আসিফ আরসালান

আজ নয়, অনেক দিন আগে যখন স্কুলে ক্লাস নাইন অথবা টেনে পড়তাম তখন থেকে খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস হয়। তখন দেশে দুটি প্রধান বাংলা সংবাদপত্র ছিলো দৈনিক ‘আজাদ’ ও দৈনিক ‘ইত্তেফাক’। তখন পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতাম। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংবাদ ভালো বুঝতাম না। কলেজে যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি তখন পত্রিকার কলাম পড়া শুরু করি, যদিও তখনো সেগুলো ভালো ভাবে বুঝতাম না। ইন্টারমিডিয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। অর্থনীতিতে অনার্স থাকলেও সাবসিডিয়ারি হিসাবে নেই ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান আমার সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট হলেও বিষয়টিতে খুব ইন্টারেস্ট পেতাম। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সভা হতো। এসব সংগঠনের মধ্যে ছিলো ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এনএসএফ), পাকিস্তান ছাত্রশক্তি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (এফসু), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ইসলামী ছাত্র সংঘ। ছাত্রজীবনেই কয়েকটা ইস্যুর ন্যায্যতা মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। এগুলো হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, রেডিও এবং টেলিভিশনের স্বাধীনতা ইত্যাদি।

২৪ বছর টিকে থাকার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন হয়। নাম হয় বাংলাদেশ। পাকিস্তান আমলে ছাত্রসংগঠন গুলো বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও এফসু বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সব সময় জোরদার বক্তব্য রেখেছে। এসব বিষয়ের স্বাধীনতা সম্পর্কে তৎকালীন দৈনিক ‘ইত্তেফাকের’ মালিক ও সম্পাদক মরহুম তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা তার কলামে নিয়মিত জোরদার দাবি রেখেছেন। তার কলামটির নাম ছিলো ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’। তিনি লিখতেন ছদ্ম নামে। সে নামটি ছিলো ‘মোসাফির’। ঐসব ইস্যুর সাথে আরেকটি ইস্যু রীতিমতো নৈমিত্তিক ইস্যু হয়ে ওঠে। সেটি হলো, পাকিস্তানের জন্য একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র। তখন কনস্টিটিউশনের বাংলা বলা হতো শাসনতন্ত্র। বাংলাদেশ হওয়ার পর সেটিকে বলা হয়, সংবিধান।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পর ৫৫ বছরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দেখছি, ঐসব ইস্যুর কোনোটিরই স্থায়ী সমাধান হয়নি। গণতন্ত্র এবং পূর্ব বাংলার (১৯৫৬ সালের পর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান) স্বায়ত্ত্বশাসন প্রশ্নে শেষ পর্যন্তও কোনো সর্বজন গ্রহনযোগ্য ফয়সালা হয়নি। এ দুটি ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ভেঙে গেলো এবং পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে বাংলাদেশ হলো।

সভাবতই আশা করা হয়েছিলো যে, যেসব দাবি দাওয়া পাকিস্তান সরকার মানেনি সেইসব দাবি দাওয়া অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশে পূর্নভাবে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু আফসোস, ৫৪ বছরে এসেও সে আগের দাবি গুলো নিয়েই রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে বিতর্ক চলছে। এ যেমন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর যখন এ কলামটি লিখছি তখন অনলাইন সংবাদপত্র সমূহে দেখলাম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে বর্তমান বিএনপি সরকার কর্তৃক জাতীয় সংসদে ইউনূস সরকারের দু’টি অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য ওয়াক আউট করেছেন। আর সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে ফারাক দিনের পর দিন বড় হচ্ছে। এখন ঐ ফারাকটি এমন একটি অবস্থায় গিয়েছে যেটি আমার কাছে মনে হচ্ছে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন অবস্থা।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিপ্লবী সরকার ছিলো না। আবার বিপ্লবের একদিন পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৬ অগাস্ট আওয়ামী লীগের ‘আমি আর ডামি’র তথা কথিত জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ড. ইউনূস ও তার ইন্টারিম সরকার ১৮ মাস দেশের দায়িত্বে ছিলো। সংগত কারণেই তাদেরকে জরুরি প্রয়োজনে অধ্যাদেশ জারি করতে হতো। তেমনি ১৮ মাসে ইউনূস সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দেওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হলে স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারিম সরকার বিদায় নেয়। সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসাবে সরকার গঠন করে বিএনপি। সরকার গঠনের দিন অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের দিন থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রশ্নে বিএনপি এবং বিরোধী দল সমূহের সাথে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। অনেক গুলো বিষয়েই মতানৈক্য হয়। তবে সব গুলি বিষয়কে সংক্ষেপ করে এনে বলা যায় যে, বিতর্কটি কেন্দ্রীভূত হয় ব্যাপক ভাবে একটি ইস্যুতে। সেটি হলো, সাংবিধানিক সরকার বনাম গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের সরকার। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, সংবিধান সংশোধন বনাম সংবিধান সংস্কার। ব্রড স্পেক্ট্রামে এর মধ্যে আছে অনেক গুলি বিষয়। এই সরকার গঠনের পর থেকেই যেসব আলামত দেখতে পাচ্ছি তাতে তো মনে হচ্ছে যে এ সংবিধান সংশোধন বনাম সংবিধান সংস্কার ইস্যু নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও বিরোধ চলতে পারে।

