মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের পথচলা। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের পর জুলাই’ ২৫ অভূতপূর্ব এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবারও মুক্ত করেছে একটি সুন্দর, সাবলীল, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে। তাই এই নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ এবং নিরপেক্ষ। কেননা এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক শর্ত। অতীতের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনী ব্যবস্থা অর্থ্যাৎ ক্ষমতাসীন দল যে কোন উপায়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মানসে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজেদের স্বার্থে যথেচ্ছ ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি কখনও। জুলাইয়ের গণঅভুত্থ্যানের পর জনগণের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে-অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং ক্ষমতার কার্যকর ভারসাম্য ও জবাদিহি নিশ্চিত করে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র স্থায়ী অবসানের একটি পরিপুষ্ট বীজ বপন করবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম অনেকটা এগিয়ে গেলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কিন্তু ততটা ভালো নয়। সর্বত্র এক ধরনের অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। তারপরও দেশের জনগণ মুখিয়ে আছে এই নির্বাচনের জন্য। কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় না বসবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে না। নির্বাচনে সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে-ভোটারদের দায়বদ্ধতা অর্থ্যাৎ ভোটারগণ কাকে ভোট দিবেন, কেন ভোট দিবেন। ভোটারদের মনোনয়নের উপর নির্ভর করছে কেমন হবে আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ। কেমন হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তমাখা রাজপথ পেরিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসা মানুষগুলোর চরিত্র। আপনার একটি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে আগামী পাঁচ বছরের রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা। আপনি যেমনটি চাইবেন তেমনটিই হবে আপনার প্রাণের বাংলাদেশ। তাই ভোটার হিসেবে আপনার-আমার দায়বদ্ধতা কিন্তু অনেক বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক হিসেবে আপনার ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক সুযোগ নয় বরং নাগরিক অধিকার এবং নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনি হয়তো ভাবছেন ভোট একটা আছে দিয়ে দিলাম, হয়ে গেল। কিন্তু বিষয়টি আসলেই সেরকম নয়; এর উপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি। ভোটার হিসেবে আপনি যখন কাউকে ভোট দেন তখন মনে রাখবেন আপনি কাউকে নেতৃত্ব বা দায়িত্বের জন্য মনোনয়ন দিচ্ছেন। তখন আপনি একটি সামষ্টিক সিদ্ধান্তের অংশীদার হয়ে একজনকে ঐ কাজের বা দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করে তাকে নির্বাচিত করছেন। তাই আপনার ভোট অত্যন্ত মূল্যবান ও আমানত স্বরূপ। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার মৌলিক দায়িত্ব হলো ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। আমরা অনেকেই মনে করি ‘আমি’ একজন ভোট না দিলেই বা কী! বিষয়টি আসলে সেরকম নয়। বাস্তবতা হলো এরকম অনেক নির্বাচন আছে যেখানে এক/দুই ভোটের ব্যবধানে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। আর আপনি যদি ভোট না দেন সেটি হবে আপনার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে আপনি নিজেই গলাটিপে হত্যা করার মতো। যেহেতু ভোটের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠন হবে এবং নির্বাচিত রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাবে সেহেতু আপনি যদি আপনার ভোট প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব থেকেও আপনি দূরে সরে গেলেন। তাই একজন নাগরিক হিসেবে আপনার