মনসুর আহমদ

সিপাহী বিপ্লবের পর হতে ভারতে মুসলমানদের হাল কোথায় গিয়ে দাঁড়াল তার খোঁজ খবর নেয়া আজ আমাদের বড় প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। মুসলমানরা ছিল ভয়ানক দুরাবস্থার মধ্যে। সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে “দি ইন্ডিয়ান মুসলমান” গ্রন্থে ড. উইলিয়ম হান্টার লিখেছেন : ‘১৮৬৯ সনে কলকাতায় এমন কোন দফতর মিলত না যেখানে চাপরাশী ও পিয়ন ব্যতিত কোনো মুসলমান কর্মচারীর দৃষ্টি গোচর হয়।

“ভূ পর্যটন” গ্রন্থে ডাক্তার বসাক লিখেছেন, ‘১৮৫৭ থেকে ১৮৭১ পর্যন্ত মুসলমানরা একেবারে যাঁতা কলে পিষ্ট হলেন যাঁদের দাস দাসী পর্যন্ত কিংখাবের গালিচায় শয়ন করত; তাদের সন্তান সন্ততিরা চটের বিছানায় রাত কাটান। যাঁদের একটি মাত্র তসবি দানার মূল্যও কোটি টাকা তাঁদের বংশধরকে ভিক্ষা পাত্র হাতে দরজায় দরজায় ধর্ণা দিতে হয়। যাঁদের ভগ্ন সিংহাসনের মূল্য ৩০ কোটি টাকা দাঁড়ায়, তাদেরই বেগমজাদিরা ক্ষুদার তাড়নায় পাচিকার বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন। যাঁদের দরবারে এসে রাজ রাজেশ্বরেরাও ভারতেশ্বরো বা জগদীশ্বরো বলতে গর্ব অনুভব করতেন, এখন তাঁদের দুর্গত আওলাদদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মত কেউ নেই।’

বসাক বাবুর সময় পার হয়ে গেছে অনেক আগে। এখন কি গণতন্ত্রের দাবিদার ভারেতে হিন্দু ব্যতিত অন্যান্য সম্প্রদায় মান ইজ্জত নিয়ে বেঁচে আছে? না, তা নেই। সে দেশে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে দেয়া হয় না। স্বীকৃত নয় সেখানে মুসলমানদের অধিকার। সেখানে শিখ মাত্রই সন্ত্রাসবাদী হিসেবে সন্দেহ ভাজন, সেখানে কাশ্মিরীদের মানবাধিকার স্বীকৃত নয়। যে ভারত গণতন্ত্রের নামাবলী গায়ে চড়িয়ে বিশ্ববাসীকে ধোকা দিচ্ছে সেখানকার মুসলমানদের হাল হকিকত এবার একটু দেখা যাক।

কুমুদ কুমার ভট্টাচার্য মুসলমানদের অবস্থান সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন তা নিম্ন রূপ।

দারিদ্র : শতকরা ৩৫ জন হিন্দু ও শতকরা ৫০ জন মুসলমান দারিদ্র সীমার নিচে রয়েছে।

২)সাক্ষরতা : ১৯৮৭-৮৮ সালের যোজনা কমিশনের সমীক্ষায়জানা যায়, ভারতে হিন্দুদের মোট সাক্ষরতা যেখানে ৫২.১১শতাংশ, সেখানে মুসলমানের সাক্ষরতার হার ৪০শতাংশ। হিন্দু মেয়েদের সাক্ষরতার হার যেখানে ৩৯. ৪২%, সেখানে মুসলমান মেয়েদের সাক্ষরতার হার মাত্র ১১%। ৩) মুসলমানরা ভারতীয় জনসংখ্যার ১১%। কিন্তু অই এন এ তাদের প্রধিনিধিত্ব ৩.২%, আই সি এম এ ২.৭%, আই এফ এ-তে ৩.৩৭%, কেন্দ্রীয় সাব অডি সার্ভিসে এক সপ্তমাংশের ও কম। চতুর্থ শ্রেণীর চাকরিতেই কেবল মুসলমানদের সংখ্যা ১০. ৪৬%। (হিন্দু পাদ-পাদশাহী, সম্পাদনা-কুমুদ কুমার ভট্টাচার্য, বর্ণ পরিচয়- কলকাতা।

তবে ভারতের মুসলমানরা কি এখনও ১৮৩৭ সালের গেজেটের নিয়ম ভুক্ত রয়ে গেল? যখন বৃটিশ ঔপনেবেশিক শাসক চক্র ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে অফিস আদালত থেকে ফার্সি ভাষা পাকা পাকি ভাবে তুলে দিল এবং ১৮৩৭ সালে সরকারি চাকরি হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। উইলিয়ম হান্টার তাঁর ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমান’ গ্রন্থে কলকাতার এক ফার্সী কাগজের বরাত দিয়ে লিখেছেন, “এই খবরের কোন প্রতিবাদ করা হয়নি যে, সুন্দর মনের কমিশনার সরকারি গেজেটে এই মর্মে এক নোটিশ দিয়েছেন যে, যে সব চাকরি খালি আছে তাতে হিন্দু ছাড়া কাউকে যেন ভর্তি করা না হয়।” অতঃপর হান্টার সাহেব উচ্চ রাজকর্মচারীগণের আচরণ বিষয় লিখতে গিয়ে বলেন, “এখন মুসলমানরা এমন একটা অবস্থায় পতিত হয়ে গেল যে, যদি তারা কোনো চাকুরীর উপযুক্ততা লাভ ও করে তা হলেও সরকারি বিশেষ আদেশে দ্বারা অতি সতর্কতার সঙ্গে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। বরং উচ্চ কর্মচারীগণ মুসলমানদের অস্তিত্ব স্বীকার করাকেও সম্মান হানিকর মনে করে।”

১৮৩৭ সালে ফার্সী ভাষাকে বাদ দিয়ে ইংরেজী ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে চালু করার ফলে মুসলমানদের কী অবস্থা হল তার ফিরিস্তি আর দীর্ঘ না করে একটি উিদ্ধৃতি দেয়াই বোদ্ধা পাঠকদের জন্য যথেষ্ট হবে বলে আশা করি।

১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, সরকারি চাকরিতে ইংরেজী শিক্ষিত যুবকগণ অগ্রাধিকার পাবে। ফলে মুসলমানদের জন্য সরকারি চাকরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৪৫-৫২ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরি প্রাপ্ত ব্যক্তিদের যে তালিকা প্রণীত হয়েছিল তাতে কোন মুসলমানের নাম ছিল না।১৮৫৩Ñ৫৫ সালের জন্য প্রণীত তালিকাতেও মুসলমানের নাম অনুপস্থিত। ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ ১৮৫০ -৫১ সালে প্রাক্তন ছাত্রদের নামের যে তালিকা তৈরী করে তাতে কোন মুসলমানের নাম নেই। ১৮৫১Ñ৫২সালে প্রণীত তালিকায় ৭৭ জন ছাত্রের মধ্যে ১জন ছিল মুসলমান। এই সালে হুগলী কর্তৃপক্ষ প্রণীত তালিকাতেও কোন মুসলমানের নাম উল্লেখ নেই। ১৮৫৬-৫৭ সালে বিচার বিভাগে, রাজস্ব বিভাগে ৫০ টাকা বেতনে ৩৩৬ জনকে চাকরিতে নেয়া হয়, তার মধ্যে ছিল ৫৪ জন মুসলমান, ১জন খ্রিষ্টান আর বাকি সকলেই হিন্দু। অন্যান্য চাকরেিতও মুসলমানদের অবস্থা একই রকম ছিল। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ৪৯ জন সাব এ্যসিস্টান্ট সার্জন নিয়োগ করা হয়, এর মধ্যে ৫ জন মুসলমান। শিক্ষা বিভাগের মাদরাসায় আরবী আর ফার্সী শিক্ষা দানের জন্য শুধু মুসলমান নিয়োগ করা হয়। অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা দানের জন্য কোনো মুসলমানকে নিয়োগ করা হতো না। ম্যাজিস্ট্রেট হতে আরম্ভ করে কেরাণী বা পিয়ন পদের জন্য, যত সামান্যই হোক না কেন তার জন্য হিন্দুরা লালায়িত থাকতো। কোন পরিবারে একজন কোন প্রকারে সরকারী চাকরিতে নিয়োগ লাভ করতে পারলে অন্যদের জন্যও সে চাকরির বন্দোবস্ত করতে পারত।(মুসলিম বাংলার অভ্যুদয়। মাহবুবুর রহমান)

