে একটি মহান কুরবানির পশু দেন।

এ বংশধারা থেকে আগত আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) এবং তার আহলে বাইতরাও একই ধরনের কুরবানি করে গেছেন। আমার বিবেচনায় এটি তাই কেবল বংশীয় পরম্পরা নয় বরং কুরবানিরও পরম্পরা ও ধারাবাহিকতা। নবিজি (সা.) এর সকল সন্তান তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ফাতিমা (রা.) যিনিও তাঁর ইন্তিকালের পরপরই ইন্তিকাল করবেন- খোদ রাসুল (সা.) নিজেই তা বলে গিয়েছিলেন। একজন পিতার জন্য এটি কতই না মর্মান্তিক। এখানেই শেষ নয়। মুসনাদে ইমাম আহমাদ বিন হান্বাল এর ২৬৫২৪ সূত্রে আরেকটি হাদিসও জানা যায়। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সা.) তাকে বলেছিলেন, “এইমাত্র একজন ফেরেশতা আমার ঘরে প্রবেশ করেছিলেন যে এর আগে কখনো আসেনি। তিনি বললেন, ‘আপনার অতি আদরের নাতি হুসাইনও শহীদ হবে। চাইলে আমি তোমাকে সেই জমিনের মাটি দেখাতে পারি যেখানে তাকে হত্যা করা হবে।’ এরপর সে লাল মাটি বের করে দেখাল।”

অর্থাৎ রাসুল (সা.) কারবালার মাটিও দেখে গিয়েছিলেন। তার নাতিকে তারই উম্মতের সদস্যার হত্যা করবেন-এ কঠিন সত্যটাও জেনে গিয়েছিলেন। যে কোনো মানুষের জন্যই আপনজনদের হত্যাকাণ্ডের এরকম আগাম খবর জানা নি:সন্দেহে বেদনার। ইতিহাসের একটি অনিবার্য বাস্তবতা হলো, ইবরাহীম (আ.) তার ছেলেকে কুরবানি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন ১০ জিলহজ্জ। আর হাজার বছর পর এসে ১০ মহররম নবিজি (সা.) এর নাতি, জান্নাতের যুবকদের সর্দার হুসাইন বিন আলী রা. নিজের জীবন কুরবানি করে যান। তাকেও পশুর মতো গলা কেটে হত্যা করা হয়।

প্রশ্ন হলো, কেন ইবরাহীমী ঘরের সন্তানরা আল্লাহর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত হতে পারলো, কিংবা কেনই বা জান্নাতের নারীদের সর্দার ফাতিমা রা. তার পুত্রদ্বয় যারা একইসাথে জান্নাতের যুবকদের সর্দার হিসেবে স্বীকৃত; তাদেরকেও শহীদ হওয়ার প্রেরণায় উজ্জীবিত করে গেলেন আর এর বিপরীতে আমাদের ঘরের বহু সন্তান সামান্য কষ্ট, সামান্য ত্যাগ, সামান্য দ্বীনি দায়িত্বের কাছেও অস্বস্তি অনুভব করে? কেন আমাদের সন্তানেরা শাহাদাতের আকাক্সক্ষা নয়, বরং বিলাসিতা, ক্যারিয়ার-উন্মাদনা, ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা বড় হয়ে উঠছে? কেন উম্মতে মুহাম্মাদীর সন্তান হয়েও তারা দ্বীনের জন্য “কি দিতে পারি” এই প্রশ্নের বদলে “কি পেতে পারি” এ মানসিকতায় গড়ে উঠছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের প্যারেন্টিংয়ের দিকে তাকাতে হবে। প্রথমত, আমরা সন্তানদেরকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে নয়, বরং নিজেদের স্বপ্নপূরণের প্রকল্প হিসেবে বড় করছি। ইবরাহীম (আ.) সন্তানকে কখনোই নিজের সম্পদ মনে করেননি; তিনি তাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখেছেন। তাই আল্লাহ যখন সেই আমানতটি ফেরত চাইলেন, সাথে সাথেই ইবরাহীম (আ.) তা ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আমরা এক্ষেত্রে হজরত আলী (রা.) এর দৃষ্টান্তও বিবেচনায় আনতে পারি। যখন মক্কার কুরাইশরা রাসুলে কারীম (সা.) কে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন হজরত আলী (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই রাসুল (সা.) এর বিছানায় শুয়ে পড়েছিলেন, যেন শত্রুরা মনে করে রাসুল এখনো ঘরে আছেন। তিনি জানতেন, যে কোনো মুহূর্তে তরবারির আঘাতে তাঁর মৃত্যু হতে পারে। তবুও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছিলেন। এটি শুধু সাহসের ঘটনা ছিল না; বরং এমন এক ঈমানি মানসিকতার দৃষ্টান্ত, যেখানে নিজের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলের মিশন। ফলে, তার এবং হজরত ফাতিমা (রা.) এর সন্তানেরাও ইসলামের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্বার্থে জীবন বিসর্জন দিতে ভয় পাবে না- এটিই স্বাভাবিক।

