জাফর আহমাদ

জাহান্নামীদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিচে উদ্ধৃত করা হলো। যারা জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চায় তারা তাদের মধ্যে বিদ্যমান নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো যেন পরিত্যাগ করেন। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: (১) সত্যকে অস্বীকার, (২) আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা, (৩) সত্য ও সত্যপন্থীদের সাপথে শত্রুতা, (৪) কল্যাণের পথের বাধা হয়ে দাঁড়ানো, (৫) নিজের অর্থ-সম্পদ দ্বারা আল্লাহ ও বান্দার হকসমূহ আদায় না করা, (৬) নিজের আচার আচরণে সীমালংঘণ করা, (৭) মানুষের ওপর জুলুম ও বাড়াবাড়ি করা, (৮) ইসলামের বিধানসমূহের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা, (৯) অন্যদের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা এবং (১০) প্রভুত্বে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা।

১. সত্যকে অস্বীকার করা : সত্য অস্বীকার করা মানে কুফুরীতে লিপ্ত হওয়া। যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয় তাদেরকে কাফের বলা হয়। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এ কথা যারা স্বীকার করে না তারাই মূলত কাফের। এ সমস্ত অবিশ্বাসীদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যে সব লোক অস্বীকার করেছে তাদের জন্য সমান-তোমরা তাদের সতর্ক কোর বা না করো, তারা মেনে নেবে না।” (সুরা বাকারা : ৬) আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যে ব্যক্তিই পাপ কাজ করবে এবং পাপের জালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়বে সে-ই জাহান্নামী হবে এবং জাহান্নামের আগুনে পুড়তে থাকবে চিরকাল।” (সুরা বাকারা : ৮১)

২. আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা : আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর স্মরণ করো তোমাদের রব এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেলেন যে, যদি কৃতজ্ঞ থাকো তাহলে আমি তোমাদের আরো বেশি দেবো আর যদি নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে আমার শাস্তি বড়ই কঠিন।” (সুরা ইবরাহিম : ৭) আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ মানে আল্লাহর বিধানকে অমান্য করা এবং তাঁর বিধানের মোকাবেলায় অহংকারে মত্ত হওয়া বা বিদ্রোহ করা।

৩. সত্য ও সত্যপন্থীদের সাথে শত্রুতা : ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই’ এটি সত্য কথা যারা এ সত্যকে মনে প্রাণে মানে এবং সে অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলে তারা সত্যপন্থী। যারা এ সত্যকে মানে না বরং যারা সত্যানুসারী তাদের সাথে শুত্রুতা পোষণ করে তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে তুলে।

৪. কল্যাণের পথের বাধা হয়ে দাঁড়ানো : যারা কল্যাণের পথ থেকে শুধু নিজেরাই যে কেবল বিরত থাকে তা নয় বরং অন্যদেরকেও তা থেকে বিরত রাখার আপ্রাণ চেষ্ঠা চালায়। তারা পৃথিবীর কল্যাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোনভাবেই যেন কল্যাণ ও সুকৃতি বিস্তার লাভ করতে না পারে এ উদ্দেশ্যে তারা তাদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে। তারাই নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে তুলে।

৫. নিজের অর্থ-সম্পদ দ্বারা আল্লাহ ও বান্দার হকসমূহ আদায় না করা : বান্দার সম্পদে বঞ্চিত অসহায়দের হক রয়েছে। যারা এ হক থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত ঠিকানা।

৬. নিজের আচার আচরণে সীমালংঘণ করা: নিজের প্রতিটি কাজে নৈতিকতার সীমালংঘনকারী। নিজের স্বার্থ, উদ্দেশ্যাবলী ও আশা-আকাক্সক্ষার জন্য যে কোন কাজ করতে প্রস্তুত থাকতো। হারাম পন্থায় অর্থ-সম্পদ উপার্জন করে এবং হারাম পথেই তা ব্যয় করে। মানুষের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। না তার মুখ কোন বাধা-বাধ্যকতায় সীমাবদ্ধ ছিল, না তার হাত কোন প্রকার জুলুম ও বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকে। কল্যাণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাকেই সে যতেষ্ট মনে করতো না, বরং আরো অগ্রসর হয়ে সততা ও কল্যাণের পথের অনুসারীদেরকে সে উত্যক্ত করে এবং কল্যাণের জন্য যারা কাজ করে তাদের ওপর নির্যাতন চালায়।

৭. মানুষের ওপর জুলুম ও বাড়াবাড়ি করা : জুলুম ও বাড়াবাড়ির পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসলাম অত্যন্ত জোরালোভাবে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। জুলুম ও বাড়াবাড়ির উপযুক্ত শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম।

৮. ইসলামের বিধানসমূহের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা : যারা নিজেরা সন্দেহ সংশয়ের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। তাদের কাছে আল্লাহ, আখিরাত, ফেরেশতা, অহী এক কথায় ইসলামের সব সত্যই সন্দেহজনক। নবী-রাসুলের পক্ষ থেকে ন্যায় ও সত্যের যে কথাই পেশ করা হতো তার ধারণায় তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। সন্দেহের ঘোর অমানিশায় হাতড়াতে হাতড়াতেই জীবন পার করে দেয়। অবশেষে নিজেদেরকে জাহান্নামের মধ্যে আবিষ্কার করে।

