মুসফিকা আন্জুম নাবা
৩১ ডিসেম্বর ঈসায়ী সালের শেষদিন। এদিন রাতের তৃতীয় প্রহরে বিশ্বের প্রায় সকল দেশে থার্টি ফাস্ট নাইট পালন করা হবে। বিশেষ করে টাইম স্কয়ার, সিডনী, রিওডি জেনিরোর মতো শহরে জাকজমকপূর্ণভাবে এ রাত উদযাপন করা হয়। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ রাত নানা ধরনের আনন্দ, ভোজ ও উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে পালন করা হয়। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির একটি অংশ। তবুও আমাদের দেশে বেশ আনন্দ-উল্লাশ সহ নানা রকম আয়োজন করা হয়। এর প্রারম্ভিকতা সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। তবে ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ উৎসবের উৎপত্তি মূলত খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে সর্বপ্রথম মেসোপটেমীয় সভ্যতায়। মেসোপটেমীয়রা তাদের নিজস্ব গণনায় বছরের প্রথম দিনে নববর্ষ উদযাপন করত। এরপর পারস্যের সম্রাট জামশেদ ‘নওরোজ’ নামে নববর্ষ পালনের প্রথা চালু করেছিল। প্রাচীন পারস্যে তথা ইরানে এ ধারাবাহিকতায় নওরোজ উৎসব ঐতিহ্যগত ভাবে আজও পালন হয়। এরপর রোমেও নববর্ষ পালন হয় এবং খিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রবর্তন করেন।
তৎকালীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে বছরের প্রথম দিনটিকে জানুস দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো। রোমানদের বিশ্বাস মোতাবেক জানুসই শুরু ও শেষের দেবতা। তাই দেবতার সম¥ানর্থে বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি প্রবর্তন করা হয়। রোমানীয় রীতি অনুযায়ী শীতকালে স্যাটার্নালিয়া উৎসব পালন হতো। এ মাস শুরু হলে তারা তাদের দেবতা অর্থাৎ জানুস কে খুশি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আমোদÑপ্রমোদের অনুষ্ঠান করত যেন দেবতা জানুস তাদের বছরটি কল্যাণময় করে। এটা ছিল খিষ্ট্রপূর্ব ঘটনা। তবে যিশু খ্রিষ্টের জন্ম বছরকে সূচনাকাল ধরে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার আনে, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দেশে দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়ে থাকে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার আর আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের যৌথ প্রবর্তনের মাধ্যমে জানুয়ারি মাসের প্রথম তারিখ থেকেই শুরু হয় নতুন ইংরেজি সাল বা খ্রিষ্টাব্দ গণনা। তখন এ দিনটি নতুন বর্ষ শুরুর সঙ্গে যুক্ত হয়, যা পরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে পড়ে। ঊনিশ শতক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে থার্টি ফাস্ট নাইট বা নিউ ইয়ার পালন শুরু হয়। আর বাংলাদেশে ২০০০ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর মধ্যরাতের মিলেনিয়াম বা সহস্রাব্দ পালনের মধ্য দিয়ে প্রসার হয়। এর আগে থার্টি ফার্স্ট’ বলে কোন উৎসবের কথা এদেশের মানুষ তেমন জানত না। এ হলো থার্টি ফার্স্ট নাইটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আর এভাবেই মূলত আমাদের দেশে অগ্নিপূজক রোমানদের কালচারের অনুপ্রবেশ হয়।
বিগত কয়েক বছর যাবত রাতটি নতুন আঙ্গিকে জাতির সামনে এমনভাবে আবিভূর্ত যে, দিনকে দিন থার্টি ফাস্ট নাইট নামক অপসংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে চলেছে। বিত্তশালী ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে সংক্রামকের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে গত দুই দশক ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বস্তুত দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞতা, ইসলামের রীতি নীতি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ ও বিজাতীয় সংস্কৃতির কুফল সম্পর্কে উদাসীনতা থাকায় খুব সহজে এটা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষ মিডিয়ার চমকপদ উপস্থাপনাও এজন্য দায়ী।
এ রাতে নতুন বর্ষে পদার্পন উপলক্ষে আমাদের দেশের শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় নতুন বর্ষের আগমনের আনন্দ ও নতুন বর্ষকে বরণ করার লক্ষ্যে সারারাত ধরে চলে নাচ, গান-বাজনা। তরুণরা আনন্দ-উৎসবে রাতের শেষ অংশ অতিবাহিত করে। কারও বাসা বাড়ি রঙিন আলোতে ঝলমল করে। আবার কেউ কেউ রং মাখামাখি, পটকা-আতশবাজি ফুটায়। রং-বেরঙের আলোতে সারা আকাশ রঙিন করে তোলে। উৎসবের আমেজে ও আনন্দের আতিশয্যে শিশু-কিশোরা হই-হুল্লোড় করে চারদিক মাতিয়ে তোলে। ঢাকা শহরের অভিজাত ক্লাব, আবাসিক হোটেল ও বাসা-ফ্ল্যাটে রাতভর চলে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মহাউৎসব। মূলত নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য