পৃথিবীর সবচেয়ে সুমধুর পবিত্রম একটি শব্দ হচ্ছে মা। এই একটি শব্দের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মমতা, ভালোবাসা, ত্যাগ, নিরাপত্তা এবং নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের এক অনন্য মহিমা। সন্তানের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে মায়ের ভালোবাসা। আর মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে পৃথিবীর কোন কিছুরই তুলনা চলে না। ফলে একজন মানুষ পৃথিবীর অনেক ঋণ পরিশোধ করতে পারলেও মায়ের এক ফোটা দুধের দাম কিছুতেই পরিশোধ করতে পারে না। সন্তান নিজের গায়ের চামড়া কেটে জুতো বা পাপোশ বানিয়ে দিলেও মায়ের ঋণ শোধ হয় না। কারণ এই ঋণ পরিমাপের নয়, পরিশোধেরও নয়। একজন মা সন্তানের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকেন। নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের মুখে আহার তুলে দেন। নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। সন্তানের সামান্য জ¦র, কাশি কিংবা অসুস্থতায় মায়ের হৃদয় অস্থির হয়ে ওঠে। রাতের পর রাত জায়নামাজে বসে অশ্রুসজল চোখে আরশের মালিকের কাছে সন্তানের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন। অনেক সময় নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানের জীবন ভিক্ষা চাইতে দ্বিধা করেন না। অথচ জীবনের নির্মম বাস্তবতায় দেখা যায় সেই মায়ের জীবন যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন অনেক সন্তানই তাঁর জন্য সেই একই ব্যাকুলতা অনুভব করে না। ‘‘কথায় আছে, একজন মা দশজন সন্তানকে মানুষ করতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় দশজন সন্তানও মিলে একজন মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে না।’’ ফলে কিছু মায়ের জীবনের শেষ প্রান্তে কপালে জোটে অবহেলা, অনাদর, নিঃসঙ্গতা আর বুকফাটা আর্তনাদ। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মায়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনা মানবতার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। মৃত নূরজাহান বেগমের সন্তানেরা সমাজে অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং একজন স্কুলশিক্ষিকা। সন্তানদের এমন গৌরবময় অবস্থানের পরেও এই জম্মদাত্রী মাকে একাকী, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর ঘরে অবহেলা আর অনাহারে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে।

নূরজাহান বেগমের এই করুণ মৃত্যু আমাদের সমাজে কোনো আলাদা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের চারপাশে এমন নিষ্ঠুর ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এমন অনেক মায়ের নীরব কান্না আমরা শুনতে পাই না। তবে নূরজাহান বেগমের এই নিঃসঙ্গ ও মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের তথাকথিত উচ্চশিক্ষা, বড় বড় ডিগ্রি আর সফলতার মুখে এক মস্ত বড় চপেটাঘাত। এই ঘটনায় অপরাধী সন্তানদের আমরা ফেসবুকে ধুয়ে দিয়েছি। তীব্র ক্ষোভের মুখে সরকারি চাকরিজীবী সন্তানের বদলি হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতে রীটও করা হয়েছে। সন্তানরা যে চরম অপরাধী এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া তা নিয়ে সমাজে বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। কিন্তু শুধু তাদের পক্ষে ওকালতি করা বা সামাজিক মাধ্যমে বিরোধিতা করাই এখানে মূল বিষয় নয়; বরং এই ঘটনাটি আমাদের সামষ্টিক বিবেককে নাড়া দেয়ার এক চরম ও রূঢ় বাস্তবতা। এটি আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি? যে শিক্ষা মা-বাবার প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা শেখাতে পারে না, সে শিক্ষার আসল মূল্য কতটুকু? এই সামাজিক অবক্ষয় রুখতে এখন শুধু আইনি শাস্তি নয়, বরং আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ ও ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। মিরপুরের এই মায়ের জন্য আমরা ফেসবুকে দুঃখের বন্যা ভাসালেও আমাদের দেশে যে প্রতিনিয়ত নতুন বৃদ্ধাশ্রম বাড়ছে, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ সেই বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালে শত শত মা বছরের পর বছর সন্তানের পথ চেয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছে। কিন্তু আমরা তা নিয়ে মোটেও ভাবছি না। ইট পাথরের এই ব্যস্ত শহরে আমরা আজ মেট্রোরেলে চড়ি এবং আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে গর্ব করি। কিন্তু নৈতিক আর মানবিক দিক থেকে আমরা যে কতটা দেউলিয়া আর কাঙাল হয়ে পড়েছি, মিরপুরের এই করুণ ঘটনাটি তার জ¦লন্ত প্রমাণ। এটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বা দুর্ঘটনার বিষয় নয়; এটি আমাদের বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা এবং পারিবারিক বন্ধনহীনতার এক চরম ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত।

