॥ আব্দুল্লাহ আল মামুন ॥
ইতিহাস কোনো নিরপেক্ষ গ্রন্থ নয়। ইতিহাস পক্ষ নেয়- সে দাঁড়ায় রক্তের পাশে, যে রক্ত নিজের জন্য নয়, নিজের যুগের বোঝা বহনের জন্য ঝরে। তারা জন্ম নেয় চাপা শ্বাসে, দীর্ঘ অবহেলায় আর মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা অদৃশ্য আগুনে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব এই আগুনেরই দৃশ্যমান রূপ। আর সেই অগ্নিপুঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে যে নামগুলো নক্ষত্রের মত দ্রোহের শিখা হয়ে জ্বলছে এবং জ্বলবে; সেই নক্ষত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি উজ্জল নক্ষত্রের নাম বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী। তিনি ছিলেন সময়ের গর্ভে দীর্ঘদিন ধরে গঠিত হওয়া এক অনিবার্য বিপ্লবী চরিত্র- যে চরিত্র জন্ম নেয় যখন অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আর নীরবতা রাষ্ট্রের অলংকার হয়। তিনি কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ নন, তিনি ছিলেন বহুবছর ধরে জমে ওঠা জাতীয় বেদনার দর্শন। তিনি ছিলেন প্রশ্ন- যে প্রশ্নের উত্তর দিতে রাষ্ট্র ভয় পায়, আর সাম্রাজ্যবাদ কাঁপে। সব মানুষ দেশপ্রেমিক নয়। কেউ কেবল ভূখণ্ড ভালোবাসে, কেউ পতাকার রঙ, কেউ স্মৃতির সুবিধাজনক অংশ। কিন্তু বিপ্লবী ভালোবাসে সত্য- যা প্রায়ই নিষ্ঠুর,যা প্রায়ই একা।
বাংলা মাতৃকার রতœ বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী এই নিষ্ঠুর সত্যের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন- ইনসাফ কখনো উপহার হিসেবে আসে না, ইনসাফ আদায় করতে হয় নিজের জীবন বাজি রেখে। এই কারণেই তিনি সম্মুখ সারিতে। কারণ পেছনের সারিতে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু ইতিহাস লেখা যায় না। ভারতীয় আধিপত্যবাদ কেবল সীমান্তের আগ্রাসন নয়- এটি চিন্তার দখল, অর্থনীতির শৃঙ্খল আর আত্মসম্মানের ধীর হত্যাযজ্ঞ। আধিপত্য সবসময় কামানের শব্দে আসে না। কখনো যুক্তির পোশাকে, কখনো উন্নয়নের মুখোশে, কখনো “বাস্তবতার” নরম ভাষায়।
এই নরম আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই হাদীর তীক্ষè অবস্থান। তিনি বুঝেছিলেন- যে পরাধীনতা যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে, তা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে কণ্ঠ ওঠে, সে কণ্ঠ জানে- তার জন্য পুরস্কার নেই আছে কেবল শাস্তির দীর্ঘ ছায়া। হাদী সেই কণ্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর বজ্রধ্বনি ছিল দর্শনসম্মত- কারণ তিনি জানতেন, স্বাধীনতা মানে কারো বিরুদ্ধে ঘৃণা নয়, স্বাধীনতা মানে নিজের ওপর কারো আধিপত্য না মানা। শাহাদত- এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত নেয় বিপ্লবী, যখন সে বোঝে- এই রাষ্ট্রে ন্যায়ের দাম জীবন। হাদী সেই মূল্য জেনেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তাঁর রক্ত তাই আবেগ নয়, তাঁর রক্ত যুক্তি এবং এই জাতির মুক্তির শপথ। এই যুক্তি বলে- যে জাতি শহীদ ভুলে যায়, সে জাতি ভবিষ্যৎ হারায়।
আজ যারা শোক প্রকাশ করে, তাদের সকলেই সহযোদ্ধা নয়। সহযোদ্ধা তারা, যারা এই শাহাদতকে নিজের জীবনের প্রশ্নে রূপান্তর করবে। কারণ বিপ্লবীর মৃত্যু কাঁদবার জন্য নয়, বদলে যাবার জন্য, বদলে দেয়ার জন্য। ওসমান হাদীর শাহাদাত আমাদের শেখায়- নিরপেক্ষতা একটি মিথ্যা বিলাসিতা, আর নীরবতা অপরাধের সবচেয়ে ভদ্র রূপ। হে বাংলা মাতৃকার বীর সন্তান বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী, তুমি এখন কোনো নাম নও- তুমি একটি মানদ-। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি বিপ্লবীকে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে- “আমি কতটা সত্যের পক্ষে?”
বাংলা মাতৃকা আজ শোকস্তব্ধ নন, কঠোর। কারণ মাতৃভূমি জানে- কিছু সন্তান কান্নার জন্য নয়, চেতনার জন্য জন্মায়। বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী আজ কোনো ব্যক্তিনাম নন। তিনি জুলাই বিপ্লবের গোপন ব্যাকরণ।
যেখানে লেখা আছে-
যদি অন্যায় দীর্ঘ হয়, তবে উত্তর হবে গভীর।
যদি সত্য চেপে ধরা হয়, তবে তা একদিন রক্তের ভাষায় প্রকাশ পায়।
এই লেখা ফুলেল শ্রদ্ধা নয়, এটি একটি শপথ।
যতদিন ইনসাফ অসম্পূর্ণ,
যতদিন আধিপত্য প্রশ্নহীন,
যতদিন রাষ্ট্র মজলুমের কাছে ঋণী,
যতদিন দেশপ্রেম কেবল উচ্চারণে সীমাবদ্ধ-
ততদিন বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী বর্তমান।
হে বিপ্লবী সংগ্রামী সালাম।
এই লাল রঙ দৃশ্যমান নয়, এটি বিবেকের অভ্যন্তরে রাখা বিপ্লবের দর্শন।
শহীদ স্মৃতি নয়- শহীদ দায়িত্ব।
বিপ্লব বিলাস নয়-বিপ্লব কর্তব্য।
জুলাই কোনো তারিখ নয়- একটি চলমান চেতনা।