যে বাংলাদেশের ১৬৬০ টি পরগণায় হাজার হাজার মুসলমান কর্মরত ছিল, ইংরেজ আমলে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়। আসলে মুসলমানদের এই দুর্ভোগ শুরু হয়েছিল পলাশীর পতনের পরপরই। কেননা কোম্পানীর নির্দেশে মীর জাফর আলী আশি হাজার দেশীয় সৈন্যকে বরখাস্ত করে। ওয়ারেন হেস্টিংস -এর সময় বাকি সৈন্যদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

মুসলমানদেরকে চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য তো এটাই ছিল যে, ইংরেজদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মুসলমান। হিন্দুরা ছিল তাদের তাবেদার দালাল। সুরঞ্জিত দাশ গুপ্ত লিখেছেন: “ব্রিটিশদের সৌভাগ্য গড়ে তোলার কাজে তিন প্রকার দেশীয় মানুষ সামর্থ ও সাহায্য যুগিয়েছে-পাইক সম্প্রদায়-এরা বৃটিশদের বাহুবল যুগিয়েছে, করণ সম্প্রদায় ও তৃতীয় এক ধরনের বিত্তবান সম্প্রদায়, এরা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এ দেশীয় বাণিজ্য পরিচালনার ব্যাপারে যোগসূত্র বা দালাল হিসাবে কাজ করছে।” লক্ষণীয় যে, ধর্মের বিচারে বৃটিশদের সামর্থ ও সাহায্য যোগানদার এই তিন সম্প্রদায়ই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

সে সময় মুসলমানদের অবস্থা কী ছিল সে সম্পর্কে হান্টার সাহেবের লেখাকেই সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৮৬৯ সালে আইন আদালতের চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, “মহামান্য রানীর নিযুক্ত মোট ছয় জন আইন অফিসারের মধ্যে চার জন ইংরেজ ও দুই জন হিন্দু ছিল। মুসলমান একজনও ছিল না। হাইকোর্টের উচ্চতর পদে মোট একুশ জন অফিসারের মধ্যে সাত জন ছিল হিন্দু, কিন্তু একজনও মুসলমান ছিল না। ব্যারিস্টারদের মধ্যে তিন জন ছিল হিন্দু, মুসলমান একজনও ছিল না। কিন্তু হাইকোর্টের উকিলের পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকাটা ছিল সর্বাধিক করুণ ইতিহাসের পরিচায়ক। বর্তমানে যারা জীবিত, তাদের সকলেরই মনে আছে যে, আইনের এই পেশাটা মুসলমানদেরই করায়ত্ব ছিল।... ... ১৮৪৫ সাল থেকে ১৮৫০ সালৈর মধ্যে উকিল হিসাবে সনদ প্রাপ্তদের মধ্যে যারা ১৮৬৯ সালে জীবিত ঠিছল তাদের সবাই মুসলমান। এমনকি ১৮৫১ সালেও যারা সনদ পেয়েছে তাদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ইংরেজ ও হিন্দু সম্মিলিত সংখ্যার সমান। এর পর থেকেই এই পেশায় নতুন ধরনের লোকের সমাগম ঘটতে থাকে। ভিন্নতর দৃষ্টিকোন থেকে যোগ্যতার যাচাই শুরু হয়ে যায় এবং তালিকায় দেখা যায় যে, ১৮৫২ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত মোট সনদ প্রাপ্ত দু’শো ঊনচল্লিশজনই হিন্দু,আর মুসলমান মাত্র এক জন।... ... হাইকোর্টেও এ্যাটর্নী, প্রক্টর ও সলিসিটর পদে ১৮৬৯ সালে হিন্দুর সংখ্যা ছিল ২৭, কিন্তু মুসলমান একজনও ছিল না। শিক্ষানবীশ হিসাবে কর্মরত উদীয়মান আইন জীবীদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা ছিল ছাব্বিশ, কিন্তু মুসলমান শূন্যের কোটায়।

“সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজ শাসনে মুসলমানদের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। ১৮৬৯ সাল ও তার পরবর্তী বছর গুলির অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায়, চাকরির সর্ব্বোচ স্তরে আনুপাতিক হার ছিল মুসলমান এক জন আর হিন্দু দু’জন। এর পর মুসলমান এক জন হিন্দু তিন জন। দ্বিতীয় স্তরে আগে ছিল মুসলমান দুই আর হিন্দু নয় জন। পরে মুসলমান এক আর হিন্দু দশ জন। তৃতীয় স্তরে চাকরিতে পূর্বে মুসলমান চার আর হিন্দু ও ইংরেজ সাতাশ জন, পরে মুসলমান তিন জন হিন্দু অন্যন্য ত্রিশ জন। পরে মুসলমান চার জন আর অন্যান্য ঊনচল্লিশ জন। শিক্ষা নবীশ স্তরে ১৮৬৯ সালে আটা জনের মধ্যে দু’জন মুসলমান এর পরবর্তীকালে সেখানে একজনও মুসলমান নাই।”

১৮৭১ সালের একটি তালিকা থেকে জানা যায় যে, সে সময়কার ২১১১টি গেজেটেড পদে মুসলমান ছিল মাত্র ৯২ জন। আর ২৫টি ডিপার্টমেন্টের মধ্যে সর্বোচ্চ আটটিতে একজনও মুসলমান ছিল না।

হান্টার সাহেব অন্যত্র লিখেছেন “একশ বছর পূর্বে রাষ্ট্রীয় চাকরির সস্ত পদে মুসলমানদের এক চেটিয়া অধিকার ছিল। বর্তমানে তাদের আনুপাতিক হার মোট সংখ্যার তেইশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এটাও আবার শুধু মাত্র গেজেটেড চাকরি বেলায় প্রযোজ্য। যেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্টনের সময় যতেষ্ঠ সতর্কতাঅবলম্বন করা হয়। প্রেসিডেন্সী শহরের অপেক্ষা কৃত সাধারণ চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিয়োগ প্রায় সম্পূর্ণ রহিত হয়ে গেছে। ক’দিন আগে দেখা যায় যে, কোন একটা বিভাগে এমন একজন কর্মচারীও নেই যে মুসলমানের ভাষা পড়তে জানে এবং বস্তুত কলিকাতায় এমন কদাচিত এমন একটা সরকারি অফিস চোখে পড়বে, যেখানে চাপরাশী ও পিয়ন পদের উপরিস্তরে একজনও মুসলমান কর্মচারী বহাল আছে।”

১৯৩০ সালের দিকে চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে কী রকম বৈষম্য ছিল তা জানা যায় জনাব আব্বাস আলী খানের নিচের বর্ণনা হতে। “আমার কলেজ জীবন শুরু হয় রাজশাহী গভর্ণমেন্ট কলেজে। ১৯৩০ সালে প্রিন্সিপ্যাল খাস ইংরেজ টি. টি. উইলিয়মস। কলেজের প্রায় ৬০ জন শিক্ষকের মধ্যে আরবী ফার্সী পড়াবার তাদের ভাষায় দু’জন মৌলভী ছাড়া বাকি সবাই উচ্চ হিন্দু শ্রেণীর। ক্লাসে বসে বড়ো অস্বস্তি বোধ করতাম পৃষ্ঠপোষকহীন এতিমের মতো। নসীব ভালো কিছু দিন পর এ কলেজে সর্বপ্রথম একজন মুসলমান এলেন ইংরেজীর অধ্যাপক আবু হেনা। তাকে নিয়ে আমরা ফুলার হোস্টেলের খোলা ময়দানে মিলাদেরঅনুষ্ঠান করলাম। অধ্যাপক আবু হেনা নবী পাকের জীবন চরিতের উপর প্রায় ঘন্টা খানেক ইংরেজীতে ভাষণ দিলেন। আনন্দ গর্বে আমাদের বুক ফুলে উঠল। যেন রামরাজ্যে বিজয় কেতন উড়ালাম।

ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে আরবী ফার্সী পড়াবার বালাই নাই। তাই শিক্ষক শতকরা একশ জনই হিন্দু। কলেজে মুসলমান ছাত্র অল্প সংখ্যক। আমরা যেন অনাদর অবহেলার মর্মপীড়ায় আক্রান্ত। আমাদের ফরিয়াদ কার কাছেই বা জানাই। মৌলভী এ.কে ফজলুল হক তখন কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র। আমরা ভাবলাম তাঁর কাছেই কথাটা বলা যাক। তাঁর এক ভাগ্নে মতলুব মোর্শেদ আমাদের সাথে পড়তেন। যতোটা মনে পাড়ে তাকে নিয়েই আমরা হক সাহেবের কাছে গিয়ে বল্লাম আমাদের বিটি কলেজে একজন মুসলমান শিক্ষক চাই।”

১৮৮৭ সালের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায় বিচার ও প্রশাসনিক বিভাগে ১৮৬৬ জন ভারতীয় ছিলেন; তাদের মধ্যে ৯০৪ জন ব্রাহ্মণ, ৪৫৪ জন কায়স্থ, ১৪৭ জন ক্ষেত্রী রাজপুত, ১০৩ বৈশ্য ও ১৪৬ জন শুদ্র, বাকি অন্যান্য।

মাদ্রাজে ২৯৭ জনের মধ্যে ২০২ ব্রাহ্মণ এবং বোম্বাইয়ে ৩২৮ এর মধ্যে ২২১ ব্রাহ্মণ। দক্ষিণ ভারতে ছিল এই জাতি ভেদের দৌরাত্ম্য আরও নির্মম ও প্রচণ্ড।

‘দূরবীন’ নামক একটি সাময়িক পত্রিকায় মুসলমানদের অবস্থা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে লেখে:Ñ ছোট বড় সব রকমের চাকুরী মুসলমানদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্য সম্প্রদায় বিশেষতঃ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের দেওয়া হচ্ছে। সরকার সর্বশ্রেীীর প্রজাকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য। কিন্তু এমনই হয়েছে যে, প্রকাশ্যে মুসলমানদের বাদ দিয়ে গেজেটে চাকুরীর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সম্প্রতি সুন্দর বন কমিশনোরের অফিসে কয়েকটি চাকুরী খালি হলে সরকারী গেজেটে সে সম্বন্ধে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, তাতে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয় যে,পদ গুলি কেবল মাত্র হিন্দুদেরই দেওয়া হবে। সংক্ষেপে বলা যায়, মুসলমানরা এখন এমন নিম্ন স্তরে নেমে গেছে যে, উপযুক্ততা থাকলেও সরকারী বিজ্ঞপ্তির বলে তাদের সরকারী চাকুরী থেকে দূরে রাখা হয়, কেউ তাদের অবস্থাটা বিবেচনা করে দেখে না এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষরা তাদের অস্তিত¦ স্বীকার করতে চান না।

মুসলমানদের প্রতি কেন এই অত্যাচার ও বৈষম্য। এই সম্পর্কে ক্লাইভ ওয়ারেন হেস্টিংস-এর নিকট যে চিঠি লিখেন তা হলো, “মুসলমানদের প্রতি যতই সদয় ব্যবহার করা হোক না কেন তারা আমাদের প্রতি নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করবে না। তারা তাদের নিজস্ব আশা, আকাঙ্খা, ভয়-ভীতি দ্বারা পরিচালিত হবে। ”১৮৭৩ সালে স্যার জন ম্যালকর্ন বলেছেন, “কিছুকাল পূর্বে আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার কারণে মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে তা তাদের স্মরণে রয়েছে। তাই হিন্দুরা আমাদের প্রতি যতটা অনুগত হবে মুসলমানদের নিকট হতে ততটা আনুগত্য আশা করা যায় না।” হিন্দুদের খুশি রাখতে পারলে মুসলমানদের বিরোধিতার কারণে কোম্পানীর স্বার্থ বিঘ্নিত হবে কি না সে বিষয় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “ভারতবর্ষে আমাদের নিরাপত্তা হিন্দুদের উপর নির্ভরশীল। কর্ণেল টমাস মনরো মন্তব্য করেছিলেন, মুসলমানদের বিরোধিতার মোকাবিলায় হিন্দুদের সহযোগিতার কারণে কোম্পানীর শাসন টিকে থাকবে।”