আমার সকলের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেমন প্রার্থীকে আমরা ভোট দিব বা কোন বিবেচনায় কাকে যোগ্য মনে করবো? যোগ্যতার মাপকাটিই বা কী হতে পারে। বিষয়টি যদিও ব্যাপক তবুও সাধারণভাবে একজন যোগ্যপ্রার্থী বেছে নেয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি- তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, নৈতিক চরিত্র, সততা ও আমানতদারিত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, জনসেবা ও ন্যায়বিচারের মনোভাব। এইসমস্ত গুণাবলি যেসব প্রার্থীর চরিত্রে পাওয়া যাবে তাকে মনে করতে পারেন আপনার ভোট প্রদানের জন্য একজন যোগ্যপ্রার্থী। তাছাড়াও দেখতে হবে প্রার্থীর দলীয় পরিচয়, নির্বাচনী ইশতেহার, অতীত ইতিহাস এবং তারা এদেশের মাটি ও মানুষের জন্য নিরাপদ ও আস্থাশীল কিনা। একজন দায়িত্বশীল ভোটার কখনও ব্যক্তিস্বার্থ, ভয়ভীতি, আবেগ কিংবা নির্বাচনকালীন কোন রঙিন প্রতিশ্রুতির মোহে পড়ে যে কাউকে ভোট দিতে পারেন না। ভোটারদের উচিত কোন ধরনের প্রলোভনের ফাঁদে না পড়ে নিজের বিবেককে সজাগ রেখে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। প্রার্থী বা প্রার্থীর রাজনৈতিক দলের আদর্শ, তাদের অতীত শাসনামল, প্রার্থীর নৈতিক চরিত্র, সামাজিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাধারণের সাথে প্রার্থীর আচার-আচরণ এবং সর্বোপরি ঐ প্রার্থী রাষ্ট্রপরিচালনার মতো গুরুদায়িত্ব পালনে যোগ্য কিনা, মানুষের অধিকার আদায়ে, সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী বা পারঙ্গম কিনা এসব বিষয় বিবেচনা করে নিজের মুল্যবান ভোট প্রদান করা। আপনি যদি আজকে একজন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, সুদখোর, চরিত্রহীন কালোটাকার মালিককে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নেতৃত্বের ভার দেন তাহলে কখনও ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা আশা করতে পারবেন না।
ভোট যদি আপনি সামান্য টাকার লোভে বা সাময়িক ক্ষমতার মোহে অযোগ্য প্রার্থীকে প্রদান করেন তাহলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবেন। কারণ আপনি বরই বিচি রোপণ করে আঙ্গুর ফল পাবেন না। বরই গাছে বরই ধরে আঙ্গুর ধরে না। যেমন কর্ম তেমন ফল পাবেন। যেমন প্রার্থী নির্বাচন করবেন তেমনই শাসন পাবেন। তাই আসন্ন নির্বাচনে আপনার মূল্যবান ভোট দেয়ার আগে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে বাছাই করে নিবেন যাতে করে অতীতের মতো আর কোন ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতিবাজ আমাদের নেতা হয়ে না উঠে এবং আমাদের যেন দুঃশাসনের নিকষ কালো টানেলে ফেরত যেতে না হয়। আপনার ভোট আপনি দিবেন, যিনি যোগ্য তাকে দিবেন। অযোগ্য কাউকে ভোট দেয়া মোটেও উচিত হবে না। কেননা প্রিয় নবী (দ.) বলেছেন-‘যে ব্যক্তি এমন একজনকে দায়িত্ব দেয়, অথচ জানে তার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি রয়েছে-সে আল্লাহ, রাসুল ও সমগ্র মুমিনদের সাথে খেয়ানত করল’। (মুস্তাদারেক হাকিম)। তাই আত্মীয়তা, ব্যক্তিস্বার্থ, ভয়, লোভ ও পার্থিব স্বার্থের বশবতী হয়ে অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া এক প্রকার আমানতের খেয়ানত। ভোটারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে, পছন্দ-অপছন্দ থাকবে, তর্ক-বিতর্কও হতে পারে কিন্তু তা যেন সহিংসতার পর্যায়ে না যায় সেজন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা প্রত্যেকে একেকটি নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা এবং প্রতিবেশি। ভোটের কারণে যেন আমরা নিজেদের মধ্যে কোন ধরনের কলহে জড়িয়ে না পড়ি। প্রত্যেকের ভোটাধিকার যেন সমুন্নত থাকে সেভাবে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশকে সুশৃংঙ্খল ও নিরাপদ রাখার কাজে যেন সহায়তা করি। গণতান্ত্রিক চেতনাবোধে জাগ্রত হয়ে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে একটি সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা ভোটারদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : প্রবাসী প্রাবন্ধিক, সৌদি আরব।