মনসুর আহমদ
সমাজ সভ্যতার গোড়া থেকেই নারীর দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্র ছিল পুরুষদের থেকে আলাদা। কালের স্রোতে এক সময় সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলো এবং নারীদের একটি অংশ নিজদেরকে পুরুষদের সমান দায়িত্ব ও অধিকার লাভের হকদার মনে করল। যে কারণে কয়েক শতক ধরে নারী মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠল। নারী আন্দেলনের দাবিকে পূর্ণ করতে গড়ে উঠল নানা ধরনের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্থা। কিন্তু গড়ে ওঠা এসব সমাজ ব্যবস্থা তাদের চাহিদা মোতাবেক নারীদেরকে মুক্তি প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে ‘রিটা মে কেলি ও মেরী বুটিলিয়ার’দের গবেষণাপত্র “দি ম্যাকিং অফ পলিটিক্যাল উম্যান : এ স্টাডি অফ সোসিয়ালাইজেশন এ্যান্ড রোল কনফ্লিক্ট” গ্রন্থে।
উক্ত গবেষণা গ্রন্থে যে উপাত্ত ও তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে তা থেকে দেখা যায় যে, নারী সমাজের উঁচুতলায় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৭ শতকে সুবিধাভোগী উঁচু তলার মহিলাদের মনোযোগ ক্রমবর্ধমান হারে গৃহস্থালী থেকে সামাজিক পরিমণ্ডলে নিবদ্ধ হয়। কতকগুলো বিষয় এই পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছিল। পেশাদার সামরিক বাহিনীর উত্থানের মুখে এ সময় অভিজাতবর্গের কর্মভূমিকায় রূপান্তর ঘটে। অভিজাত আমত্যদের আর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা পালনের প্রয়োজন না থাকায়, তাদের সেই শক্তি ক্রমবর্ধমানহারে সামাজিক তৎপরতায় নিয়োজিত হয়। চতুর্দশ লুইয়ের ভার্সাই দরবার এ ব্যপারে পথিকৃৎ হয়ে ওঠে। চাকর বাকর পরিচালকের সংখ্য বাড়তে থাকায় কেবল বিত্তবান মহলেই নয় বরং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলারাও অভিজাত সমাজের অনুকরণে যথেষ্ট সুযোগ লাভ করে। আবাসগৃহগুলো আগের চেয়ে ভিন্নভাবে, অপেক্ষাকৃত বড় আকারে ও অনেক কক্ষ বিশিষ্ট করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোতলা করে নির্মিত হওয়ার ফলে নারীরা তাদের পরিবারের লোকজন থেকে মনোযোগ অপেক্ষাকৃত সহজে অন্যত্র নিবদ্ধ ও নিয়োজিত করতে সমর্থ হয়। এর ফলে ওরা নিভৃতে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়। প্রতিদিন সেই সময় টুকুর ঘন্টা পর ঘন্টা প্রসাধন চর্চায় ব্যয় করতে থাকে। ছেলেমেয়েদের ফাই-ফরমাশের ব্যস্ততা মুক্ত হয়ে একজন নারী এই পরিবেশে প্রসাধন কক্ষে বা বসার ঘরে তার গোটা প্রাণশক্তি ও উচ্চাকাক্সক্ষাকে সমাজনন্দিনী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। খোশগল্পের, আলাপচারিতার আর অপর দিকে তার স্বামী পুরুষ বন্ধুদের সাহচর্যে পানাহার আর জুয়াখেলার মত ‘পুরুষোচিত’ বিনোদনে লিপ্ত হতে সক্ষম হয়।
এই ধারায় শীঘ্রই পরিবর্তন অসে। রেনেসাঁর কাল থেকে প্রতীচ্য সংস্কৃতির সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীর প্রভাব ও ক্ষমতা উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। রেনেসাঁর ঘরকন্যার দায়মুক্ত অথচ স্বামী নির্ভর সমাজ সোভন এক অলোকপ্রাপ্তা নারী আদলে গড়ে ওঠে। আর এ আদল নিখুঁত, নিটোল, শ্রীময়ী হয়ে ওঠে ভার্সাই রাজ দরবারে। ফ্রান্স থেকেই ছড়িয়ে পড়ে বিপ্লবী আদর্শ ও ধ্যান ধারণা।
