নূরুন্নাহার নীরু
কিছুদিন পরপরই হঠাৎ দেশে একটা মহামারী দেখা যায়। যার নাম ধর্ষণ। দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ধর্ষকের বিচার চাই। একটা অস্বস্তি আর অস্থিরতায় কিছুদিন কাটলেও আবার তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিচার হয়তো হয় কোন কোন ক্ষেত্রে তবে তা খুবই ধীরগতিতে। কারণ ভিকটিম পক্ষের উকিলের চেয়েও কখনো আসামী ধর্ষকের উকিলই হয়ে দাঁড়ায় দ্বিগুন চৌকস। (আমার বুঝে আসে না ধর্ষককে বাঁচাতে তাদের আইনী মারপ্যাঁচ কেন? এতে কার উপকারে আসছে? না সমাজ না ভিকটিম?) দ্বিতীয়ত : ধর্ষিতার স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও আরো সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়াও আছে দেশীয় আইনের কিছু নীতিনির্ধারণী জটিলতা। মূলত ইত্যাদি ইত্যাদি ব্যাপারে এক অপরাধীর শাস্তি প্রদানের আগেই আরো ডজন ডজন অপরাধী ধর্ষণের অপরাধে জড়িয়ে যায়। রীতিমত ‘চেইনক্রাইম’ ঘটে যায় ইতোমধ্যে। আইন প্রয়োগের ঢিলেঢালা গতির ফলে এভাবেই চলতে থাকে ধর্ষণের চিত্র। তার উপর যখনি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে কোন এক অভিনব পদ্ধতিতে ঘটে থাকে কোন ধর্ষণের ঘটনা। যেমন চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণ! তখন অনুগত ভক্তের মত তার পুনরাবৃত্তি ঘটে যায় এ দেশের মাটিতেও এবং তা চলতে থাকে ক্রমান্বয়ে। এজন্যই বলছিলাম এ এক মহামারী! এ মহামারীর নাম ধর্ষণ। তবে এ শব্দটি মুখে আনতেও যেনো ঘেন্না লাগে। ফুটে ওঠে এক হিংস্র হায়েনার অমানবিক চিত্র। আমি একে তাই মহামারীই বলবো।
বিগত ১৬টা বছর ধরে মানুষ মুখ খুলতে না পারায় এ অপরাধ মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। আমরা এর এমন এক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই যা দেখে পরবর্তীতে আর কোন ধর্ষক এমন কাজে এগুতে সাহস করবে না! অন্ততঃ একবার হলেও বুক কাঁপবে, একবার হলেও অন্তত চিন্তা করবে এর পরিণতি কী হতে পারে!
আমরা চাই না ফিরে আসুক আবার সে সমাজ যে সমাজের পরিণতি নিয়ে জিজ্ঞাসিত হবে কন্যা শিশুঃ “কোন অপরাধে জীবন্ত প্রোথিত হতে হয়েছিল তোমাকে?” সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মাগুরার শিশুকন্যা আছিয়ার কাহিনী আবারো আমাদের সে সমাজের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ছিল না নারীর কোন সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা। যার অভাবে জন্মদাতা পিতাকেও ভাবতে হত নোংরা সে সমাজের হাত থেকে বাঁচা এবং বাঁচানোর জন্য কিভাবে একরত্তি নিষ্পাপ শিশুটিকেই জীবন্ত মাটিচাপা দেয়া যেতে পারে! এ অবস্থা চলছিল ঘরে ঘরে। নারী মানেই ধিকৃত, ছিল অভিশপ্ত! ফলে ঘটে চলেছিল নিষ্পাপ কন্যার অকাল মৃত্যু। অথচ মহামারী আক্রান্ত সে সমাজের পরিমার্জন, পুনর্গঠনের ছিলো না কোন প্রচেষ্টা। ছিল না সমাজপতিদের চরিত্র পরিবর্তনের কোন নৈতিক শিক্ষা।