এ উদ্দেশ্য বাস্তবানের লক্ষ্যে তারা দুটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। একটি হল লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া এবং লর্ড মেকেলে কর্তৃক ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজী শিক্ষার প্রবর্তন করা।

ইংরেজী শিক্ষা প্রবর্তন করাই চক্রান্তের শেষ নয়। “ ১৯৪৪ সালে হার্ডিঞ্জ হঠাৎ একটি ঘোষণায় জানালেন যে, যাদের ইংরেজী ডিগ্রি আছে কেবল মাত্র তারাই সরকারী চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবে। লক্ষ্যণীয় যে, ১৯১৭ সালে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয় যেখানে মুসলমান ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল না। আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, ১৮৩৬ সালে দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীনের অর্থে হুগলিতে যে কলেজ স্থাপিত হয় তা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

১৮৪৪ সালের চট্টগ্রামের মীর ইয়াহইয়া মুসলমানের শিক্ষার নামে যে বিপুল সম্পত্তি দান করেছিলেন ১৮৪০ সালে কোম্পাানী তা দিয়ে ইংরেজী স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেও শিক্ষক ছিল প্রায় সকলেই হিন্দু। যেখানে মুসলমান ছাত্রদের জন্য তেমন কোন সুযোগ সুবিধা ছিল না। কোম্পানীর সরকার সৃষ্ট চক্রান্তের ফল স্বরূপ ১৮৪১ সালের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলার স্কুল কলেজের মোট ছাত্র সংখ্যা ছিল ৪০৩৪ জন, তার মধ্যে হিন্দু ছিল ৩১৮৮ এবং মুসলমান মাত্র ৭৫১ জন। মুসলমানরা অবশ্য অধিকাংশ ছিল কলিকাতা মাদ্রাসা ও হুগলী মাদরাসার ছাত্র। ১৮৪৬ সালের ঢাকার সউল কলেজের ২৩৩ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছিল মাত্র ১৮ জন। ১৮৫০ -৫১ সালে হুগলী কলেজে হিন্দু ছাত্র সংখ্যা ছিল ৩৮৯ এবং মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ জন। ১৮৬৫ সালের কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৯ জন এম. এ. পাশ করেন। একজন মুসলমানও নেই : ৪১ জন হিন্দু ও এক জন মুসলমান বি.এ. পাশ করেন। ১৭ জন হিন্দ ুচিকিৎসা শাস্ত্রে পাশ করেন, একজন মুসলমানও নেই। আইনের ক্ষেত্রে ১৭ জন হিন্দু ছাত্র আইন পাশ করে। (প্রতিরোধ ও দুরন্ত দুর্বার-আবদুল আউয়াল ঠাকুর)

ইংরেজরা সব সময় হিন্দুদের মনতুষ্টি করে চলতো, তাতে মুসলমানদের যতই ক্ষতি হোক না কেন। ১৮৪৩ সালে ইংরেজ গভর্ণর জেনারেল সাবধান করে বলে ছিলেন, “ আমি এ বিষয়ে কিছুতেই চক্ষু বন্ধ করতে পারি না যে ঐ জাত টা (মুসলমান) মূলগত ভাবে আমাদের বিরুদ্ধভাবাপন্ন; এ জন্য আ মাদের সঠিক নীতি হবে হিন্দুদের মনতুষ্টি করা।”