পক্ষান্তরে আজ আমরা সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলি যেন তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় সামাজিক প্রতিষ্ঠা, উচ্চ বেতন, আরামদায়ক জীবন ও ব্যক্তিগত সাফল্য। ছোটবেলা থেকেই আমরা বলি, “ভালো চাকরি করতে হবে”, “বড় মানুষ হতে হবে”, “অনেক টাকা আয় করতে হবে”; কিন্তু খুব কম পরিবারেই বলা হয়, “আল্লাহর জন্য বাঁচতে হবে”, “উম্মাহর জন্য কিছু করতে হবে”, “দ্বীনের জন্য ত্যাগ শিখতে হবে”। ফলে সন্তানদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহ নয়, দুনিয়া বসে যায়। দ্বিতীয়ত, আমরা সন্তানদেরকে ভোগের সংস্কৃতিতে বড় করছি। ইবরাহীমী পরিবার ছিল তাওয়াক্কুল, সবর ও মুজাহাদার পরিবার। আর আজকের বহু পরিবার হয়ে উঠেছে ভোগ, প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের পরিবার। সন্তান কষ্ট পাবে, এটা আমরা মানতেই চাই না। তাকে সবকিছু সহজ করে দিতে চাই। অল্প বয়সেই দামি মোবাইল, বিলাসী জীবনযাপন, অতিরিক্ত বিনোদন, সীমাহীন ইন্টারনেট আসক্তিÑসবকিছু তার সামনে খুলে দিচ্ছি। ফলে তার নফস শক্তিশালী হচ্ছে, রূহ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। যে সন্তান ছোটবেলা থেকে কষ্ট সহ্য করতে শেখেনি, সে বড় হয়ে ত্যাগের সৈনিক হবে কীভাবে?

তৃতীয়ত, আমাদের পরিবারগুলোতে দ্বীনের আবেগ নয়, দ্বীনের আনুষ্ঠানিকতা বেশি দেখা যায়। আমরা সন্তানকে নামাজ শিখাই, কিন্তু নামাজের খুশ ও খুজু শিখাই না। কুরআন পড়াই, কিন্তু কুরআনের মিশন বোঝাই না। ইসলামের ইতিহাস পড়াই না, সাহাবীদের ত্যাগের গল্প তাদের সামনে উপস্থাপন করি না। শহীদদের জীবন নিয়েও আলোচনা করি না। ফলে ইসলাম তার কাছে অন্য সব ধর্মের মতো নিছক একটি ধর্মই হয়ে থাকে। জীবনজুড়ে চালিয়ে যাওয়ার মতো মিশন আর হয়ে ওঠে না। অথচ একটি সময়ে মুসলিম শিশুদের শৈশব শুধু গল্পে ভরপুর ছিল না; বরং তা ছিল ঈমান, সাহস, ত্যাগ ও উম্মাহচেতনার এক জীবন্ত পাঠশালা। তাদের কানে, মুখে আর হৃদয়ে ছিল বদরের ঐতিহাসিক যুদ্ধের সে অবিশ্বাস্য বিজয়ের কথা, যেখানে সংখ্যায় অল্প, অস্ত্রে দুর্বল একদল সাহাবী শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন। তাদের সামনে ছিল ওহুদের যুদ্ধের শিক্ষা, যেখানে সাময়িক পরাজয়ের মধ্যেও আনুগত্য, ত্যাগ ও নবীপ্রেমের সর্বোচ্চ উদাহরণ রচিত হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা শৈশব থেকেই জানতেন যে, কীভাবে হজরত আলী (রা.) তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.), নুসাইবা (রা.) এর সাহাবাগণ নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়ে রাসুল (সা.) কে রক্ষা করেছিলেন। কিংবা কীভাবে হজরত হামজা (রা.) এর দুঃসাহসী সাহাবাগণ নিজের জীবন দিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তাদের কাছে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) কিংবা সাদ ইবনে মুআজ (রা.) এর ঘটনাও ছিল প্রেরণার উৎস।

