জামায়াতের সাম্প্রতিক উত্থানে রুষ্ট একশ্রেণির লোক শোরগোল তুলে বলতে চেষ্টা করছেন যে, দলটি দেশ পরিচলনা করতে ব্যর্থ হবে। অনেকে আবার দলটিকে ধর্মান্ধ ও ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী আখ্যায়িত করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ইমামতিতে নামায পড়া হারাম বলেও ফতোয়া দেয়া শুরু করেছেন। এর মধ্যে জামায়াত অনেকটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি সম্মেলন আহ্বান করে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের সামনে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি সামগ্রিক চাকাকে সচল রাখার একটি রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। তার এ ঘোষণাকে আমি অভিনন্দন জানাই। সম্মেলনে আমি না থাকলেও তার প্রত্যেকটি ইনপুট আমি পড়েছি এবং তার বাস্তবতা স্বীকার করছি। এখানে আমার কিছু বলারও আছে। আমি আমাদের গ্রামীণ খাত দিয়েই আজকের আলোচনা শুরু করতে চাই। ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব বাংলার গ্রামোন্নয়নের জন্য দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক প্রচেষ্টা ও অনুশীলনের মাধ্যমে দশটি মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। মূল নীতিগুলো ছিল নিম্নরূপ :
১। পল্লী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সরকারি বিভাগ ও এজেন্সির সমন্বয়ে প্রণীত বোধগম্য ও সমন্বিত একটি কর্মসূচি।
২। উন্নয়ন বিভাগ ও এজেন্সিসমূহকে জনগণের সেবায় ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানোর জন্য বেসামরিক প্রশাসনকে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন অপরিহার্য।
৩। স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেসামরিক প্রশাসনের তরফ থেকে অবশ্যই সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
৪। গ্রামের মানুষের জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন যা শোষণমূলক মহাজনি প্রথার পরিবর্তে কৃষক ও বিত্তহীন মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল নিশ্চিত করতে পারবে।
৫। পল্লী এলাকায় বেশিরভাগ মানুষই হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক অথবা বর্গাচাষি। তাদের অর্থনৈতিক ও কারিগরি উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
৬। উন্নত কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তির শিক্ষা-প্রশিক্ষণকে ফলপ্রসূ করার জন্য কৃষকদের সমবায় বা গ্রুপে সংগঠিত করা প্রয়োজন।
৭। যারা সমবায়ের বা গ্রুপের নেতা অথবা চেঞ্জ এজেন্ট হবেন তাদেরকে অবশ্যই স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি হতে হবে।
৮। স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি, তা ইউনিয়ন পরিষদ বা সমবায় সমিতি যাই হোক না কেন, তাদের জন্য প্রশাসন, হিসাবরক্ষণ ও প্রযুক্তি সর্ববিষয়ে ব্যাপক ও অব্যাহত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৯। শুধু প্রশিক্ষণ দিলে চলবে না, প্রশিক্ষণকে কাজে লাগানোর জন্য সেবা ও সরবরাহ এবং মূলধন সবকিছুরই ব্যবস্থা করতে হবে।
১০। পল্লী এলাকায় সরকারকে যথোপযুক্ত উন্নয়ন অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্যে বেশি বেশি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
১১। গ্রামোন্নয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ করে থানা বা উপজেলা পর্যায়ে যারা করে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও কর্তৃত্বের অধিকারী হতে হবে।
উপরোক্ত নীতিমালাসমূহকে অনুসরণ করে সারা বাংলাদেশে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল, সুদখোর মহাজনদের বিকল্প হিসেবে এবং সরকারের কাছ থেকে কৃষকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের এজেন্ট হিসেবে গ্রাম পর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতি এবং উপজেলা পর্যায়ে তাদের ফেডারেশন তথা UCCA প্রতিষ্ঠিত হয়। থানা পর্যায়ে সিভিল প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত হয় TTDC বা UTDC থানা বা উপজেলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রে গ্রামীণ সমবায়ের চেঞ্জ এজেন্ট হিসেবে ম্যানেজারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ছিল এ কেন্দ্রসমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ প্রযুক্তি বিশেষ করে উচ্চ ফলনশীল ফসলের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, বালাইনাশক, সেচের পানি ব্যবহার, ক্রপ রোটেশন প্রভৃতির ওপর প্রতি সপ্তাহে এখানে প্রশিক্ষণ হতো এবং প্রায়োগিক সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা হতো, থানা বা উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সরকারি অফিসগুলো প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রের একই ছাদের নীচে অফিস বরাদ্দ পাবার ফলে কৃষকদের হয়রানি হ্রাস পায় এবং সরকারি বিভাগ ও এজেন্সিগুলোও তাদের নিজ নিজ কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে সহজে অবহিত করার সুযোগ পাবার পাশাপাশি জনগণের প্রতি তাদের জবাবদিহিতার পথও উন্মুক্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে আমরা নীতিচ্যুত হয়ে পড়ি এবং আমাদের সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ন্যায় সমবায়সহ গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানসমূহও ধ্বংস হয়ে যায়। এগুলোর পুনর্গঠন ও সংস্কার প্রয়োজন।
