মুন্সী আবু আহনাফ

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশ (Ordinance) জারি করেছিল। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত ১৩তম সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো এখন স্থায়ী আইনে (Act) রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কিন্তু গণভোট অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার লিখিত প্রস্তাব করেছে বিএনপি সরকার। অথচ সংবিধানের ২য় সংশোধনী হলো গণভোট। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সংবিধানে গণভোটের বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বিএনপির কাছে এটি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিধান বাতিল হওয়া মানে তাদের দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ‘লিগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার মুছে যাওয়া। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাতিল চায় সরকার। কিন্তু কেন? কী লাভ তাদের? এটা এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন? দুনিয়ার কোথাও সংবিধান মেনে গণঅভ্যুত্থান হয় না। গণঅভ্যুত্থান হলে সংবিধান অটোমেটিক অকার্যকর হয়ে যায়। যতই গুজামিল দেয়া হউক ছিদ্র থাকবেই। এটাই চরম বাস্তবতা। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে যে অধ্যাদেশে, সেই ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জামায়াতের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। এতে তারা আপত্তি জানিয়েছে। তবে সরকারি দলের ভাষ্য, তারা অধ্যাদেশটি বাতিল বা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি। আলোচনা চলছে। গণভোট হলো গণতন্ত্রের একটি ১পসফটি ভালভ’ বা রক্ষাকবচ। এটি বাতিল হলে জনগণের ক্ষমতার চেয়ে দলীয় ক্ষমতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো দেশে আবারও স্বৈরশাসক তৈরি হবে সেটা আজ হোক বা কাল।

এক. বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে (১৯৭২-২০২৬) আজ পর্যন্ত অনেক অধ্যাদেশ (Ordinance) জারি হয়েছে এবং তার মধ্যে কতগুলো আইনে পরিণত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তবে সংসদীয় রেকর্ড এবং নথিপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে আইন প্রণয়নের দুটি প্রধান পথ রয়েছে: একটি সংসদের মাধ্যমে (Act), অন্যটি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা অধ্যাদেশ (Ordinance)। সাধারণত সংসদ কার্যকর না থাকলে বা জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন, যা পরবর্তীতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করতে হয়।

স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের শাসনকালে (১৯৭২-১৯৭৫) জারি হওয়া কয়েকশ অধ্যাদেশ (প্রেসিডেন্টস অর্ডারসহ) অধিকাংশ আইন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সামরিক শাসন আমলে (১৯৮২-১৯৮৬) ৩০৭টি জারি হওয়া অধ্যাদেশ সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সবগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ১/১১ (ফরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন) সরকার (২০০৭-২০০৮) আমলে জারি হওয়া ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৫৪টি অধ্যাদেশকে নবম সংসদ আইনে পরিণত করেছিল আওয়ামী লীগ এবং তার দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (২০২৪-২০২৬) সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি (মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত) অধ্যাদেশ ১৩তম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সবকটি উত্থাপন করা হয়েছে। ১৪ সদস্যের কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে। এ কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির। তিনজন জামায়াতের। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি জাতীয় সংসদে পাস করাতে একমত হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেনি বিশেষ কমিটি। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির তৃতীয় বৈঠক হবে। ইউনূস সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস হতে হবে।

সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো অধ্যাদেশ জারির পর সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই তা পেশ করতে হয়। যদি সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে সেটি অনুমোদন না পায়, তবে অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া অনেক সময় আদালত কোনো বিশেষ আমলের অধ্যাদেশ সমষ্টিকে অবৈধ ঘোষণা করে (যেমন: ৫ম বা ৭ম সংশোধনী বাতিলের সময় অনেক অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছিল)।

দুই. বাংলাদেশে মোট কার্যকর আইনের সংখ্যা ১০০০-এর উপরে (যার মধ্যে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলের অনেক আইনও অন্তর্ভুক্ত)। স্বাধীনতার পর জারি হওয়া কয়েক হাজার অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন সময়ে সংসদের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে পরিণত করা হয়েছে অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে রহিত (Referendum) হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গণভোট’ (জবভবৎবহফঁস) ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে এই ব্যবস্থার একটি গভীর ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল বা এই ব্যবস্থার অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য কেন ‘বিপর্যয়’ বা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হতে পারে, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো: ১. বিএনপির সরকার গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে জনমত যাচাইয়ের সুযোগ হারানো। বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে যে, দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন (যেমন: রাষ্ট্রধর্ম, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা সংবিধানের আমূল পরিবর্তন) শুধুমাত্র সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে নয়, বরং সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে হওয়া উচিত। ফলে গণভোটের ব্যবস্থা না থাকলে সরকার এককভাবে যেকোনো বড় পরিবর্তন করতে পারবে। বিএনপির রাজনৈতিক দাবি অনুযায়ী (যেমন: নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন) আদায়ের জন্য আইনি বা সাংবিধানিক ‘জনগণমুখী’ পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়। ২. জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দর কষাকষির সক্ষমতা হ্রাস হয়ে যায় যদি গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। গণভোটের বিধান থাকলে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি আইনিভাবেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে যে ‘‘সাহস থাকলে এই ইস্যুতে গণভোট দিন।” এই অস্ত্রটি হাতছাড়া হলে তারা শুধুমাত্র সংসদ বা রাজপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের জন্য কঠিন। ৩. বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান সংকটে পড়বে। সংবিধানের অনেক ধারা (যেমন: আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সংক্রান্ত বিষয়গুলো) যা একসময় গণভোটের আওতাভুক্ত ছিল, সেগুলো এখন আর আগের অবস্থানে নেই। গণভোট ব্যবস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত হলে বিএনপি তাদের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের অনেক বিষয় স্থায়ীভাবে সংবিধানে পুনস্থাপন করার আইনি পথ খুঁজে পাবে না।