এ বিরোধ জাতীয় সংসদে ফয়সালা করার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ বিএনপির এ্যাটিচুড দেখে মনে হচ্ছে, তারা সব কিছু তাদের মন মতো সংসদে পাশ করিয়ে নেবে। কারণ সংসদে তাদের রয়েছে ব্রুট মেজরিটি। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটি। গত বৃহস্পতিবারও তারা এমন দুটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে যে অধ্যাদেশ গুলি জনগণের ৭২ বছরের (পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং বাংলাদেশের ৫৪ বছর) আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলো। এসব অধ্যাদেশ এ পার্লামেন্ট আইনে পরিণত করবে, এটিই ছিলো দেশবাসীর প্রত্যাশা। কিন্তু কাজ হয়েছে তার ঠিক উল্টোটি। জুলাই বিপ্লবের প্রধান জনআকাক্সক্ষাই ছিলো আর যেনো ফ্যাসিবাদি স্বৈরাচার ফিরে না আসে। সেজন্য থাকবে সাংবিধানিক রক্ষা কবচ।

যে দুটি অধ্যাদেশ ব্রুট মেজরিটির জোরে বৃহস্পতিবার বিএনপি সরকার বাতিল করলো তার একটি হলো, সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ। আর একটি হলো, সুপ্রীমকোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। এ দুটি দাবিই কিন্তু সে পাকিস্তান আমল থেকেই শুনে আসছি, যেগুলো আমি এ কলামের শুরুতেই বলেছি। ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার যে কয়টি ভালো কাজ করেছে তার মধ্যে এ দুটি অধ্যাদেশ অতিব গুরুত্বপূর্ণ। গত বৃহস্পতিবার এ দুটি অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আবার শেখ হাসিনার জামানার বিচার বিভাগে ফিরে গেলো।

বিদ্যমান সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারক নিয়োগ দেবেন। কিন্তু ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রেসিডেন্ট অন্যান্য কাজ করবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। ইন্টারিম সরকারের অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার ফলে অতঃপর প্রেসিডেন্ট সমস্ত বিচারক নিয়োগ দেবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। এ অবস্থাটিই শেখ হাসিনার আমলে ছিলো। সেটিই আবার ফিরে এলো।

সংবিধানে বিচারক হওয়ার অযোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হলে সুপ্রিম কোর্টে অন্তত ১০ বছর আইনজীবী হিসেবে বা অন্তত ১০ বছর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে না থাকলে অথবা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলে তিনি বিচারক পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না।

অতীতে কোনো সরকার বিচারক নিয়োগের আইন করেনি। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগে দলীয়করনের অভিযোগও ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করে। তাতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এ কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম প্রেসিডেন্ট বরাবর সুপারিশ করবে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ পাস হওয়ায় এ বিধান আর থাকছে না। আগের মতো সংবিধানে থাকা বিধান অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যাবে।

ইন্টারিম সরকার আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করে, যেখানে বলা হয়, অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। বৃহস্পতিবার এ অধ্যাদেশটিও বাতিলের ফলে ফ্যাসীবাদী জামানার বিচার বিভাগে ফিরে গেলো বাংলাদেশ।

অধ্যাদেশ রহিত করন সংক্রান্ত এ বিলের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে বক্তব্য প্রদান প্রসঙ্গে জামায়াত সদস্য ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান বলেন, “এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।” তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে। শেখ হাসিনার আমলের উদাহরণ টেনে ব্যারিস্টার নজিবুর বলেন, অতীতে ম্যাজিস্ট্রেটরা যদি আইন মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনতেন তাহলে তাদেরকে বিরোধী দলের সমর্থক মনে করে তাদেরকে দমনের জন্য খাগড়াছড়িতে বদলি করা হতো। বদলি করা হতো তেতুলিয়াতে। তিনি বলেন, সেদিন আবার ফিরে আনার ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি আরো বলেন, অতীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বিএনপিও সংগ্রাম করেছে। আজ কোথায় গেলো তাদের সে সংগ্রাম? আজ যদি এ বিল পাস হয়, অর্থাৎ ইন্টারিম সরকারের অধ্যাদেশটি রহিত হয় তাহলে বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ইন্টারিম সরকারের অধ্যাদেশের পর অধ্যাদেশটি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছিলো। সুপ্রীমকোর্ট সচিবালয় ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সে সচিবালয় উদ্বোধনও করেছেন। বেশ কয়েকজন অফিসার ও কর্মচারীও সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন তাদের কী হবে?

কয়েক দিন আগে হাইকোর্ট একটি রায় দিয়েছে এবং বিচারপতি নিয়োগ ও সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সহ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সমুন্নত করেছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে আপিলের ফলাফল জানার আগেই এতো তড়িঘড়ি করে অধ্যাদেশ দুটি বাতিল গভীর ষড়যন্ত্র মূলক এবং দুরভীসন্ধিমূলক।