এর বাইরে মুসলিম সাহিত্য এমনকী যদি আমরা আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আলাওল বা হায়াত মাহমুদসহ অনেক সাহিত্যিক কয়েকশ বছর আগেই ইসলামের ইতিহাসের বিয়োগাত্মক সব ঘটনাবলী নিয়ে গল্প, উপন্যাস বা কবিতা রচনা করে গেছেন। কারবালার ঘটনা নিয়ে বিষাধ সিন্ধুও অনবদ্য একটি সৃষ্টি ছিল। যদিও সাহিত্যকর্ম করতে গিয়ে এই বইগুলোতে কিছু অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে তারপরও এটি মানতেই হবে যে, ঔপনিবেসিক শক্তি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে এই জনপদে মুসলিমর বীরেরা যেসব প্রয়াস চালিয়েছিলেন, সেগুলোর নেপথ্যে এই সাহিত্যকর্ম, পুর্ঁথি ও জারি গানের ভূমিকা ছিল। কেননা, কারবালা মুসলিমদের কাছে কখনোই নিছক একটি যুদ্ধ ছিল না; বরং ছিল সত্য ও জুলুমের মধ্যকার চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। কীভাবে অত্যাচারের সামনে মাথা নত না করে হুসাইন ইবনে আলী (রা.) নিজের পরিবার, সন্তান ও সাথীদের নিয়ে শাহাদাতকে বেছে নিয়েছিলেন, সে কাহিনি মুসলিম শিশুদের হৃদয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস তৈরি করত।

বিয়োগাত্মক ঘটনাবলীর পাশাপাশি মুসলিমদের অর্জনগুলোও একটি সময়ে সন্তানদের সামনে তুলে ধরা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের সাথে আলাপ করে এই ধরনের জ্ঞানের ঘাটতি দেখতে পাই। অনেকেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সালাহ আল দ্বীনের বিজয়ের কথা জানে না। বর্তমানে তথাকথিত উপনিবেশ না থাকলেও বাংলাদেশ যেভাবে অক্টোপাসের জালের মতো পরাশক্তির নেটওয়ার্কের ফাঁদে আঁটকা পড়ে আছে তা নিয়ে সচেতনতার অভাব হওয়ার একটি বড়ো কারণ হলো ইসলামের কুরবানি ও অর্জনের ইতিহাসের বিষয়ে নবীন প্রজন্মের মুসলিমদের উন্নাসিকতা। মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা সভ্যতার আজকের এ কাঠামো বিনির্মাণে কীভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন তা নিয়েও বড়ো ধরনের ধুম্রজাল রয়েছে। মুসলিম ছেলেমেয়েরা তাদের কারিকুলামে পশ্চিমা বই, ঔপনিবেসিক চেতনা পাঠ করার কারণে তারাও মুসলিমদের সোনালী যুগকে ডার্ক এইজ হিসেবেই জানছে- এর চেয়ে লজ্জার ও অপমানের আর কী হতে পারে!