তিন. গণভোট (Referendum) ব্যবস্থা একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি অংশ। বাংলাদেশে গণভোট অধ্যাদেশ বা এই ব্যবস্থাটি স্থায়ীভাবে বাতিল হলে জাতীয় প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বা ‘বিপর্যয়’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন: ১. জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতির অধিকার খর্ব হবে। সংবিধানের কোনো মৌলিক পরিবর্তন বা রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে (যেমন: শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা জাতীয় সীমানা নির্ধারণ) জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে কেবল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়, যা সবসময় জনমতের প্রতিফলন নাও হতে পারে। ২. গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল হলে ‘সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের’ ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যদি সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকে, তবে ক্ষমতাসীন দল সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সংবিধানের যেকোনো ধারা পরিবর্তন করতে পারে। এতে করে; শাসক দল তাদের সুবিধামতো সংবিধান সাজিয়ে নিতে পারে। বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষের মতামতের কোনো আইনি গুরুত্ব থাকে না। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ৩. গণভোট অধ্যাদেশ না থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজপথের সংঘাতে রাস্তা তৈরি হয়। যখন কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের আইনি বা সাংবিধানিক পথ (যেমন: গণভোট) বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথের আন্দোলনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি হয় এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো সরকারকে পালিয়ে যেতে হয়। এছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পথ রুদ্ধ হয়। হরতাল, অবরোধ বা সহিংসতার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা বাড়ে। ৪. গণভোট ব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার অভাব তৈরি হয়। গণভোটের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদী নৈতিক ভিত্তি পায়। কিন্তু কেবল সংসদীয় ভোটে পাস হওয়া আইন পরবর্তী যেকোনো সরকার সহজেই বদলে দিতে পারে। এতে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলোতে ঘনঘন পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকে, যা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। ৫. গণভোটের বিধান না থাকলে জবাবদিহিতার সংকট তৈরি হয়। গণভোট ব্যবস্থা শাসক গোষ্ঠীকে একটি পরোক্ষ চাপে রাখে যে, কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে হবে। এই ব্যবস্থা না থাকলে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।

চার. গণভোট হলো সরাসরি গণতন্ত্রের (Direct Democracy) একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। এটি বাতিল বা অনুপস্থিত থাকলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া একটি স্বাভাবিক এবং অবধারিত পরিণতি। যেমন: ১. গণভোটের বিধান না থাকলে সাংবিধানিক ও আদর্শিক সংঘাত তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংবিধানের মূল ভিত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতভেদ রয়েছে। বিরোধী দলগুলো (বিশেষ করে জামায়াত ও সমমনা দলগুলো) মনে করে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকা উচিত। অন্যদিকে, বিএনপির সরকার যদি মনে করে সংসদের মাধ্যমেই সব পরিবর্তন সম্ভব, তবে এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক যুদ্ধকে আরও উসকে দেবে। ২. আস্থার চরম সংকট হবে। গণভোটের অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলগুলো মনে করতে পারে যে, সরকার জনমতকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের এজেন্ডা চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে করে; নির্বাচনের আগে বা পরে কোনো জাতীয় ঐকমত্য (National Consensus) তৈরি হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ বা আলোচনার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ৩. ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে বারবার। গণভোট ব্যবস্থা বিরোধী দলগুলোর জন্য একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করে। এটি বাতিল হলে; বিরোধী দলগুলো নিজেদের গুরুত্বহীন মনে করতে শুরু করবে। তারা মনে করবে যে, সংসদীয় ব্যবস্থায় তাদের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে, যা তাদের আরও চরমপন্থি বা কঠোর আন্দোলনের দিকে ধাবিত করবে। ৪. গণভোটের বিধান না থাকলে রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে। সরকার যখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত (যেমন: শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন) কেবল সংসদের ভোটে নেবে, বিরোধী দলগুলো সেটিকে ‘অবৈধ’ বা ‘জনগণের ম্যান্ডেটহীন’ বলে প্রচার করবে। এতে করে একই দেশে দুটি সমান্তরাল রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হবে, যা জাতীয় সংহতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

পাঁচ. রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ৪৮টিতে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দফার সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ছয়টি পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতে, সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে সাবেক ঐকমত্য কমিশন। বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনিও একই অভিমত দিয়েছিলেন। বিএনপি ওই সময় গণভোটে একমত হলেও সংবিধানে নেই, যুক্তিতে আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল। গত বছরের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। ২৫ নভেম্বর জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৯ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে। আদেশে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জয়ী হলে ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এসব ছাড়াও জুলাই সনদের যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।

নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। দলটি জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, দুদক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতিতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছিল। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়। জামায়াত নেতারা বলছেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। তাই এটা পাস না করা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

পরিশেষে বলা যায়, গণভোট হলো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম যেখানে তারা জনগণের রায়ের সামনে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। এই সুযোগটি না থাকলে রাজনীতি কেবল ‘ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে’ পরিণত হয়, যা সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে বিভক্তিকে এক অনতিক্রম্য দূরত্বে নিয়ে যায়। বিএনপির সরকারকে গণভোট অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে হবে। অন্যথায় নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারবেন। পুরনো ধাঁচের ফ্যাসিবাদী বা মাফিয়া টাইপের রাজনীতি আজ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন ধাঁচের খোলামেলা রাজনীতির কদর বাড়ছে। সকলেই নতুনত্বকে আলিঙ্গন করুন। অন্যথায় ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামায়াত মনে করে, গণভোট ব্যবস্থা হলো জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করার একটি রক্ষাকবচ। এটি বাতিল থাকা মানে শাসক দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের সুযোগ তৈরি হওয়া, যা বিএনপির মতো বৃহৎ দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্বের লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।

লেখক : সাংবাদিক