পাঠকরা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে, আমাদের কৃষকদের সমস্যা দুটি; একটি হচ্ছে উৎপাদনের সমস্যা আরেকটি হচ্ছে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তীর সমস্যা। সার, বীজ, ওষুধ, সেচের পানি ও মূলধন হচ্ছে তাদের উৎপাদনের সমস্যাগুলোর অন্যতম। প্রচলতি জৈব সারের মোকাবিলায় আমাদের দেশে রাসায়নিক সারের প্রচলন হয়েছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদন বেড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এর ফলে মাটি তার স্বাভাবিক উর্বরতাও হারাচ্ছে এবং চাষাবাদে Law of Dimining Return দেখা যাচ্ছে। এটা দূর করার জন্য Compost সার তৈরিতে ও ব্যবহারে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে হচ্ছে। আবার অধিক ফলনশীল বীজের বেলায়ও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা হাইব্রিড বীজে অভ্যস্ত হচ্ছি, ফলনও বাড়ছে কিন্তু এ বীজ তৈরির ভার মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়ার ফলে সময়মত বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পেলেও চড়া দাম সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রশিক্ষণের অভাবে কীটনাশক ও বাইনাশক ব্যবহারেও সমস্যা হচ্ছে।
পোকামাকড়ের জন্য Insecticide এবং রোগবালাই এর জন্য Fungicide ব্যবহারের পরিবর্তে অনেক কৃষককে উভয় ক্ষেত্রে একই ওষুধ ব্যবহার করতে দেখা যায়। এতে অর্থ ও সম্পদ উভয়েরই অপচয় হয়। সেচের বেলায় আরো বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভারত কর্তৃক আন্তর্জাতিক নদীসমূহের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে তাদের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ফলে আমরা ভূউপরিস্থ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি এবং আমরা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীর পানি থেকে বঞ্চিত হয়ে সেচ এলাকা কমাতে বাধ্য হচ্ছি। আবার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, আবার উত্তোলিত পানির মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানসমূহ Residue হিসেবে জমিতে জমা হবার ফলে জমির উর্বতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এতে আমাদের উৎপাদন কমছে না বরং হ্রাস পাচ্ছে বা স্থবির হয়ে পড়ছে।
এখন ফসলের ন্যায্যমূল্যের প্রশ্নে আসি। কৃষকরা অনেক পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেন, তা দানা জাতীয় খাদ্যশস্য অথবা তরিতরকারি যাই হোক না কেন, উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহের জন্য তাদেরকে ব্যাংক, বন্ধুবান্ধব বা সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হয়, প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ফসল যখন ঘরে আসে তখন এ ঋণ শোধ করতে হয়, না হলে সার্টিফিকেট মামলার শিকার হতে হয়।
কাজেই ফসলের মওসুমেই ফসল বিক্রি করে ঋণ শোধ করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক, তাও সুদে আসলে। এ ফসল তারা যদি ধরে রেখে তিন চার মাস পরে বিক্রি করতে পারতো তা হলে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করতে পারতো। তাদের জন্য যদি সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থাও থাকতো তাহলে তাদের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাল থাকতো। পাকিস্তান আমলে কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত তাক্কাডি ঋণের ব্যবস্থা ছিল, এখন নেই। কিন্তু তাদের যেমন ন্যায্যমূল্য দেয়া দরকার তেমনি সুদ থেকেও উদ্ধার করা দরকার। একমাত্র জামায়াতই তা করতে পারে, কিভাবে?
বিভিন্ন সূত্রে আমার গৃহীত হিসাব অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি বিভাগ, বিএডিসি ও বিআরডিবি এবং খাদ্য বিভাগের পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা গুদামের সংখ্যা প্রায় ৮০০, এগুলো মেরামত ও ব্যবহার উপযোগী করে গুদাম হিসেবে পুনঃব্যভহার করা যায়। কৃষকরা তাদের বিক্রিযোগ্য পণ্য গুদামে জমা দিবেন এবং মণপ্রতি প্রচলিত বাজার দরের ৮০% সরকার থেকে আগাম মূল্য ঋণ নিতে পারবেন। এভাবে প্রত্যেক এলাকায় পরিকল্পিতভাবে যদি গুদামজাত ঋণ চালু করা হয় এবং তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে তিন, চার ও পাঁচ মাস পর কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ থেকে প্রশাসন ব্যয় বাবত একটি অংক রেখে বাকীটা আনুপাতিক হারে কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দয়া হয় তাহলে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে তাদের সমস্যা হতে পারে না। বিক্রীত অর্থ থেকে তাদের প্রদত্ত অগ্রীম ঋণ কেটে নেয়া যেতে পারে। আবার বিক্রির কাজ এক সাথে না করে তিন-চার মাস ধরে করলে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং ব্যাপারী ফড়িয়ারা সংকট সৃষ্টি করতেও ব্যর্থ হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এবং জাপানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা তাদের কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছিলেন। আমরা না পারার কারণ নেই।
দেশের সমবায়গুলো এখন সাবেক ক্ষমতাসীনদের পকেটে পরিণত হয়েছে। এগুলো সংস্কার করে জনগণের কাজে লাগানো অপরিহায্য হয়ে পড়েছে বলে আমি মনে করি।