সে একই অবস্থা পুনঃই ফিরে আসছে আজকের এ আধুনিক সমাজেও। যার ফলে বাংলাদেশের মত ছোট্ট এই শান্তিপ্রিয় দেশটাতেও জ্বলছে অশান্তির আগুন। এখানে পিতা বা ভাইয়ের হাত থেকেও ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে, খুন করা হচ্ছে অনায়াসে ধর্ষণের বিকারে, এমন কি, স্বামীর বাহু থেকেও ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে স্ত্রীকে। এ অবস্থায় নিকটাত্মীয়, দূরাত্মীয়, প্রেমিক পুরুষ, চেনা অচেনা কারো কাছেই নিরাপত্তা নেই নারীর বিশেষ করে কন্যা শিশুর। এমন বিকারগ্রস্ত মহামারী শুধুই যেন ওই ‘নারী’ শব্দটাতেই কামোদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে; সেখানে কী সত্তর বছরের নারী আর কীই বা সাত মাসের নারী শিশু? মূলত ‘নারী’ হওয়াটাই যেন অপরাধ! যে শিশু আপন মনে খেলে বেড়াবে, স্বাধীনভাবে দৌড়ঝাঁপ দেবে তাকেও আত্মাহূতি দিতে হয় ঐ মানুষরূপী হায়েনা আর ধর্ষকের হাতে। আমরা কি ইয়াসমিন হত্যার কথা ভুলে গেছি? আমরা কি তনু হত্যার কথা ভুলে গেছি? এমন কী নুসরাতের আত্মাহূতি? এমনি নাম ভুলে যাওয়া বহু শিশু কন্যা আছে - কী অপরাধে তাকে বলী হতে হচ্ছে সে নিজেও জানে না। এইতো মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনাঃ জনৈকা কন্যাশিশু এক ফ্ল্যাট থেকে নিজ ফ্ল্যাটের বাসায় যাচ্ছিল লিফটে চড়ে। লিফটেই দেখা হওয়া কোন এক মিস্ত্রি শিশুটিকে জোরপূর্বক ছাদে নিয়ে ধর্ষণ তো করেই সাথে মেরেও ফেলে নিজেকে বাঁচাতে। আহারে জীবন! নিজেতো বাঁচলিই না মাঝখান থেকে কোন এক বাবা মায়ের বক্ষ খালি করে দিলি। এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে এ দেশের ইতিহাসে। যার কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আজও সংঘটিত হয়নি, জানি না সে ধর্ষকের আদৌ শাস্তি ঘটেছে কি না? এভাবে মহামারী বেড়েই চলছে। আর এভাবেই ধর্ষণের সেঞ্চুরিও উদযাপিত হতে পেরেছে এ ছোট্ট ব-দ্বীপটার বুকে। সেখানেও ছিল না কোন প্রকাশ্য বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজীর। আর সমাজ এসবে প্রতিবাদমুখর হতে পারেনি ঐ সে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মতই ক্ষমতাশীন দলের হম্বিতম্বির জোরে। তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন নারী হয়ে ‘মায়া কান্না’ দেখানো ছাড়া আর কিছুই করেননি। তার আমলে দু বছরের এক কন্যাশিশুর ধর্ষিতা হওয়া থেকে সুবর্ণচরের পারুলের উপর গণধর্ষণ তার প্রমাণ। দলীয় ক্যাডার থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল সে মহামারী। মহান আল্লাহ ৫ আগস্ট ২০২৪ শে এসে জাতিকে সে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে রাহুমুক্ত করেছেন বটে। তবে চাই পরিপূর্ণ সংস্কার। আর এ জন্যই গত ০৬/০৩/২৫ তাং মাগুরার আছিয়ার উপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতাসহ এ পর্যন্ত যত ধর্ষণ ঘটছে তার বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠেছে। বিশেষ করে নারী সমাজ। বিভিন্ন নারী সংগঠনের ব্যানারে চলছে প্রতিবাদ, মানব বন্ধন, প্রস্তাবনা পেশ। এর মধ্যে সম্প্রতি নারী প্রয়াস, নারী অধিকার আন্দোলন এমন কী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগ এর পক্ষ থেকে গৃহীত কর্মসূচী উল্লেখযোগ্য ও বহুলালোচিত বলা যায়।