এই মনতুষ্টি করতে গিয়ে ইংরেজরা কি ভাবে মুসলমানদেরকে পথে বসান তা উইলিয়ম হান্টার সাহেব ১৮৭১ সালে এ ভাবে বর্ণনা করেছেন: “সংক্ষেপে বলা যায়, তারা এক বিরাট ঐতিহ্যের অধিকারী হয়েও তাদের কোনো জীবনোপায় নাই।... ... তারা হতাশ ভাবে দেনার পাঁকে ডুবে যায়, তার পর প্রতিবেশী হিন্দু মহাজন ঝগড়া বাধিয়ে দেনার দায়ে সব সম্পত্তি ডিক্রি করে নেয়। ফলে প্রাচীন মুসলমান বংশ সহসা লোপ পায়। নিম্ন বঙ্গের মুসলমানদেরই আমি বেশি চিনি এবং তারা বৃটিশ শাসনের সব চেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে।... ... যদি কখন একটি জাতি জীবন শূন্য হয়ে থাকে, সেটা হল নিম্ম বঙ্গের মুসলমানেরা। ... ... একশো সত্তর বছর পূর্বে বাংলার একজন ভদ্র মুসলমানের গরীব হওয়া অসম্ভব ছিল, এখন তার পক্ষে ধনী হয়ে চলাই অসম্ভব। ... ... সামরিক, রাজস্ব, বিচার ও রাজনৈতিক বিভাগ থেকে মুসলমানদের গৃহে অজস্র ধারায় অর্থ আমদানী হতো, এখন সে সব রুদ্ধ হয়ে গেছে। ... ... (চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে) হিন্দু গোমাস্তারা জমিদারের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে ও ভূমির মালিকানা পেয়েছে, তার দরুণ মুসলমান আমলে যে সব অর্থ মুসলমানের গৃহে যেতো, এখন সে অর্থ হিন্দু গৃহে যাচ্ছে।... ... আমরা তাদেরকে সামরিক বিভাগে নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছি আমাদের নিরাপত্তার অজুহাতে, আমরা প্রশাসনিক সব কর্ম থেকে তাদের বঞ্চিত করেছি শাসন নীতির অজুহাতে। ... ... বিচার বিভাগে তাদের ছিল একাধিপাত্য, অন্যান্য বিষয়ে সিংহ ভাগ। এখন হিন্দুদের অফিসের সর্বস্তরে নিয়োগ করা হচ্ছে। আর ভারতের প্রাক্তন প্রভুরা এখন জেল খানায় দু’একটি নগণ্য চাকুরী আশা করতে পারে।... ... আমরা সরকারি শিক্ষা খাতে যা ব্যয় করি তার ষোল আনাই হিন্দুরা ভোগ করে নয়া শিক্ষানীতির ফলে। বাযেয়াফ্তি করণের পর থেকেই মুসলমান শিক্ষা ব্যবস্থা একবারেই ধ্বংস হয়ে গেল। তারপর বাংলার শিক্ষিত মুসলমানদের ভদ্র চাকরি একেবারে লোপ পেয়ে গেল এবং এটাই হলো বাংলার মুসলমানদের অবনতির দ্বিতীয় প্রধান কারণ।... ... আমরা ইচ্ছা পূর্বক শিক্ষার এই বৃহৎ মূলধনটি (মহসীন ফাণ্ড) আত্মসাৎ করেছি, যার ফলে মুসলমানরা একবারে বিতাড়িত হয়েছে। এখন সমস্ত সরকারি অফিসে আমাদের জনশিক্ষার সহানুভুতিহীন নীতির ফলেই তাদের মধ্যে তাদের অশিক্ষার প্রসার বেড়ে গেছে।” ( ইণ্ডিয়ান মুসলমান।)

মুসলমানদের সাথে হিন্দুদের সম্পর্ক কেমন ছিল, কেমন চোখে তারা মুসলমানদেরকে দেখতো তা আজ অনেকেরই জানা নেই। আর তার বিবরণ লিখতে গেলে এক বিরাট ইতিহাস লিখতে হবে। আশা করি নিচে যেটুকু তুলে ধরা হল এ থেকেই সুধী সমাজ অনুধাবন করতে পারেন হিন্দুদের কাছে মুসলমান কতটুকু গ্রহণ যোগ্য ছিল। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত রাজনীতিবীদ সাহিত্যিক জনাব আব্বাস আলী খান সাহেবের “স্মৃতি সাগরের ডেউ” থেকে কিছু অংশ তুল দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যেতে চাই।

