জসিম উদ্দিন মনছুরি

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাম্ভিকতার সহিত নিজেকে সৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিগত দেড় বছরের মধ্যে তার দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র একের পর এক ভেসে উঠছে। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে তার শাসনামলের দুর্নীতির ফর্দ কল্পনাতীত। সাম্প্রতিক ২৫ নভেম্বর অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় তার দুটি লকারের সন্ধান মেলে। দুদক প্রতিনিধি, সিআইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্মুখে লকার ভেঙ্গে জব্দ করা হয় ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা একটি ভিডিও বার্তায় স্বর্ণালংকারগুলো তার ও তার পরিবারের বলে স্বীকার করেছেন। লকার ভাঙায় তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাছাড়া তার অপরাধ কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির আমলনামা সুদীর্ঘ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ পরিবারের সদস্যদের এবং পার্টির প্রভাবশালীদের রাজউক, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। দশ কাঠার তিনটি প্লট নিজেদের নামে বরাদ্দ নেওয়ায় ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি মামলায় ঢাকার পঞ্চম দায়রা জজ আদালতে শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাকে পৃথক তিনটি মামলায় সাত বছর করে ২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তিন লক্ষ টাকা করে মোট ৯ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকেও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পৃথক পৃথক অভিযোগে ২২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। পঞ্চম দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন। দুদকের কর্মকর্তা আফনান জান্নাত কেয়া উল্লেখ করেন এটা কোন ভুলবশত প্লট বরাদ্দ নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনি কারসাজি, বিরোধী দল ও মিডিয়া দমন, বিচারবহির্ভূত গ্রেফতার ও গুম, মানি লন্ডারিং এবং অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন এবং পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন, তার বিরুদ্ধে মোট ১৫২টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে আছে হত্যা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। তার বিরুদ্ধে এই পর্যন্ত মোট ৫৮৩টি মামলা হয়েছে। তার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা এসব মামলার মধ্যে ১৩৫টি হত্যার অভিযোগ, ৭টি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগ, ৬টি হত্যাচেষ্টা এবং ৩টি অপহরণের মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ের ঘটনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর চারজন কর্মীকে লগিবৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতির বিনিময়ে প্রায় মার্কিন $৪,১১,০০০ ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অর্থ আত্মসাৎ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সংক্রান্ত ভূমি দখলের অভিযোগ। গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে শ্বেতপত্রে। সেই হিসেবে গত ১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেন। গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই রিপোর্ট জমা দিয়ে কমিটি জানিয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও আর্থিক কারচুপির যে তথ্য পাওয়া গেছে তা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। এ সময় কমিটির প্রধান অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করে রিপোর্ট প্রদান করেছে। পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর যে ভঙ্গুর অর্থনীতি আমরা পেয়েছি তা এই রিপোর্টে উঠে এসেছে”। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাটসহ অর্থনীতির নানা বিষয়ে তাদের প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র তৈরি করেছে।

পঞ্চম দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন উষ্মা প্রকাশ করে বলেন শেখ হাসিনা পলিটিক্যাল ব্যাক্তি। তার কেনো এত সম্পদ লাগবে? এ সব দুর্নীতি দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন তার সম্পত্তির এত লোভ?

গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার উপর হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়। বিগত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের ব্যাঞ্চে এই রায় প্রদান করা হয়। অপর আসামি পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজস্বাক্ষী হওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের যাবতীয় সম্পদ জব্দ করে সরকারের অনুকূলে নিয়ে গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহিদ পরিবার ও আহতদের পরিবারকে বন্টন করে দেওয়া হবে। তারই ধারাবাহিকতায় দুদক অভিযুক্তদের সম্পদের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেন। দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় রক্ষিত ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধারের ঘটনা। তাছাড়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে কোথায় কোথায় তার সম্পদ রয়েছে। এতদিন মনে করা হতো শেখ হাসিনা সৎ ও নিষ্ঠাবান একজন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার অপকর্মের দীর্ঘ আমলনামা দেখে জনগণ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জনগণের প্রত্যাশা অপরাধী যেই হোক না কেন তার অপরাধের সাজা হোক। দুর্নীতি অর্থপাচার,হত্যা ও গুমের বিচার হোক। যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন হয়ে কেউ দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন না পারে। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশা রাজনৈতিক দলগুলি সৎ ও ন্যায়পরায়ন এবং যোগ্য লোকদের মনোনয়ন দিয়ে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিবে। ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন ক্ষমতাসীনরা সংসদে গিয়ে জনগণের জন্য কাজ করবে এবং দেশকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সচেষ্ট হবেন। আশা করি এই বিষয়টি উপলব্ধি করে আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। তাহলে জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। দেশ দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্তি পেয়ে দুর্নীতিমুক্ত সাম্য ও সমঅধিকারে অনন্য উচ্চতায় সসম্মানে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।