১৮ শতকের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণচাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা নারী সমাজেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যার ফলে অংশীদারীর প্রশ্নে তারাও সাড়া দেয়। ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডে নারীরা কেবল সামাজিক ক্ষেত্রেই নয় বরং বিভিন্ন ধ্যান Ñধারণার চর্চার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গৃহের সুসজ্জিত কক্ষে অভ্যাগতদের আলোচনায় শরীক এই নারীরা তাদের সমসাময়িক কালের সেরা মণীষীদের বক্তব্য শোনার সঙ্গে সঙ্গে কোনও বক্তব্যকে সাফল্যের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ প্রদান করে প্রাণবন্ত বক্তব্য পেশ করে তাদের হৃদয়ও জয় করতেন। ইংল্যাণ্ডে এই মহিলা বুদ্ধিজীবীরা বুস্টকিংস বা ‘জ্ঞানগরবিনী নারী’ নামে আখ্যায়িত হন। তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজদেরকে শিক্ষিত করে তুলতেন ও নিজ কন্যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ তত্ত্বাবধান করতেন। এধরনের বিদূষী মহিলারা প্রায় সকলেই নারীত্ব ও নারী ভূমিকার সনাতন ধারণাটি শিকেয় তুলে রেখে উন্নত নৈতিক চরিত্র ও চেতনা বিকাশকে আরও সমুন্নত করার বিষয়টিকে উৎসাহিত করতেন।
নারী মুক্তি অন্দোলন প্রথমে শুরু হয় ফ্রান্স থেকে। বৃটিশ বিদূষী নারীরা তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত থাকলেও ফ্রান্সের বৈঠকখানার অনেক বুদ্ধিজীবী নারীই দেশে বিপ্লব শুরু হলে তারা তাদের ধ্যান Ñধারণা ও তত্ত্বগুলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হন। তারা সকলের জন্য মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে দেশের বৃহত্তর নারী সমাজের সঙ্গে এক অস্বস্তিকর ধরনের জোট বাঁধেন। তার কেবল সুফলেই সমান অংশ গ্রহণ চাইলেন না শ্রমেও সমান অংশ গ্রহণে আগ্রহী হলেন। তারা চেয়েছিলেন কর্তব্য কাজের নেতৃত্বের দায়িত্ব বহন করতে কিন্তু তাদের হতাশ হতে হয় (যে রকম মার্কিন তরুণীরা ১৯৬০ এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দেলনের সময় হতাশাগ্রস্ত হয়েছিলেন)। তারা লক্ষ্য করলেন, ফরাসী পুরষেরা চান, তারা সহায়তাধর্মী চিরাচরিত নারী ভূমিকায় বিপ্লবী আন্দোলনের সাহায্য সহায়তা করুন। পুরুষেরা চাইলেন না , নরীরা নেতৃত্ব বা যোদ্ধ- সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক। কিন্তু তাদের চাওয়ায় কোন ফল হল না। নারী সমাজ তাদের অধিকার আন্দোলনে নেমে গেল আর তাদের দাবিÑ দাওয়ার প্রেক্ষাপটে জন্ম নিল বিভিন্ন মতাদর্শ।