যা প্রয়োজন, তার সবই থাকে এসব অনুষ্ঠানে। গান, বাজনা, ডিজে, আতশবাজি, যুবক-যুবতীদের বাধাহীন উল্লাস, মাদকদব্য সেবন এসব কর্মকাণ্ডে আয়োজন করার মাধ্যমে বিভিন্ন অপকর্ম করতে প্রলুব্ধ করে। এ দিনের ফাঁদে পড়ে অনেক তরুণ-তরুণী বিপথে পা বাড়ায়। পুরনো বছরকে বিদায় জানানো এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উপলক্ষে নেশা ও অবৈধ উম্মাদনায় মেতে উঠে। কনসার্ট, ডিজে পার্টি, ফ্যাশন শো, ফায়ার শো, ট্যাটু আঁকা, ফানুস উড়ানো যেন এই রাতের মুখ্য অংশ। মফস্বলের তুলনায় শহরে অশ্লীলতার মাত্রা থাকে বেশি। কিন্তু বর্তমানে পার্টি ক্লাব, পর্যটন নগরী ছাড়াও পাড়া, মহল্লায় থার্টি-ফার্স্ট নাইটের নামে নানাবিধ আনন্দ-ফূর্তি অনুষ্ঠান, রাতভর হৈ-হুল্লোড় আর ক্যাসেট ও মাইকবাজি চলে। বিভিন্ন সড়কে, ভবনের ছাদে, প্রকাশ্যে স্থানে উঁচু আওয়াজের পটকা ফুটানো হয়, ফলে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ হয়। এ ধরনের আতশবাজি ও পটকা ফোটানো কারণে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভীতি তৈরি হয়। দেশের সাধারণ নাগরিকরা বিরক্ত হন। হৃদরোগীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারণ গবেষণা বলছে অতিরিক্ত শব্দদূষণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া, ফানুস উড়ানোর ফলে অগ্নিকাণ্ড ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়। এ রাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা নেহাত কম নয়। ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু কিংবা অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা অসচেতনতায় সড়ক দুঘর্টনা, ফানুস ওড়ানোর সময় অগ্নিদগ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আবার উচ্চ শব্দের আতশবাজির কারণে থার্টি ফাস্ট নাইট রাতে ভীত হয়ে ছোট্ট শিশু উমায়েরের মত অনেকেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। কিন্তু এই শিশু মৃত্যুর দায় কে নেবে? সর্বোপরি বলা যায় রীতিমত একটা ভয়ংকর রাত। এ রাতে এখন আনন্দ-ফূর্তির নামে চরম বর্বরতা চলে। পাশ্চাত্যের জান্তব সভ্যতা আমাদের অমানুষে পরিণত করেছে।
তাই তো জন্মসূত্রে মুসলিম পরিচয় ছাড়া বিধর্মীদের সাথে সংশ্লিষ্টদের কাজে বিশেষ কোনো পার্থক্য নজরে পড়ে না। অনায়াসে বেহায়া-বেলেল্লাপনার সাগরে হারিয়ে যায় যুবক-যুবতীরা। একটা সময় এ সংস্কৃতি কেবল অমুসলিমরা পালন করলেও ক্রমশ তা মুসলিমদের সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নিচ্ছে। শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বাংলাদেশী সংস্কৃতিতেও এর অতিস্ত নেই। তবুও অবলীলায় আমাদের তরুণ প্রজন্ম এ বিজাতীয় সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। আজ বাংলাদেশে তরুণদের ধর্মীয় মূল্যবোধ নষ্ট হওয়া অনুঘটক হিসেবে বেশ কার্যকর ভুমিকা পালন করে। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন বছর কে দেখতে গেলে একজন বুদ্ধিমান বিবেকবান ব্যক্তি কখনো এই নিউ ইয়ার সেলিব্রেট করবেন না। কারণ আমাদের আয়ুষ্কাল সীমিত। সেখান থেকে একটি বছর চলে গেছে। এটি শুধু সংখ্যা বা নাম্বারের বিদায় নয় বরং আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবনকাল থেকে একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া। আর এ কারণেই যে কোনো সাল বর্ষশেষ উৎসবের ব্যাপার নয়, চিন্তা-ভাবনা ও হিসাব-নিকাশের ব্যাপার। যদি মন্দ কাজে ব্যয় হয়ে থাকে কিংবা অতীতে ব্যর্থতা থেকে থাকে তাহলে ভবিষ্যতের জন্য সংশোধনের সংকল্প করাই হবে উত্তম সিদ্ধান্ত। যেন মুক্তি ও উন্নতির চরম শিখড়ে পৌঁছানো যায়। অতএব শুধু থার্টি-ফার্স্ট নাইটে নয়, বরং দূরদর্শী মানুষের জন্য প্রতি রাত্রিতেই আগামীকাল সুন্দর জীবনের হিসাব করা উচিত। অন্যদিকে নতুন ভোরকে বরণ করতে যে পরিমাণ অর্থ অপচয় হয় তা বলাইবাহুল্য। দিনটিকে এ জাকজমকপূর্ণ রাত পালনের বিপরীতে আমাদেরই দেশে বসবাস করে অসহায় দরিদ্র শ্রেণী। হয়তো কেউ শীতের রাতে কাঁপছে অথবা দারিদ্র্যের কষাঘাতে ছটফট করছে এক মুঠো খাবারের আশায়। নতুন বছরের শুরুটা ভয়ঙ্কর রাতের পরিবর্তে অসহায়কে সাহায্যেও মাধ্যমে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ব্যতিক্রমী নিষ্কলুষ সব উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের শাশ্বত, সুন্দর, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা হোক। আর সেই সাথে বর্জন হোক সকল প্রকার বিজাতীয় সংস্কৃতি ও বিজাতীয় কালচার। ঈমান-আকিদা বিধ্বংসী এসব অপসংস্কৃতি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে সরকার, প্রশাসন এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।