২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুস রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে দেন। কমিশনগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যা রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের সাথে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রস্তুত করে। এর উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন। আর সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার কার্যকর করতে জনগণের অনুমোদন গ্রহণ, গণভোট আয়োজন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
রাষ্ট্র সংস্কারে জন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ছাত্র জনতার বিপুল সাড়া পাওয়া যায়। তারা চেয়েছিল ফ্যসিস্ট অপরাধীদের বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার এখন ক্ষমতায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে ফ্যাসিস্ট অপরাধী ও হত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে গতিতে চলছিল তা বহাল থাকছে না। এনিয়ে জনগণ ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে হতাশার সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। দৈনিক সংগ্রামসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিচারের দাবিতে সমাবেশে বলা হয়েছে, সরকার বিচার ও সংস্কার উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটলে যা যা করণীয় তাই করা হবে। গত মঙ্গলবার আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কর্তৃক সংঘটিত সকল গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে রাজধানীতে ১১ দলের সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা উপেক্ষা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিচার বিলম্বিত করার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা দেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদের উত্থান রোধে এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। খবরে বলা হয়েছে, বিচারের ধীরগতিতে হতাশা প্রকাশ করে সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে গত চার মাসে আইসিটিতে নতুন কোনো রায় হয়নি, নতুন কোনো তদন্ত রিপোর্ট এখন পর্যন্ত দাখিল হয়নি।
আরেক খবরে বলা হয়েছে, দেশের অন্যসব আদালতের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও এখন বছরের নির্দিষ্ট সময় থাকবে অবকাশ বা ছুটি। দেড় দশকের মধ্যে এ প্রথম অবকাশে যাচ্ছেন বিশেষ এ আদালত। প্রথম দফায় ছুটি থাকছে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত। দেড় দশক আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যাত্রা শুরু হলেও অন্যসব আদালতের মতো অবকাশ ছিল না। ট্রাইব্যুনালকে ‘আলাদা সত্তা’ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধি সংশোধন করে ছুটির বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের সময়কালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে চারটি মামলার রায় ইতিমধ্যে দিয়েছেন দুটি ট্রাইব্যুনাল। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ চার মামলার রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ৪৩ জন আসামীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া এবং একজন পেয়েছেন ক্ষমা। এটিই জনগণের প্রত্যাশা। রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ বিষয়ক এক রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যা বিচারের ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি।
আমরা মনে করি, বিচারে ধীরগতির বিষয়টি মোটেই জুলাই বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে মানানসই নয়। জনগণ চায় সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের সাজা। তা না হলে নতুন করে ফ্যাসিবাদের উত্থান রোধ করা যাবে না। আমরা মনে করি বিচার বিলম্বিত করা উচিৎ হবে না। ফ্যাসিস্টদের বিচারে গতি আনতে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।