৯. অন্যদের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা : তারা শুধু নিজেদেরকেই সন্দেহের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে না বরং অন্যদেরকেও একই সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করার চেষ্টা চালায়। নিজের সন্দেহ রোগ আল্লাহর অন্য বান্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়াতে থাকে। সে যার সাথেই মেলামেশার সুযোগ পায় তার অন্তরেই কোন না কোন দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি করে দেয়।

১০. প্রভুত্বে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক : রুবুবিয়াতে সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা’আলা। মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের রব, আমাদের মালিক, আমাদের অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী, সংরক্ষণকারী, শাসনকর্তা পরিচালক ও সংগঠক। তিনি সর্বময় সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি আমাদের সার্বক্ষণিক প্রতিপালন করে যাচ্ছেন। সুতরাং তাঁর আনুগত্য করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাঁকে বাদ দিয়ে মিথ্যা রবের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করা একান্তই বোকামী। একজনমাত্র রবই আমাকে সার্বক্ষণিক লালন পালন করে যাচ্ছেন, অথচ অন্যকে রব গণ্য করা বড় অন্যায়। এতবড় অন্যায়ের মধ্যে লিপ্ত থাকা সত্ত্বে¡ও বড়ই বরকতের অধিকারী, কল্যাণময় আল্লাহ তা’আলা তথাপি আমাদেরকে তাঁর নিজগুণে লালন পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর কল্যাণকামীতায় কোনই ছেদ পড়ছে না। তার পরও কি আমাদের বিবেক নাড়া দেবে না।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব, যিনি আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি নিজের কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হন। তিনি রাত দিয়ে দিনকে ঢেকে দেন তারপর রাতের পেছনে দিন দৌঁড়িয়ে চলে আসে। তিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজী সৃষ্টি করেন। সবাই তাঁর নির্দেশের অনুগত। জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই। আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।”(সুরা আরাফ : ৫৪)

আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে, “প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব” আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে “তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।” আয়াতের মধ্যোংশে রবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ বিশ্ব-জগতের নিছক স্রষ্টাই নন বরং এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপকও তিনি। তিনি এ দুনিয়াকে অস্তিত্বশীল করার পর এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোথাও বসে যাননি। বরং কার্যত তিনিই সারা বিশ্ব-জাহানের ছোট বড় প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব ও লালন-পালন করছেন। পরিচালনা ও শাসন কর্তৃত্বের যাবতীয় ক্ষমতা কার্যত তাঁরই হাতে নিবদ্ধ। প্রতিটি বস্তু তাঁর নির্দেশের অনুগত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণাও তাঁর নির্দেশ মেনে চলে। প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর ভাগ্যই চিরন্তনভাবে তাঁর নির্দেশের সাথে যুক্ত। যে মৌলিক বিভ্রান্তিটির কারণে মানুষ কখনো শিরকের গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে, আবার কখনো নিজেকে স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন ঘোষণা করার মতো ভ্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কুরআন এভাবে তার মুলোৎপাটন করতে চায়। বিশ্ব-জাহানের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা থেকে আল্লাহকে কার্যত সম্পর্কহীন মনে করার অনিবার্য ফল দাঁড়ায় দুটি। মানুষ নিজের ভাগ্যকে অন্যের হাতে বন্দী মনে করবে এবং তার সামনে মাথা নত করে দেবে অথবা নিজেকেই নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রা মনে করবে এবং নিজেকে সর্বময় কর্তৃত্বশীল স্বাধীন সত্তা মনে করে কাজ করে যেতে থাকবে।

কুরআন শাশ্বত ও অনাদি-অনন্ত সত্য উপস্থাপন করছে যে, ভুমণ্ডলে ও নভোমণ্ডলে একমাত্র আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। সার্বভৌমত্ব (Sovereignty ) বলতে যা বুঝায় তা একমাত্র তাঁরই সত্তার একচেটিয়া অধিকার ও বৈশিষ্ট্য। আর বিশ্ব-জাহানের এ ব্যবস্থাপনা একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিশেষ, যেখানে ঐ একক সত্তা, সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকারী। কাজেই এ ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যক্তি বা দল নিজের বা অন্য কারোর আংশিক বা পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবিদার হয়, সে নিজেকে নিছক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তাছাড়া এ ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে মানুষের পক্ষে ঐ একক সত্তাকে একই সাথে ধর্মীয় অর্থেও একমাত্র মাবুদ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থেও একমাত্র শাসক হিসাবে মেনে নেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন সঠিক দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি হতে পারে না। যারা এর ব্যত্যয় ঘটাবে তাদের ঠিকানা জাহান্নাম ছাড়া আর কি হতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার।