জাফর আহমাদ

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর কাছে তাওবা করো, প্রকৃত (পরিশুদ্ধ) তাওবা। অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদের দোষত্রুটিসমূহ দূর করে দিবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে ঝরণাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। সেটি হবে এমন দিন যেদিন আল্লাহ তাঁর নবী এবং নবীর সঙ্গী ঈমানদারদের লাঞ্জিত করবেন না। তাদের নুর তাদের সামনে ও ডান দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকবে এবং তারা বলতে থাকবে হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের নুর পুর্ণাঙ্গ করে দাও ও আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। তুমি সব কিছু করতে সক্ষম।” (সুরা আত-তাহরিম : ৮)

আয়াতের শুরুতে তাওবাতুন নাসুহা শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় তাওবাতুন অর্থ ফিরে আসা। নাসুহা শব্দটি তাওবাতুন এর বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় নাসহুন অর্থ নিস্কলুষতা ও কল্যাণকামিতা। খাঁটি মধু যা মোম ও অন্যান্য আবর্জনা থেকে মুক্ত করা হয়েছে তাকে আরবীতে ‘আ’সলুন নাসিহুন” বলা হয়। ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে দেয়া এবং ফাঁটা কাপড় ঠিক করে দেয়া বুঝাতে আরবী ‘নাসাহাতুস সাউবে’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। অতএব তাওবা শব্দের সাথে নাসুহুন বিশেষণ যুক্ত করলে তার আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় ‘এমন তাওবা যার মধ্যে প্রদর্শনী বা মুনাফিকীর লেশমাত্র নেই। অথবা তার অর্থ হবে গোনাহ থেকে তাওবা করে নিজেকে মন্দ পরিণাম থেকে রক্ষা করবে। অথবা অর্থ হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের কল্যাণ কামনা করবে এবং গোনাহ থেকে তাওবা করে নিজেকে মন্দ পরিণাম থেকে রক্ষা করবে। অথবা তার অর্থ হবে গোনাহের কারণে তার দীনদারীর মধ্যে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে তাওবা দ্বারা তা সংশোধন করবে। অথবা সে তাওবা করে নিজের জীবনকে এমন সুন্দর করে গড়ে তুলবে যে, অন্যের জন্য সে উপদেশ গ্রহণের কারণ হবে এবং তাকে দেখে অন্যেরাও তার মত নিজেদেরকে সংশোধন করবে।

নাসূহা শব্দটি নাসাহুন থেকে মোবালেগা অর্থাৎ জোরদার ও প্রগাঢ়তার অর্থবোধক বিশেষ্য। যার অর্থ খাঁটি, বিশুদ্ধ, আন্তরিক বিশ্বস্থ ও সৎ। অভিধানে এসেছে ‘কুল্লু শাইয়িন খালসুন ফাকাদ নাসাহা অর্থাৎ’ প্রতিটি খাঁটি বস্তুই নাসূহ। তাই মহান আল্লাহ আল কুরআনে তাওবা সিফাত বা বৈশিষ্ট্য হিসাবে এটির ব্যবহার করেছেন।

তাওবাতুন নাসুহা-এর আভিধানিক অর্থ থেকে এ অর্থসমূহই প্রতিভাত হয়। এরপর অবশিষ্ট থাকে তাওবায়ে নাসূহ এর শরয়ী অর্থ। আমরা বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসের আলোকে এর শরয়ী অর্থের যে ব্যাখ্যা পাই, তাহলো, যির ইবনে হুবাইশের মাধ্যমে ইবনে আবী হাতেম কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস থেকে। যির ইবনে হুবাইশ বলেন: আমি উবাই ইবনে কা’ব (রা:)-এর কাছে ‘তাওবায়ে নাসূহ’ এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ সা: কে একই প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বললেন: এর অর্থ হচ্ছে, কখনো তোমার দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হলে তুমি নিজের গোনাহের জন্য লজ্জিত হবে। তারপর লজ্জিত হয়ে সে জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ঐ কাজ করো না। হযরত উমার (রা:), হযরত আবদুল্লাহ (রা:), ইবনে মাসউদ এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকেও এ অর্থই উদ্ধৃত হয়েছে। অন্য এক বর্ণনা অনুসারে হযরত উমর (রা:) ‘তাওবায়ে নাসূহ’ এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: তাওবার পরে পুনরায় গোনাহ করা তো দূরের কথা তা করার আকাক্সক্ষা পর্যন্ত করবে না। (ইবনে জারীর)