বিভিন্ন মতাদর্শ নারীর মর্যাদার প্রতি জোর দিয়েছে তা স্মরণ করতে গিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী গ্রোথ উল্লেখ করেছেন, অধিকতর কর্তৃত্ববাদী ও রাজনীতিকভাবে রক্ষণশীল মতাদর্শ সমূহ সাধরণত নারীর অধীনতা ও নীচুপদমর্যাদার ওপর জোর দিয়ে এসেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের আমলে জার্মান নারীরা যে অগ্রগতি অর্জন করছিল নাজীবাদী শাসনামলে তা ব্যাহত হয়, যার ফলে জার্মান নারী সমাজ পূনরায় পূর্ববস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। নাজীবাদ ও ‘সন্তান-রন্নাঘর-গীর্জা’ এই দর্শনের আওতায় নারীর ভূমিকা থেকে স্পষ্ট করে আলাদা করে ফেলা হয়। ইয়র বুর্গ উল্লেখ করেছেন, ‘শ্রম শিবির ও যুব সংগঠনগুলোতে মেয়েদের মান্দাতার আমলের চাষিগৃহের গুণ মূল্যবোধ-আনুগত্য, কঠোর পরিশ্রম, পুরুষের সেবা ইদানিংকালের নব সংযোজন রাষ্ট্রের সেবা শিক্ষা দেওয়া হত।’
স্পেনে ফ্রাঙ্কোর একনায়কবাদী শাসনামলে কায়েমী ক্যাথলিক চার্চ ও রাজনৈতি দিক থেকে রক্ষণশীল ফ্যাসিস্ট সরকার নারীর সনাতন মর্যদাগত অবস্থান পুনর্বহাল করে। এমনকি, ১৯৭৪ সালের আইনেও স্পেনীয় তরুণীর জন্য বিয়ে না করলে কিংবা সন্ন্যাসিনীর ব্রত গহ্রণ না করলে পিতৃগৃহ ত্যগ নিষিদ্ধ ছিল। শুধু তাই নয়, একজন বিবাহিতা মহিলা স্বামীর অনুমতি ছাড়া চাকরি নিতে, ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলতে, পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে, চুক্তি স্বাক্ষর করতে কিংবা তার শিশুদের আইনগত জিম্মা নিতে পারত না।
গ্রীক-ইহুদী-খ্রিস্টান নারী ভূমিকা সংক্রান্ত আদর্শিক ঐতিহ্যও নারীর অবস্থানগত মর্যাদার প্রশ্নটি পর্যালোচনার অলোকে আমরা এই সিদ্ধন্তে উপনীত হতে পারি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল নারীর জন্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিয়মাচারগুলো কেবল তাদের রাজনৈতিক বিকাশের পরিবেশগত বিষয়কেই নয় বরং সেগুলো তাদের জীবন পরিক্রমার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অর্জনেরও উপায়।
যেসব মূল্যবোধ নারীত্বের নবতর সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে সেগুলো হচ্ছে লোকায়তবাদ (ধর্মনিরক্ষেতাবাদ), মানবতাবাদ, মানবীয় সাম্যবাদ, যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মূল্যবোধ মানবীয় বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ অপসারিত করেছে। মানবতাবাদ নারী-পুরুষ নির্বিশষে সকল ব্যক্তিকে মর্যাদা দেয়: মানব সাম্যবাদ সকলের সমতার প্রতি গুরুত্বারোপ করে; যুক্তিবাদ ঐতিহ্যমূলক সনাতন ব্যবস্থা ও গতানুগতিক চিন্তাধারাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে আর ব্যক্তিবাদ নারী পুুরুষ নির্বিশেষে মানব ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার পক্ষপাতী। এই সব মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সমাজের নিহিত জড়বাদী ও প্রযুক্তিগত বুনিয়াদ দ্বারা প্রভাবিত হলেও মানব আচরণের ওপর এগুলোর স্পস্টতই একটা বাঁধন মুক্তির ক্রিয়া আছে।