ইসলামের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল ঈমানের মূল্য, আত্মত্যাগের সৌন্দর্য ও আখিরাতমুখী জীবনের শিক্ষা। ফলে মুসলিম শিশু “বড় হওয়া” বলতে কেবল ধনী হওয়াকেই বুঝতো না; বরং দ্বীনকে কীভাবে আরো সমৃদ্ধ করা যায় তা অনুধাবন করতো। আর তাদের সামনে প্রেরণার উৎস হয়ে ছিলেন আমাদের রাসুল (সা.), তার আহলে বাইত, সাহাবাগণ, আলেম, মুজাহিদ ও শহীদরা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের শিশুদের শৈশব দখল করে নিয়েছে অন্য এক জগৎ। তাদের সামনে ইতিহাসের বীর নয়, বরং বিনোদন জগতের সেলিব্রিটি; ত্যাগের গল্প নয়, বরং বিলাসিতার প্রদর্শনী; উম্মাহর বেদনা নয়, বরং ব্যক্তিগত আনন্দের সংস্কৃতিগুলোই তুলে ধরা হচ্ছে। এক সময়ের মুসলিম শিশুরা বদরের ৩১৩ জন সাহাবীর নাম জানত, এখন তারা প্রিয় ফুটবল ক্লাবের স্কোয়াডের নাম মুখস্থ রাখে। আগে তারা উহুদের শহীদদের নিয়ে আবেগাপ্লুত হতো, এখন তারা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড নিয়ে উত্তেজিত হয়। আগে তারা সালাহউদ্দীনের জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ইতিহাস শুনে চোখে স্বপ্ন আঁকত, এখন তারা বিদেশি ব্র‍্যান্ড, বিলাসী জীবন আর ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার স্বপ্ন দেখে।

নির্মম হলেও সত্য হলো, যে হৃদয় প্রতিদিন দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতার খাদ্য পায়, সে হৃদয়ে শাহাদাতের তামান্না জন্ম নেওয়া কঠিন। কারণ শাহাদাতের আকাক্সক্ষা শুধু স্লোগান থেকে জন্ম নেয় না; এটি জন্ম নেয় এমন এক পরিবেশে, যেখানে মানুষ শিখে যে সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করা সম্মানের, দ্বীনের জন্য ত্যাগ করা সৌভাগ্যের, আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনে লেখাটি শেষ করি। মনে রাখবেন, সন্তানেরা আমাদের মুখের ভাষার চেয়ে জীবনের ভাষায় বরং বেশি শেখে। আমরা যদি সবসময় নিরাপত্তা, অর্থ, আরাম ও সামাজিক মর্যাদা নিয়েই ব্যস্ত থাকি, তাহলে সন্তানও সেটাই শিখবে। আমরা যদি দ্বীনের জন্য কোনো ত্যাগ না করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পাই, ইসলামী মূল্যবোধের জন্য কোনো মূল্য না দিতে পারি, তাহলে সন্তান কেন ত্যাগী হবে? আমরা সন্তানদেরকে দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় সফল করার জন্য যতটা চিন্তিত, আখিরাতের সফলতার জন্য ততটা নই। আমরা তাদেরকে বিদেশে পড়াতে প্রস্তুত, কিন্তু দ্বীনের জন্য তারা সময় দিক, কুরবানি করুক- এমনটা চিন্তা করতেও ভয় পাই। আমরা চাই তারা ধনী হোক, কিন্তু খুব কম মানুষই চায় তার সন্তান আল্লাহর দ্বীনের একজন মুজাহিদ, দায়ী বা সত্যের সাহসী কণ্ঠস্বর হোক।

তবে শেষ কথা হলো, পরিবর্তনের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। সন্তানদের পরিবর্তন করতে হলে আগে পরিবারে পরিবর্তন আনতে হবে। ঘরে কুরআনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। নবী-রাসুল ও সাহাবীদের জীবনীকে শিশুদের মানসিক শিক্ষার মূল উপকরণে পরিণত করতে হবে। সন্তানকে শুধু বৈষয়িক অর্থে সফল মানুষ নয়, বরং আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে হবে। তাকে কষ্ট সহ্য করতে শেখাতে হবে, দায়িত্ব নিতে শেখাতে হবে, উম্মাহর বেদনা অনুভব করতে শেখাতে হবে। কারণ যে ঘরে বৈষয়িক অর্জনই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়, সে ঘরে ইসমাঈল বা হুসাইন জন্ম নেয় না। এ ধরনের সন্তান জন্ম নেয় সে ঘরে, যে ঘরের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় হলোÑ“ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রব্বিল আলামিন।”