তিনি তাঁর চাকররি জীবনে কেমন ব্যবহার পেয়েছিলেন তাঁর হিন্দু বসের কাছে থেকে তা স্মরণ করতে গিয়ে লিখেন, “একদিন একটার পর গেছি বাইরে, নামায সেরে নাশতাপানি করে ফিরছি। বড় বাব ুহাক দিয়ে বলেন, কোথায় যাওয়া হয়ে ছ্য্রালো? কাজে কামে বুঝি মন লাগছে না। ?” আমি যেন আকাশ থেকে পড়লুম। হঠাৎ করে এমন অভদ্র ব্যবহার? একেবারে ঝাঁঝাঁলো সুর। বিদ্রুপের ভঙ্গী। বল্লাম, নামায পড়ে এলুম। নামাযের কথা শুনতেই ভদ্রলোকের গায়ে যেন দপ করে আগুন জ¦লে উঠল। পানের ডিব্বা থেকে পান বের করে মুখে না পুরে আবার ডিব্বায় রাখলেন, পান চিবান আর অপরের শ্রাদ্ধ একত্রে চলতে পারে না। অধিকতর ঝাঁঝাঁলো সুরে বল্লেন... চাকরি করতে এসে কি শুধু নেমাজ করলেই চলবে? তবে হ্যাঁ, আপনি কয়লা ঘাট থেকে বড়ো সাহেবের পারমিশন নিয়ে সারাদিন নেমাজ করুন। কিন্তু পারমিশন ছাড়া কাজ ফেলে এমনি নেমাজ টেমাজ চলবে না মশাই। এ কথা বলে দিলুম হ্যাঁ।”

এসব ছোট মনের বড় বাবুদের জাতির কাছে মুসলমান জাতটাই শুধু ম্লেচ্ছ অস্পৃশ্য ছিল না। তাদের নাম ও ব্যবহৃত ধর্মীয় পরিভাষা গুলোকে তারা দস্তুর মত ঘেন্না করতো। তাই দন্ত ‘ন’ রে স্পষ্ট আকারে দেখতে পেয়েও তারা ইচ্ছা করেই বলতো নেমাজ। মুকুলেশ্বর রমন ছাড়া মুখলেছুর রহমান মুখেই আনতো না।

দাদা বাবুরা তাদের পূজনীয় খ্রিস্টান সাহেবদের অনুকরণে এ ব্যাপারে ভুল করেনি। যেমন তারা ইব্রাহিমকে বানালো আব্রাহাম, ইসহাক কে বানালো আইজ্যাক,ইয়াকুব হয়ে গেল জ্যাকব, সোলায়মান হয়ে গেল সলোমন, দাউদ হল ডেভিড, ইউসুফ হলো যোশেফ, মরিয়ম হলো মেরী, বনি ইয়ামিনকে বেঞ্জামিন বানিয়ে ছেড়েছে। আজ আমরা ওদের অনুকরণে আমাদের সন্তানদের এমন নাম রাখছি। যা শুনে সন্তানটি মুসলমান কি খ্রিস্টান, না হিন্দু, তা বের করতে প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এত সব কথা লিখলাম এ জন্য যে ‘বড়র পীরিতি বালির বাঁধ’ এ কথা নজরুল ইসলাম বুঝেছিলেন অন্তর দিয়ে, কিন্তু আমরা আজ বুঝতে পারছি না, বুঝতে চাইছি না। এর পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা ভাবলে শরীরটা শিউরে ওঠে। যারা ইতিহাস না জানেন তাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি ইতিহাস পড়ুন, সন্তানদেরকে পড়তে উৎসাহিত করুন। নতুন করে সিদ্ধান্ত নিন কোন পথে চলবেন।