হযরত আলী (রা:) একবার এক বেদুঈনকে মুখ থেকে ঝটপট করে তাওবা ইসতেগফারের শব্দ উচ্চারণ করতে দেখে বললেন, এতো মিথ্যেবাদীদের তাওবা। সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে সত্যিকার তাওবা কি? তিনি বললেন, সত্যিকার তাওবার সাথে ছয়টি জিনিস থাকতে হবে (১) যা কিছু ঘটেছে তার জন্য লজ্জিত হও (২) নিজের যে কর্তব্য ও করণীয় সম্পর্কে গাফলতী করছো তা সম্পাদন করো। (৩) যার হক নষ্ট করেছো তা ফিরিয়ে দাও। (৪) যাকে কষ্ট দিয়েছো তার কাছে মাফ চাও। (৫) প্রতিজ্ঞা করো ভবিষ্যতে এ গুনাহ আর করবে না। এবং (৬) নফসকে এতদিন পর্যন্ত যেভাবে গুনাহের কাজে অভ্যস্ত করেছো ঠিক তেমনি ভাবে নিজেকে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত করো। এতদিন পর্যন্ত নফসকে যেভাবে আল্লাহর অবাধ্যতার মজায় নিয়োজিত রেখেছিলে এখন তাকে তেমনি আল্লাহর আনুগত্যের তিক্ততা আস্বাদন করাও। (কাশশাফ)

মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ: ‘মাআরিফুল কুরআন’ এর মাঝে সংক্ষেপে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘নাসুহুন’ শব্দটি ‘নাসহাতুন’ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ খাঁটি করা। ‘তাওবাতুন নাসুহা’ এর অর্থ, এমন তাওবা, যা রিয়া ও নাম যশ থেকে খাঁটি। কেবল আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন ও আযাবের ভয়ে ভীত হয়ে এবং গুনাহের কারণে অনুতপ্ত হয়ে গুনাহ পরিত্যাগ করা। (মাআরিফুল কুরআন, বাংলা সংস্করণ-পৃষ্ঠা ১৩৮৮)

তাওবা সম্পর্কিত বিষয়ে আরো কয়েকটি জিনিস ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। প্রথমত: প্রকৃতপক্ষে তাওবা হচ্ছে কোন গুনাহের কারণে এ জন্য লজ্জিত হওয়া যে, তা আল্লাহর নাফরমানী। কোন গুনাহের কাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বদনামের কারণ অথবা আর্থিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় তা থেকে বিরত থাকার সংকল্প করার তাওবার সংজ্ঞায় পড়ে না।

দ্বিতীয়ত: যখনই কেউ বুঝতে পারবে যে, তার দ্বারা আল্লাহর নাফরমানি হয়েছে, তার উচিত তৎক্ষণাৎ তাওবা করা এবং যেভাবেই হোক অবিলম্বে তার ক্ষতিপূরণ করা কর্তব্য, তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

তুতীয়ত: তাওবা করে বার বার তা ভঙ্গ করা, তাওবাকে খেলার বস্তু বানিয়ে নেয়া এবং যে গুনাহ থেকে তাওবা করা হয়েছে বার বার তা করতে থাকা তাওবা মিথ্যা হওয়ার প্রমাণ। কেননা, তাওবার প্রাণ সত্তা হচ্ছে, কৃত গুনাহ সম্পর্কে লজ্জিত হওয়া কিন্তু বার বার তাওবা ভঙ্গ করা প্রমাণ করে যে, তার মধ্যে লজ্জার অনুভূতি নেই।