আমরা যখন ইট-কংক্রিটের অবকাঠামো গড়তে ব্যস্ত ঠিক তখন চোখের আড়ালে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে আমাদের পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। আমরা সাময়িক আবেগে ফেসবুকে ঝড় তুলি। কিন্তু আমাদের পারিবারিক কাঠামোর যে স্থায়ী ধস নেমেছে সে বিষয়টি নিয়ে কেউ ভাবি না। এমনকি মেরামতের কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করি না। আমাদের সমাজ এমন নিষ্ঠুর ছিল না। মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই একসাথে মিলেমিশে যৌথ পরিবারে পরম শান্তিতে বসবাস করতো।

অধিকাংশ পরিবারের ছেলেরা তখন পড়াশোনার চেয়ে গ্রামে কৃষি কাজ বা ব্যবসা করাকে বেশি পছন্দ করতো। পুরো গ্রাম জুড়ে একজন এসএসসি পাস লোক খুঁজে পাওয়াও তখন কঠিন ছিল। আর আজ প্রতিটি ঘরে ঘরে উচ্চশিক্ষিত ও এসএসসি পাস মানুষ পাওয়া যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সাথে আমাদের নৈতিকতা আর পারিবারিক বন্ধনগুলো কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। ডিগ্রি বাড়লেও মানুষের ভেতরের মানবিকতা আর মায়া-মমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষার আলো আমাদের ঘরকে আলোকিত করলেও নৈতিকতা হৃদয়ে জাগ্রত হচ্ছে না। ফলে আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু অসহায় মা-বাবার সংখ্যাও বাড়ছে। এই অপ্রিয় সত্যটা আমরা কেউ খতিয়ে দেখছি না। মূল সমস্যায় হাত না দিয়ে শুধু ওপর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছি। ফলে একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ঘটনা আগের ঘটনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। আমরাও বেমালুম ভুলে যাচ্ছি। মিরপুরের নূরজাহান বেগমেন করুণ মৃত্যুর ঘটনার দাগ শুকাতে না শুকাতে মিরপুরের পল্লবীতে ৩ জুন ২০২৬ তারিখে সেলিনা আফরোজ নামের এক নিঃসঙ্গ নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। তিনি পল্লবী সেকশন-৬, সি ব্লকের ১০ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সম্পূর্ণ একা বসবাস করছিলেন। তাঁর স্বামী ও সন্তানরা সবাই কানাডাপ্রবাসী। গত ৩ জুন তাঁর ফ্ল্যাটটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। সেখান থেকে তীব্র পচা দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে স্বজনরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এসে দরজা ভেঙে ঘরের মেঝে থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করেছে।

কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে বসবাস করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ছেলে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য শহরে চলে যাচ্ছে এবং বিয়ে করে বউকে নিয়ে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছে। পারিবারিক কাঠামোর এই পরিবর্তনের সাথে সাথে বউ শাশুড়ির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং সহনশীলতার চরম অভাব পরিবারকে অস্থির করে তুলছে। ছেলে বিয়ে করার পর অনেক পরিবারেই যেন অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। একদিকে মা চান ছেলে আর বউ গ্রামের বাড়িতে তাঁর কথামতো চলুক; অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত স্ত্রী চান শহরের কর্মস্থলের পাশে নিজের মতো করে স্বাধীন সংসার সাজাতে। এখানে শাশুড়ির মাতৃত্বের অহংকার আর পুত্রবধূর আধুনিক জীবনের অধিকারের লড়াইয়ে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি নয়। তাছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু মায়েদের মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য ও ভুল সিদ্ধান্ত। এই ভুলগুলো অনেক সময় মায়েরা নিজের মনের অজান্তেই করে ফেলেন, যা সন্তানকে তাঁর বুক থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। কিছু মা আবেগ বা জেদের বশে কোনো এক সন্তান বা মেয়েকে নিজের সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেন। সম্পত্তি বন্টনের এই বৈষম্য অন্য সন্তানদের মনে তীব্র ক্ষোভ আর দূরত্বের জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, কিছু মা নিজের মেয়ের একশোটি ভুল বা অপরাধকেও পরম স্নেহে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু পুত্রবধূর একটি ছোট ভুলকেও সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো আপন করে নেয়ার মানসিকতা যেমন অনেক শাশুড়ির থাকে না, তেমনি অনেক পুত্রবধূও শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে বসাতে পারেন না। এই যে পারস্পরিক আস্থার অভাব, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং ক্ষমার অযোগ্য মনোভাব এটাই মূলত একটি সুন্দর পরিবারকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়। আর এর শেষ পরিণতি হয় মা-বাবার বৃদ্ধ বয়সের চরম নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও করুণ এক বিদায়।

আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবীদের যুগে আজকের আধুনিক সমাজের মতো শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে এমন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বের চিত্র দেখা যেত না। কারণ তাঁদের প্রত্যেকের ভেতর চমৎকার দ্বীনি বোঝাপড়া এবং একে অপরের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের পর স্ত্রীর জন্য আলাদা বা স্বাধীন বাসস্থান নিশ্চিত করা স্বামীর দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে এই নিয়মের পূর্ণ চর্চা ছিল। প্রাত্যহিক ছোটখাটো বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি বা ইগোর লড়াইয়ের কোনো সুযোগই তৈরি হতো না। সাহাবীদের যুগে শাশুড়িরা পুত্রবধূদের ঘরের কাজের দাসী মনে করতেন না; বরং নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। হযরত ফাতেমা (রা.) যখন হযরত আলী (রা.) এর ঘরে যান, তখন তাঁর শাশুড়ি ফাতিমা বিনতে আসাদ (রা.) তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ ও ভালোবাসায় বরণ করে নেন। তাঁরা ঘরের কাজ নিজেদের মধ্যে সুন্দরভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন। শাশুড়ি ফাতিমা বিনতে আসাদ (রা.) বলতেন, ফাতেমা নবীজী (সা.) এর কলিজার টুকরো। ও ঘরের বাইরে ভারী কাজ করতে কষ্ট পাবে। তাঁদের এই চমৎকার সম্পর্কটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সে যুগে কেউ কারও ওপর জোর করে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না; বরং অধিকার ও কর্তব্যের চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতেন। আজকের সমাজে এই দ্বীনি শিক্ষা আর সহনশীলতার অভাবই পরিবারগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক সম্প্রীতি হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমরা ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে তীব্রভাবে ছিটকে পড়েছি। বিশেষ করে স্রষ্টার প্রতি ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতা আমরা প্রায় ভুলে গেছি। আজ আমরা শুধু টাকা আর স্বার্থের পেছনে ছুটছি। ফলে আমাদের চারপাশের পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়গুলো আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। সুতরাং এই ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে এবং পরিবারগুলোকে বাঁচাতে দল মত নির্বিশেষে আমাদের সবারই এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।