বিভিন্ন মতাদর্শের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বটে কিন্তু তা নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে কর্মপরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই গবেষকদ্বয় মন্তব্য করেন যে, ‘ পাশ্চাত্য সমাজ-সংস্কৃতিতে আধুনিকায়নের সঙ্গে (অর্থাৎ নগরায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়ন) জড়িত পুরুষদের জীবন পরিসরে নানা পবির্তন বিশ্বাস-ব্যবস্থায় এতখানি সুপরিগৃহিত ও বৈধ হয়ে উঠেছে যে, অগে ও বর্তমানে নিপীড়িত সংখ্যালঘিষ্ট গোষ্ঠী পুরুষেরা ছাড়া অন্য সকল পুরুষের ব্যক্তি ও রাজনৈতিকতার স্বাধীনতার যৌক্তিকতা প্রদর্শনে জন্য সচেতনভাবে পরিচালিত অনুষ্ঠান আনুষ্ঠানিকতার আর দরকার পড়ে না। কিন্তু মেয়েদের বেলায় অবস্থা তেমন নয়। যেসব আদর্শিক পরিবর্তন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মেয়েদের স্বাধীনকার্য সম্পাদনে উৎসাহিত করতে পারে তেমন পরিবর্তন আজও পরিপূর্ণ রূপে বাস্তবায়িত হয়নি। আর এ কারণেই নারীদের ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বধীনতায় এই আদর্শিক সমর্থন যোগনোর জন্য যেসব পরিবর্তন ঘটে সেই সব পরিবর্তনের উৎস সন্ধানের প্রয়াসের মাঝে আমরাও নারীর ভূমিকা ও অবস্থান সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাসে পরিবর্তন আশা করি।’
মার্কিন সুপ্রীমকোর্টে নারীর মর্যদা সম্পকিতর্ কিছু নমুনা মামলার নজির থেকে মার্কিন আইন ও রাজনতিক পদ্ধতির মধ্যে ধর্ম ও নারীর অবস্থানের মধ্যকার সম্পর্কের একটা চিত্র পাওয়া যাবে। ১৮৭২ সালের ব্র্যাডওয়েল বনাম রাষ্ট্রের মামলায় ফেডারেল সুপ্রীমকোর্ট ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে সুপ্রীমকোর্টের এক রায় বহাল রাখেন ঐ রায়ে নারীদের আইন ব্যবসায়ের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছিল। ব্র্যাডওয়েল তথা সংশ্লিষ্ট মহিল আইনজীবীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী পুরুষ আইনজীবী নারীদের যুক্তি সঙ্গত অযুক্তিসঙ্গত দাবি-দাওয়ার মধ্যে একটা সীমারেখা নির্দেশ করে তিনি তার মক্কেলের পক্ষ সমর্থনের প্রয়াস পান। তিনি যুক্তি দেখান , ঐ নারী আইনজীবী পুরুষের বিশেষ অধিকার কুক্ষিগত করতে চাননি কংবা ঈশ্বর ও প্রকৃতি কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত এখতিয়ারেও প্রবেশ করতে চাননি; এমনকি, মক্কেল মহানপ্রভু, সৃষ্টিকর্তা প্রতিনিধিস্বরূপ কোন যাজকও হতে চাননি যা স্পষ্টতঃই ঈশ্বর ও পুরুষের জন্য অমর্যদাকর হতে পারে। বরং তার মক্কেল আইন কাজে লাগিয়ে, অনুশীলন করে তার দক্ষতা ও প্রশিক্ষণকে প্রয়োগ করার সুযোগ চান মাত্র। তবে আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী নাগরিকদের কোন কোন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার অধিকার মঞ্জুর করেনি। আর তাই অঙ্গরাজ্যগুলো কে আইন, ডাক্তারি বা ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত হতে পারবে বা পারবে না তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ১৮৯৪ সালে একই ধরনের লকউড মামলায় সুপ্রীমকোর্ট এ বিষয় পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে রায় দেন যে, অঙ্গরাজ্য নারীদের বহির্ভূত রাখার লক্ষ্যে ‘ব্যক্তি ’ এই শব্দের বাখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন আদালতের দৃষ্টিতে নারীদের জন্য ব্যবহারজীবী হিসেবে নিয়োজিত হওয়া পুরুষের জন্য অবমাননাকর আর যেহেতু সেটি সম্প্রসারণক্রমে ঈশ্বরের জন্যও অমর্যদাকর নির্ধারিত হয়। মার্কিন সুপ্রীমকোর্টের বিভিন্ন মামলার রায় অনুযায়ী নারীর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে স্ত্রী ও জননীর; তার স্থান গৃহে কিংব বাবার নিরাপত্তার আশ্রয়ে বলেই গণ্য।
বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে নারীর পরিবর্তিত অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সর্বত্র একইরকমর নয় যদিও পরিবারে ঘরোয়া জগতে এই প্রতিরোধ তুলনামূলকভাবে কম ও লোকপরিমণ্ডলে নারীর ঐ অবস্থান অনেকখানি অবাধ। ইহুদী-খ্রিষ্টান ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নারীদের অবস্থানের সাথে মুসলিম ও হিন্দু নারীর অবস্থানের মধ্যে অনিবার্য কারণে অনেক ফারাক। আর এ ব্যাপারে অধিকতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যেও নারীর পরিবর্তিত অবস্থানের প্রশ্নে মাত্রাগত তারতম্য আছে। তাদের বিশ্বাস ব্যবস্থায় ঐ তারতম্য বাস্তব। দৃষ্টান্ত স্বরূপ,প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেসব দেশ নারী ভোটাধিকার মঞ্জুর করে সেই সব অধিকাংশ দেশে জনসমষ্টিই প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। এ দেশগুলো হচ্ছে : নিউজিল্যাণ্ড (১৮৯৩), অস্ট্রেলিয়া ( ১৯০২), ফিনল্যাণ্ড ( ১৯০৬) ও নরওয়ে (১৯১৩)। অথচ ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে ক্যাথলিকপ্রধান দেশগুলো নারী ভোটাধিকার মঞ্জুর করে।
এভাবে বিভিন্ন দর্শন ও ধর্ম নারীর মর্যাদ ও মুক্তি প্রদানের জন্য যেসব ব্যব¯া’ গ্রহণ করেছে তা কি নারী মুক্তির জন্য যথেষ্ট? যদি তাই হয় তা হলে নারী মুক্তি অন্দোলন বিশ্বময় জারি কাকতালীয়।
আসলে প্রচলিত নারীমুক্তির ধারণা বাতিল করে যে মতাদর্শ ইসলাম নারী পুরষকে একে অপরের পরিপুরক বা পোশাক (লেবাস) বলে ঘোষণা প্রদান করে, সেই শ্রেষ্ঠ মতাদর্শটি নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার একমাত্র বিধান। এ বিধানকে উপেক্ষা করে মানব সৃষ্ট বিভিন্ন বিধানের আশ্রয় নরী মুক্তির জন্য কল্যাণকর নয়।
সমাজবাদী আন্দোলন সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা সব মতাদর্শের জন্য প্রযোজ্য। সমাজবাদী আন্দালনগুলোও নারীগণ পুরুষের সমান এমন একটি প্লেটোবাদী মনোভাব গ্রহণের প্রবণতা প্রকাশ করছে। সমাজবাদী রাষ্ট্রগুলোতে উল্লেখিত আদর্শের ভিত্তিতে নারীর রাজনৈতিক, আইনগত ও অর্থনৈতিক সাম্য বিধানের জন্য আইন প্রণীত হয়েছে।
ইয়রবুর্গ বলেন, যেসব দেশে সমাজতন্ত্রী সরকার আনুষ্ঠানিক ধর্মগুলোকে বিলুপ্ত করার জন্য পদ্ধতিসম্মত প্রয়াস চালিয়েছে সেসব দেশে নারী-পুরুষের ভূমিকার পরিবর্তন ঘটেছে সব চে’ দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে, বিশেষ করে, নগর অঞ্চলের তরুণীদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুত এবং সেটা ঘটেছে সাবেকী আমলের ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারার জোরালো প্রভাবের ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও।
অবশ্য এখানে আমাদের উল্লেখ করতেই হয় যে, অনেক সমাজতান্ত্রিক দেশ যেমন সেভিয়েট ইউনিয়নেও নারী-ভূমিকা খর্ব করার মত ঘটনা ঘটেছে। উপর্যুক্ত উপাত্ত থেকে প্রমাণ হয় যে, নারীমুক্তির জন্য কেবল মাত্র মানব সৃষ্ট আইনই যথেষ্ট নয়।