চতুর্থত, যে ব্যক্তি সরল মনে তাওবা করে পুনরায় ঐ গুনাহ না করার সংকল্প করেছে, মানবিক দুর্বলতার কারণে যদি পুনরায় তার দ্বারা সেই গুনাহের পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে এ ক্ষেত্রে পুর্বেও গুনাহ পুনরুজ্জীবিত হবে না তবে পরবর্তী গুনাহের জন্য তার পুনরায় তাওবা করা উচিত।

পঞ্চমত: যখনই গুনাহর কথা মনে পড়বে তখনই নতুন করে তাওবা করা আবশ্যক নয়। কিন্তু তার প্রবৃত্তি যদি পূর্বের পাপময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে আনন্দ পায় তাহলে গুনাহের স্মৃতিচারণ তাকে আনন্দ দেয়ার পরিবর্তে লজ্জাবোধ সৃষ্টির কারণ না হওয়া পর্যন্ত তার বার বার তাওবা করা উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে তাওবা করেছে সে অতীতে আল্লাহর নাফরমানি করেছে এই চিন্তা করে কখনো আনন্দ অনুভব করতে পারে না। তা থেকে মজা পাওয়া ও আনন্দ অনুভব করা প্রমাণ করে যে, তার মনে আল্লাহর ভয় শিকড় গাড়তে পারেনি।

তওবায়ে নাসূহ তথা নিখাদ ও একনিষ্ঠ চিত্তে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে প্রকৃত আল্লাহভীতির সাথে তাওবা করা। তাফসীরে তবারীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমনভাবে তাওবা করা যে, পরবর্তিতে আর সে উক্ত গুনাহে লিপ্ত হবে না। হাসান বসরী রাহ: বলেন-তাওবায়ে নাসূহ হলো, গুনাহ বর্জন করা এবং সাথে সাথে এই সংকল্প করা যে, আর এ গুনাহ করবে না। শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকী-হাদীস নং ৬৬৩৬) ইবনে কাসীর এ বিষয়ে বিভিন্ন সাহাবী-তাবেয়ীর বক্তব্য উল্লেখ করার পর বলেন,‘এ কারণেই উলামায়ে কেরাম বলেন, তাওবায়ে নাসূহ হল, গুনাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। অতীতের গুনাহের ব্যাপারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া। ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা। আর গুনাহটি যদি বান্দার হক সংক্রান্ত হয় তাহলে যথাযথ পন্থায় হক আদায় করা।’ সকল ইসলামী স্কলারগণ একটি কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন যে, “খাঁটি ও আন্তরিকভাবে গুনাহ পরিত্যাগ করা এবং তাতে আর কখনো ফিরে না যাওয়া।” অর্থাৎ যে নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে এ পাড়ে এসেছেন সেই নৌকা পুড়িয়ে দিতে হবে যাতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার সুযযোগ না থাকে।

তার মানে তাওবায়ে নাসুহায় তিনটি শর্ত উপস্থিত থাকতে হবে। যথা: (১) গুনাহ থেকে সম্পুর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে ও তা বর্জন করতে হবে। (২) কৃত গুনাহ এর জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। (৩) আগামীতে গুনাহ না করার প্রতি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। আর যদি কোন মানুষের ওপর জুলুম করা হয়ে থাকে তাহলে তার নিকট থেকে ক্ষমা নিতে হবে। কেননা দুনিয়াতে ক্ষমা না চাইলে কিংবা তার হক ফেরত না দিলে হাশরের ময়দানে সে জুলুমের বদলা দাবি করবে। বুখারীর কিতাবুল মাযালিমে উল্লেখ রয়েছে নবী সা: বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোন বিষয়ে অত্যাচারের জন্য দায়ী সে যেন সেই দিন আসার আগে আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়, যেদিন কোন দিনার বা দেরহাম থাকবে না।”

‘তাওবাতুন নাসুহা’ খাঁটিভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং কোনদিন কৃত সেই গুনাহের দিকে কখনো ফিরে না যাওয়া এমনকি মনে মনে সেই গুনাহের চিন্তাও না করা।

লেখক : ব্যাংকার।