তবে এর মধ্যে আরো একটি নারীদল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবীতে প্রধান উপদেষ্টার বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। আছিয়ার মৃত্যুপরবর্তীতে বাম নারীদেরও একটি একই সুরের স্লোগানসহ প্রতিবাদমুখর হয়েছিল এবং তাদেরও দাবী ছিল ওই একই সুরে বাঁধাঃ” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ।” বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠেছে। বরং এ ঘটনা যেনো গোটা দেশের আন্দোলন-প্রতিবাদমুখী পরিবেশটাকে নিছক হাস্যকর ও হালকা করে দেবার প্রচেষ্টায় রত ছিল। যেন ধর্ষণ বিষয়টা রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি উদ্ধারের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেমন : ১/ যেখানে বর্তমান সরকার নিজেই ধর্ষণের বিরুদ্ধ অবস্থানে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন, এমনকি শাস্তির সময়ও বেঁধে দিয়েছেন। তথাপি আছিয়ার অকাল মৃত্যুতে সরকার আরো শক্ত অবস্থান নিয়েছেন, ২/ ধর্ষক কোন সরকারের লোক ছিল না, এমন কি কোন দলেরও না, ৩/এ ঘটনা এ ১৬ বছরে এ প্রথম ঘটেছে এমনও নয়। বরং ১৬ বছরে ধর্ষণ ছিল মহামারী আকারে কিন্তু তার কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ঘটেনি। তখন ঐসব শাহবাগীরা কোথায় ছিল? সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা তাদের কন্ঠরোধ কে করে রেখেছিল? একটা শাস্তি কার্যকর করে মানবতার বন্ধুতো সাজতেপারতো! তো তাহলে তাদের উপরোক্ত দাবী নিয়ে আন্দোলন করার পেছনে কোন্ দুরভিসন্ধি নিহিত? স্বতঃই প্রশ্ন জাগে জনমনে। আমরা চাই প্রকৃত বিচার। এমনতরো মহামারী নিয়ে কোন রাজনীতি নয়! এবং এমন ঘোষণা আছিয়ার মৃত্যুর পরপরই মাননীয় আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জোর গলায় ব্যক্ত করেছেন।
আমরা জানি, একসময় এ দেশে এসিড নিক্ষেপের এক মহামারী চলন্ত ছিল। সে অবস্থা থেকে জাতি পরিত্রাণ পেয়েছে শুধুমাত্র কঠোর আইন প্রয়োগ করেই। তাই আমাদের বিশ্বাস এ ধর্ষণের মহামারীও একদিন বিলুপ্ত হবে যদি অচিরেই কার্যকরী আইন প্রয়োগ করা হয় এবং তা এ সরকার তথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই পারবেন। যেহেতু তারা সংস্কারমুখী, তারা আন্তরিক, জনবান্ধব এবং তারা কোন দলের লেজুড় নন।
সম্প্রতি “হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির” এক প্রতিবেদনে জানা গেছে দেশে গত পাঁচ বছরে (৬০০০) ছয় হাজারের বেশী নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ১৮ বছরের কম নারীশিশুই ছিল (৩৪৭১) তিন হাজার চারশত একাত্তর জন। ভাবা যায়? সভ্যতার সূতিকাগার এই নারীদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কোন দিকে?
সুতরাং বর্তমান সরকার যদি সত্যিই সুহৃদ হোন এবং জাতিকে এ মহামারীর হাত থেকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর হোন তবে এসিড নিক্ষেপ মহামারীর মত ধর্ষণের মহামারীও নিরোধ হবে অচিরেই।
সেই মহামারীর মূলোৎপাটন হয়তো যথাশীঘ্র ঘটবে না তবে যথারীতি ঘটার প্রক্রিয়াধীন হবে অবশ্যি। আর এটা আশা করা যায় আবারো বলছি বর্তমান এ নিরপেক্ষ সরকারের উপরই। আমরা তারই প্রতীক্ষায় থাকবোঃ “অন্ততঃ একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অনিবার্য হোক, সময় দীর্ঘায়িত না হোক, ধর্ষকের মহামারী উৎপাটন হোক চিরতরে। পাশাপাশি দেশে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটুক, শরয়ী আইনের বাস্তবায়ন চালু হোক, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তার সুবাতাস বহমান হোক। এ আকাক্সক্ষা পূরণও এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষেই সম্ভব।”
লেখিকা : প্রাবন্ধিক ও নারী সংগঠক।