॥ শেখ এনামুল হক ॥
সিরিয়া প্রায় দেড় দশক ধরে ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নেয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক এবং ইসরাইল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে আহমেদ আল-শারা অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে দেশটি ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এখনো জটিল, যেখানে সামরিক সংঘর্ষ, মানবিক সংকট, পুনর্গঠন প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপ একসাথে কাজ করছে।
যুদ্ধবিরতি ও সামরিক পরিস্থিতি : ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিরীয় সরকার ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। প্রেসিডেন্ট আল-শারা ঘোষণা দেন যে রাক্কা, দেইর আজ জোর ও হাসাকেহ প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনী গ্রহণ করবে এবং এসডিএফ-কে প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একীভূত করা হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি দামেস্ক ও তার মিত্র তুরস্কের জন্য বড় ধরনের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি স্থায়ী হয়নি। আলেপ্পো ও ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমে নতুন সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে। এসডিএফ অভিযোগ করেছে, সরকার চুক্তি ভঙ্গ করে একাধিক স্থানে আক্রমণ চালিয়েছে। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে যে এ ধরনের সংঘর্ষ সিরিয়ার নাজুক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করতে পারে। রাক্কা শহরে সরকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দ দেখা গেছে। শহরটি আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও প্রায় এক দশক ধরে এসডিএফ-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। একইভাবে দেইর আজ জোরেও স্থানীয়রা এসডিএফ-এর পতনকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এসডিএফ সতর্ক করেছে, রাক্কায় হাজারো আইএসআইএল বন্দি রয়েছে, যাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মানবিক সংকট ও শরণার্থী : দীর্ঘ যুদ্ধ সিরিয়ার জনগণকে বিপর্যস্ত করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মিলিয়ন শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ গত এক বছরে নিজ দেশে ফিরেছে, তবে এখনো কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ঘাটতি এবং অবকাঠামো ধ্বংস মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আলেপ্পোতে পুনর্নির্মিত স্কুলে প্রায় ৮৫০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পুনর্গঠনের ছোট্ট উদাহরণ হলেও সামগ্রিক সংকটের তুলনায় নগণ্য। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং চিকিৎসক সংকট এখনো বিদ্যমান। শরণার্থী সংকটও ভয়াবহ। তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডানে লাখো সিরীয় শরণার্থী এখনো অবস্থান করছে। ইউরোপেও সিরীয় শরণার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে কিছু মানুষ দেশে ফিরতে পারে, তবে নিরাপত্তা ও জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া স্থায়ী প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয়।
পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক রূপান্তর : আল-শারার সরকার সিরিয়াকে পুনরায় একীভূত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং নওরোজ উৎসবকে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কুর্দি জনগণের অধিকার স্বীকৃতির দিকে অগ্রগতি হলেও কুর্দি প্রশাসন স্থায়ী সংবিধান ছাড়া এসবকে যথেষ্ট মনে করছে না। মার্চ ২০২৫-এ সিরীয় সেনা ও এসডিএফ-এর মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যেখানে সীমান্ত, বিমানবন্দর ও তেল-গ্যাসক্ষেত্রসহ সব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে একীভূত করার কথা বলা হয়। তবে এ চুক্তি ভেঙে গেলে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে আল-শারা ঘোষণা দিয়েছেন, কুর্দিদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া হবে। ১৯৬২ সালের আদমশুমারির সময় যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদেরও পুনরায় নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। এটি কুর্দিদের জন্য একটি বড় অর্জন হলেও তারা স্থায়ী সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দাবি করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি : সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে ইসরাইল, তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে জটিলতা রয়ে গেছে। তুরস্ক এসডিএফ-কে পিকেকে’র শাখা মনে করে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তায় জোর দিচ্ছে। রাশিয়া ও ইরান সিরীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখছে। ইসরাইলও সিরিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা আশঙ্কা করছে, সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যদি ব্যর্থ হয় তবে সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ : দামেস্কে বড় ধরনের যুদ্ধ আর নেই, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়েছে। চেকপয়েন্ট, টহল ও নজরদারি এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এটি দেখায় যে সংঘর্ষ খোলা যুদ্ধ থেকে নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। সরকার বর্তমানে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এসডিএফ এখনো কিছু এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছে।
অর্থনীতি ও পুনর্গঠন : যুদ্ধ সিরিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে। তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এখনো চলছে। কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া পুনর্গঠন সম্ভব নয়। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, সিরিয়ার পুনর্গঠনে কয়েকশো বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখনো দ্বিধায় রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : সিরিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। সরকার ও এসডিএফ-এর মধ্যে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ সফল হলে দেশ পুনর্গঠনের পথে এগোতে পারে। তবে নিরাপত্তা, জাতিগত অধিকার, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক সংকট সব মিলিয়ে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থায়ী শান্তির ওপর। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, যদি চুক্তি বাস্তবায়ন না হয় তবে নতুন সংঘর্ষ শুরু হতে পারে এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
সিরিয়া এখনো যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে। যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সংস্কার দেশকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং মানবিক সংকট সমাধান না হলে স্থায়ী শান্তি আসবে না। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ, পুনর্গঠন প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।